বায়ুদূষণ মোকাবিলায় চীনের চমক: দূষিত শহর থেকে নীল আকাশের পথে
একসময় বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল চীনের রাজধানী বেইজিং। প্রায় দুই দশক আগে শহরটি ‘স্মগের রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কঠোর নীতি এবং প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের মাধ্যমে চীন আজ বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিককে সামনে রেখে চীন প্রথমবারের মতো বড় আকারে দূষণ নিয়ন্ত্রণে অস্থায়ী পদক্ষেপ নেয়। পরে ২০১৩ সালে দেশটি পাঁচ বছর মেয়াদি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা চালু করে। এই পরিকল্পনার আওতায় কয়লাভিত্তিক কার্যক্রম বন্ধ করা, গণপরিবহন ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানো, শিল্পকারখানায় প্রযুক্তিগত সংস্কার, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং পরিবেশবান্ধব উদ্ভাবনকে উৎসাহ দেওয়া হয়। চীনের দূষণ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল পিএম২.৫ নামের সূক্ষ্ম বস্তুকণার মাত্রা কমানো। পিএম২.৫ হলো ২.৫ মাইক্রনের সমান বা তার চেয়ে ছোট কণা, যা সহজেই মানুষের ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করতে পারে এবং রক্তপ্রবাহে মিশে যায়। ফলে এটি মানবস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর বায়ুদূষণ উপাদানগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত। আরও পড়ুন>বিশ্বের ‘সবচেয়ে পরিচ্ছন্
একসময় বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল চীনের রাজধানী বেইজিং। প্রায় দুই দশক আগে শহরটি ‘স্মগের রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কঠোর নীতি এবং প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের মাধ্যমে চীন আজ বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।
২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিককে সামনে রেখে চীন প্রথমবারের মতো বড় আকারে দূষণ নিয়ন্ত্রণে অস্থায়ী পদক্ষেপ নেয়। পরে ২০১৩ সালে দেশটি পাঁচ বছর মেয়াদি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা চালু করে।
এই পরিকল্পনার আওতায় কয়লাভিত্তিক কার্যক্রম বন্ধ করা, গণপরিবহন ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানো, শিল্পকারখানায় প্রযুক্তিগত সংস্কার, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং পরিবেশবান্ধব উদ্ভাবনকে উৎসাহ দেওয়া হয়।
চীনের দূষণ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল পিএম২.৫ নামের সূক্ষ্ম বস্তুকণার মাত্রা কমানো।
পিএম২.৫ হলো ২.৫ মাইক্রনের সমান বা তার চেয়ে ছোট কণা, যা সহজেই মানুষের ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করতে পারে এবং রক্তপ্রবাহে মিশে যায়। ফলে এটি মানবস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর বায়ুদূষণ উপাদানগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।
আরও পড়ুন>
বিশ্বের ‘সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন দেশ’ থেকে কী শিখতে পারে বাংলাদেশ?
