বিধ্বস্ত ভবন আড়ালের চেষ্টা, ঘুরে-ফিরে উঁকি দেয় শিক্ষার্থীরা
রোববার (১৯ জুলাই) দুপুর ১২টা। রাজধানীর উত্তরা দিয়াবাড়ির মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাস। ক্লাস শেষে বেরিয়ে খেলার মাঠের দিকে যাচ্ছিল ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী আসমাউল হুসনা জেবা। হঠাৎ পাশের প্রাচীরের ফাঁকা দিয়ে উঁকি দেয় সে। এক-দেড় মিনিট সেখানে উঁকি-ঝুঁকি দিয়ে ফের খেলার মাঠের দিকে হাঁটতে শুরু করে জেবা। কী দেখছিলে-এমন প্রশ্নে চোখ বড় বড় করে তাকায় সে। এরপর বলতে শুরু করে, ‘ওখানে আমার তিনটা বন্ধু মারা গেছে। ওখানেই তো ক্লাসরুম ছিল। থ্রি, ফোর ও ফাইভে ওই বিল্ডিংয়ে পড়েছি। সামনের দোলনায় দোল খেতাম, বাগানে খেলতাম, অনেক স্মৃতি। মাঝে মধ্যে দেখি, এখন ভেতরটা যে কেমন তা তো জানি না।’ আরও পড়ুন স্মৃতির শোক ভুলে সবুজের ছায়ায় নতুন জীবনের পথে মাইলস্টোনের শিক্ষার্থীরা শুধু জেবা নয়, শিক্ষার্থীদের অনেকেই বিধ্বস্ত ভবনটি একনজর দেখতে প্রায়ই উঁকি দেয়। হায়দার আলী নামের ওই ভবনটি এখন স্টিলের পাতের বেড়া দিয়ে ঘেরা। এতটাই উঁচু যে বাইরে থেকে ভবনটির কিছুই দেখা যায় না। শুধু একটি স্টিলের পাতের সঙ্গে আরেকটা পাতের জোড়ার জায়গায় থাকা ফাঁকা দিয়ে ভেতরের কিছুটা দেখা যায়। উঁকি দিয়ে সেটুকু দেখতেই শিক্ষার্থীদের প্রচেষ্টা।
রোববার (১৯ জুলাই) দুপুর ১২টা। রাজধানীর উত্তরা দিয়াবাড়ির মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাস। ক্লাস শেষে বেরিয়ে খেলার মাঠের দিকে যাচ্ছিল ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী আসমাউল হুসনা জেবা। হঠাৎ পাশের প্রাচীরের ফাঁকা দিয়ে উঁকি দেয় সে। এক-দেড় মিনিট সেখানে উঁকি-ঝুঁকি দিয়ে ফের খেলার মাঠের দিকে হাঁটতে শুরু করে জেবা।
কী দেখছিলে-এমন প্রশ্নে চোখ বড় বড় করে তাকায় সে। এরপর বলতে শুরু করে, ‘ওখানে আমার তিনটা বন্ধু মারা গেছে। ওখানেই তো ক্লাসরুম ছিল। থ্রি, ফোর ও ফাইভে ওই বিল্ডিংয়ে পড়েছি। সামনের দোলনায় দোল খেতাম, বাগানে খেলতাম, অনেক স্মৃতি। মাঝে মধ্যে দেখি, এখন ভেতরটা যে কেমন তা তো জানি না।’
শুধু জেবা নয়, শিক্ষার্থীদের অনেকেই বিধ্বস্ত ভবনটি একনজর দেখতে প্রায়ই উঁকি দেয়। হায়দার আলী নামের ওই ভবনটি এখন স্টিলের পাতের বেড়া দিয়ে ঘেরা। এতটাই উঁচু যে বাইরে থেকে ভবনটির কিছুই দেখা যায় না। শুধু একটি স্টিলের পাতের সঙ্গে আরেকটা পাতের জোড়ার জায়গায় থাকা ফাঁকা দিয়ে ভেতরের কিছুটা দেখা যায়। উঁকি দিয়ে সেটুকু দেখতেই শিক্ষার্থীদের প্রচেষ্টা।
বিধ্বস্ত ভবনটি আড়ালের চেষ্টা
২০২৫ সালের ২১ জুলাই দুপুর সোয়া ১টার দিকে বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান মাইলস্টোন কলেজের হায়দার আলী ভবনের ওপর বিধ্বস্ত হয়। উদ্ধারকাজ শেষ হওয়ার পর ভবনটির আশপাশে জনসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। এক সপ্তাহ পর ওই ভবন ভারী স্টিলের পাত দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়। তারপর থেকেই ভবনটি ঘেরা। ৩৬ জনের প্রাণহানি ঘটার স্থান বিধ্বস্ত ভবনটি যেন আড়াল করার চেষ্টা।
মাইলস্টোনে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থীদের ছবিসংবলিত ব্যানারের সামনে কয়েকজন শিক্ষার্থী
জানতে চাইলে মাইলস্টোন কলেজের কর্মকর্তা বুলবুল আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘মাইলস্টোন পরিবারের জন্য এ দুর্ঘটনা দুঃসহ এক স্মৃতি। এটি ভোলার নয়। তবুও আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। ভবনটা যদি আমরা খোলা রাখি তাহলে শিক্ষার্থীদের চোখে পড়বে, তাদের ট্রমা কাটবে না। বারবার কথাগুলো মনে পড়বে। সেজন্য ভবনটি ঘিরে রাখার সিদ্ধান্ত হয়। প্রায় এক বছর ধরে সেটা ঘিরেই রাখা হয়েছে। কাউকে ভেতরে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়নি।’