দীর্ঘ হচ্ছে গরমের মৌসুম, বর্ষাকালেও তাপপ্রবাহ
বেইজিংয়ে দূষণ নিয়ন্ত্রণে শুধু নির্গমন কমানোই নয়, বরং দূষণ পূর্বাভাস ও জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা চালু করা হয়। পাশাপাশি জনবসতি এলাকা থেকে কারখানা সরিয়ে নেওয়া, কৃষকদের ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো থেকে বিরত রাখতে প্রণোদনা দেওয়া এবং দূষণকারী কার্যক্রমের ওপর কঠোর নজরদারি করা হয়।
এর ফলে ২০১৭ সালের মধ্যে সবচেয়ে দূষিত এলাকাগুলোতে দূষণের মাত্রা প্রায় ৩৫ শতাংশ কমে যায়।
২০১৩ সালে বেইজিংয়ের গড় পিএম২.৫ ঘনত্ব ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৭২ মাইক্রোগ্রাম। ২০১৯ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৩৬ মাইক্রোগ্রামে। ২০২৪ সালে আরও কমে হয় ২৯.৩ মাইক্রোগ্রাম।
যদিও এটি এখনও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত ৫ মাইক্রোগ্রাম মানদণ্ডের অনেক ওপরে, তবুও দূষণ কমানোর ক্ষেত্রে এটি বড় ধরনের অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে বেইজিংয়ে গড় পিএম২.৫ ঘনত্ব আরও কমে ২৪.৯ মাইক্রোগ্রামে নেমে এসেছে।
কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও চীন দূষণ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি বন্ধ করেনি। বরং নির্মাণকাজ থেকে সৃষ্ট দূষণ সীমিত করা, পরিচ্ছন্ন শিল্পপ্রযুক্তি ব্যবহার, ইস্পাত উৎপাদন কমানো, পুরোনো যানবাহন বাতিল করা এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।
এসব উদ্যোগের ফলে একসময় পরিবেশ দূষণের প্রতীক হিসেবে পরিচিত বেইজিং এখন নগর বায়ু মান উন্নয়নের সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চীনা গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশটির গড় বার্ষিক পিএম২.৫ ঘনত্ব ২৯ মাইক্রোগ্রামে নেমে আসে। একই সময়ে ৩৩৯টি শহরে বছরে গড়ে ৩১৬ দিন ‘ভালো বায়ুমান’ বজায় ছিল।
আরও পড়ুন>
বিশ্বের ‘সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন দেশ’ থেকে কী শিখতে পারে বাংলাদেশ?
দীর্ঘ হচ্ছে গরমের মৌসুম, বর্ষাকালেও তাপপ্রবাহ
বিশ্বের অনেক দেশে যখন পিএম২.৫ দূষণ বাড়ছিল, তখন চীনের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি বৈশ্বিক বায়ুদূষণ হ্রাসেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক-এর তথ্য অনুযায়ী, বেইজিং-তিয়ানজিন-হেবেই অঞ্চলে ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পিএম২.৫ মাত্রা ৪৪.২ শতাংশ কমেছে।
একই সময়ে সালফার ডাই-অক্সাইড ৭৬.৩ শতাংশ এবং নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড ৩৪.৮ শতাংশ কমেছে। ভালো বায়ুমানের দিনের হার বেড়ে ৬৩.১ শতাংশে পৌঁছেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের পরিবেশ নীতিমালা শিল্পখাতকে দূষণ কমাতে উৎসাহিত করেছে। বর্তমানে দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি।
চীন বিশ্বের বৃহত্তম নতুন জ্বালানি শিল্প শৃঙ্খল গড়ে তুলেছে, যা শুধু দেশের ভেতরে নয়, বৈশ্বিক পরিচ্ছন্ন জ্বালানি রূপান্তরেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
২০১৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে চীনের মোট দেশজ উৎপাদন ৭৩ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে পিএম২.৫ দূষণের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
বায়ুদূষণ শুধু জলবায়ুর ওপরই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না, এটি মানবস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬৭ লাখ মানুষের অকালমৃত্যুর জন্য বায়ুদূষণ দায়ী।
‘এয়ার পলিউশন প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল অ্যাকশন প্ল্যান’ বাস্তবায়নের পর চীনের বায়ুর গুণগত মানে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায়। ওজোন ছাড়া প্রায় সব ধরনের প্রধান বায়ুদূষকের মাত্রা কমতে শুরু করে।
বায়ুর মান উন্নত হওয়ার ফলে কোটি কোটি মানুষ দূষিত বাতাসের সংস্পর্শ থেকে রক্ষা পেয়েছে। এতে শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি কমেছে।
একই সঙ্গে দূষণ নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপগুলো কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনও কমিয়েছে, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অতিরিক্ত সুবিধা বা ‘কো-বেনিফিট’ হিসেবে কাজ করেছে।
বায়ুর মান আরও উন্নত করতে চীন ২০১৮ সালে ‘থ্রি-ইয়ার অ্যাকশন প্ল্যান টু উইন দ্য ব্লু স্কাই ডিফেন্স ওয়ার’ চালু করে।
এরপর ২০২৩ সালে ‘এয়ার কোয়ালিটি কন্টিনিউয়াস ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাকশন প্ল্যান’ বাস্তবায়ন শুরু হয়। এই ধারাবাহিক জাতীয় কর্মসূচিগুলোকে সম্মিলিতভাবে ‘ক্লিন এয়ার অ্যাকশন’ নামে অভিহিত করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ক্লিন এয়ার অ্যাকশন’ শুধু পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি চীনের দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু লক্ষ্য অর্জনেও বড় ভূমিকা রাখছে।
চীনের ঘোষিত ‘ডুয়াল-কার্বন’ লক্ষ্য হলো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে পরে তা ধীরে ধীরে কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে কার্বন নিরপেক্ষতার দিকে অগ্রসর হওয়া।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘ক্লিন এয়ার অ্যাকশন’-এর মাধ্যমে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের যে সমন্বিত অগ্রগতি হয়েছে, তা এই জাতীয় লক্ষ্য অর্জনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
গবেষকদের মতে, ‘ক্লিন এয়ার অ্যাকশন’-এর সাফল্য মূল্যায়ন শুধু বায়ুর মান উন্নয়নের প্রভাব বোঝার জন্য নয়, বরং চীনের স্বল্প-কার্বনভিত্তিক অর্থনীতি ও টেকসই ভবিষ্যতের পথে অগ্রযাত্রা মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০২০ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যখন দেশটির উচ্চাভিলাষী জলবায়ু কৌশণা ঘোষণা করেন, তখন বিশ্বজুড়ে তা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন প্রতিশ্রুতি দেয় যে, ২০৬০ সালের মধ্যে তারা ‘নেট জিরো’ বা কার্বন নিরপেক্ষতার লক্ষ্য অর্জন করবে।
দ্রুত শিল্পায়নের মাধ্যমে দরিদ্র ও কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হওয়া একটি দেশের জন্য এই লক্ষ্যকে অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়েছিল। তবে এখন ক্রমেই এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, চীন শুধু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নয়, বরং তার আগেই এই লক্ষ্য অর্জন করতে পারে।
চীনের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও পরিবেশবিষয়ক কর্মী ওয়াং শাই মনে করেন, চীন ২০৬০ সালের আগেই কার্বন নিরপেক্ষতায় পৌঁছাতে সক্ষম হতে পারে।
তিনি বলেন, চীন শুধু ২০৬০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জন করবে না, বরং সম্ভবত আরও আগেই এই লক্ষ্য পূরণ করতে পারবে।
চীনের অন্যতম বৃহৎ রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান ভ্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্মানসূচক চেয়ারম্যান ওয়াং শি এই আশাবাদের পেছনে দুটি প্রধান কারণ তুলে ধরেছেন।
প্রথমত, চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার আগের তুলনায় কমে এসেছে। ফলে ভবিষ্যতে দেশটির জ্বালানি চাহিদাও তুলনামূলক কম হবে।
দ্বিতীয়ত, অনেক বিদেশি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে চীনের বাইরে তাদের কারখানা স্থানান্তর করছে। এতে শিল্পখাত থেকে সৃষ্ট কার্বন নিঃসরণও কমে আসতে পারে।
ওয়াং শি বলেন, অতীত অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে চীন কোনো লক্ষ্য নির্ধারণ করলে তা বাস্তবায়নে দৃঢ়ভাবে কাজ করে।
তার ভাষায়, অতীতের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বলা যায়, চীন যখন কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়, তখন সেটি বাস্তবায়নও করে। দেশটি বারবার প্রমাণ করেছে যে তারা ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনের সক্ষমতা রাখে।
এমএসএম
What's Your Reaction?