ঝুলছে শোকের বার্তা, ছবিতে হারিয়ে যাওয়া কচি মুখগুলো
ভবন আড়াল করতে তোলা স্টিলের পাতের বেড়ার বাইরে ঝুলছে শোকবার্তা সংবলিত ব্যানার। তাতে কবে, কীভাবে দুর্ঘটনা ঘটেছিল, তা সংক্ষেপে উল্লেখ করা আছে। পাশাপাশি নিহত ২৮ জন শিক্ষার্থীর ছবি রাখা হয়েছে। রয়েছে নিহত শিক্ষকদের ছবিও।
রোববার দুপুরে নিহত শিক্ষার্থীদের ছবি সংবিলত ব্যানারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় কয়েকজন শিক্ষার্থীকে। তাদের কেউ ছবিগুলো গুনছে, কেউবা নিজের সহপাঠী ও বন্ধুকে খুঁজছে এবং আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে।
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হায়দার আলী ভবন
রাজিবুল হক নামে ষষ্ঠ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, ছবিতে তার দুজন বন্ধু আছে। গত বছর দুর্ঘটনায় মারা গেছে। ওদের ছবি প্রায়ই সে ও তার অন্য বন্ধুরা ক্লাস যেতে-আসতে দাঁড়িয়ে দেখে। রাজিবুলের ভাষ্য, ‘যখন ছবি দেখি বুকের মধ্যে ছ্যাঁৎ করে ওঠে। মনেই হয় না ওরা মারা গেছে।’
স্কুল শাখার শিক্ষক রুবিনা ইয়াসমিনও যেতে যেতে ব্যানারের দিকে দেখছিলেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আহা! সবগুলো পাখি। ওরা আমাদের সন্তান, ওদের তো ভোলা যাবে না। কিন্তু দুর্ঘটনা ঠেকানোর হাত ছিল না আমাদের। যেতে-আসতে প্রতিদিন যখন নিষ্পাপ ছবিগুলো দেখি, মনে মনে দোয়া করি আল্লাহ যেন ওদের জান্নাতে রাখেন।’
বিধ্বস্ত ভবনটি সবার জন্য উন্মুক্ত আজ
বিমান বিধ্বস্তের পর ২৮ জুলাই স্টিলের পাত দিয়ে ভবনটি ঘিরে সিলগালা করে দিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে নানান আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। তারপরও ভবনটি আড়াল রাখার চেষ্টাই করেছে কর্তৃপক্ষ। তবে ভয়াল সেই দুর্ঘটনার একবছর পর এসে বিধ্বস্ত হায়দার আলী ভবনটি দিনভর সবার জন্য উন্মুক্ত রাখার ঘোষণা দিয়েছে মাইলস্টোন কলেজ কর্তৃপক্ষ।
কলেজের অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর আলম খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, ২১ জুলাই দুর্ঘটনার এক বছরপূর্তির দিনে হায়দার আলী ভবন উন্মুক্ত রাখবো। যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের পরিবার, বন্ধু, সহপাঠীরা যেন শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে যেতে পারে, সেই ব্যবস্থা রাখা হবে।’
সবুজ উদ্যান গড়ে তোলার পরিকল্পনা
বিধ্বস্ত হায়দার আলী ভবন ভেঙে দুর্ঘটনার পুরো জায়গায় সবুজ একটি উদ্যান গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষ। যদিও এ উদ্যোগের কথা গত বছরই জানানো হয়েছিল, তবে একবছরেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এমনকি কোনো কাজে হাতও দেওয়া হয়নি।
জানতে চাইলে অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, আমরা এটা পরিকল্পনা করেছি। একটা নকশাও করা হয়েছে। শিগগির উদ্যানের কাজে হাত দেওয়া হবে। উদ্যানে বিভিন্নভাবে আমাদের হারিয়ে যাওয়া শিশুদের স্মৃতি রাখা হবে। একটি স্মৃতিস্তম্ভও করা হবে।’
২০২৫ সালের ২১ জুলাই উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। এতে ৩৬ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে ২৮ জনই শিক্ষার্থী।
দুর্ঘটনায় যুদ্ধবিমানটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামও নিহত হন। আহতদের অনেকে এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরাও এখনো ট্রমায় ভুগছেন।
এএএইচ/এমএএইচ/ এমএফএ
What's Your Reaction?


