বিপিসিজুড়ে হঠাৎ অস্থিরতা
তরল পেট্রোলিয়াম জ্বালানি আমদানি, পরিশোধন, বিপণন ও নিয়ন্ত্রণের কাজ করা সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনে (বিপিসি) হঠাৎ দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। চেয়ারম্যানকে অপসারণের ১২ দিন কেটে গেলেও দেওয়া হয়নি নতুন পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান। এর মধ্যেই জ্বালানি নীতিমালা ও বেসরকারি খাতে দেওয়া নিয়ে চলছে আলোচনা। গত ২৬ জুলাই বিপিসি থেকে ওএসডি হন সৎ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত রেজানুর রহমান। এর আগে গত ২ ফেব্রুয়ারি রেজানুর রহমানকে বিপিসি চেয়ারম্যান হিসেবে পদায়ন করা হয়। তিনি পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান হিসেবেও পদায়িত ছিলেন। পুরো বিষয়টি নিয়ে জ্বালানি বিভাগ এবং বিপিসির অন্তত আটজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। কেউ রেজানুর রহমানের ওএসডি বিষয়ে নিশ্চিত কোনো ধারণা দিতে পারেননি। বর্তমান অবস্থা নিয়ে বিপিসি ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে অস্বস্তির কথা জানান এসব কর্মকর্তারা। তাদের কেউ নামও প্রকাশ করতে রাজি হননি। আরও পড়ুন বিপিসির প্রধান কার্যালয় ঢাকায় সরালে ব্যয় বাড়বে কয়েকগুণ তাদের একজন বলেন, ‘দুই সপ্তাহ আগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণন করার আবেদন করেছিল
তরল পেট্রোলিয়াম জ্বালানি আমদানি, পরিশোধন, বিপণন ও নিয়ন্ত্রণের কাজ করা সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনে (বিপিসি) হঠাৎ দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। চেয়ারম্যানকে অপসারণের ১২ দিন কেটে গেলেও দেওয়া হয়নি নতুন পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান। এর মধ্যেই জ্বালানি নীতিমালা ও বেসরকারি খাতে দেওয়া নিয়ে চলছে আলোচনা।
গত ২৬ জুলাই বিপিসি থেকে ওএসডি হন সৎ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত রেজানুর রহমান। এর আগে গত ২ ফেব্রুয়ারি রেজানুর রহমানকে বিপিসি চেয়ারম্যান হিসেবে পদায়ন করা হয়। তিনি পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান হিসেবেও পদায়িত ছিলেন।
পুরো বিষয়টি নিয়ে জ্বালানি বিভাগ এবং বিপিসির অন্তত আটজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। কেউ রেজানুর রহমানের ওএসডি বিষয়ে নিশ্চিত কোনো ধারণা দিতে পারেননি। বর্তমান অবস্থা নিয়ে বিপিসি ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে অস্বস্তির কথা জানান এসব কর্মকর্তারা। তাদের কেউ নামও প্রকাশ করতে রাজি হননি।
তাদের একজন বলেন, ‘দুই সপ্তাহ আগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণন করার আবেদন করেছিল বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বিপিসির ১১ সদস্যের কমিটি বিষয়টিতে ‘না’ সূচক প্রতিবেদন দিয়েছিল। ২১ জুলাই ওই প্রতিবেদন দেওয়ার ৫ দিনের মাথায় চেয়ারম্যানকে ওএসডি করা হয়েছে। মূলত অনৈতিক চাপ না রাখায় এমনটি করা হয়েছে।’
আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘বেসরকারিতে পরিশোধিত জ্বালানি দেওয়ার বিষয়ে নয়, পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহকারী তালিকাভুক্তিতে রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিষ্ঠানকে প্রাধান্য না দেওয়ায় ওএসডির স্বীকার হয়েছেন রেজানুর রহমান।’
এ নিয়ে কথা হলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘পুরো বিপিসিতে এখন সবার উষ্মা বিরাজ করছে। কী হচ্ছে অনুমান করা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে বিপিসিকে ধীরে ধীরে বিটিসিএলের মতো দুর্বল করে ফেলা হবে। কিংবা পেট্রোবাংলার সঙ্গে পুনরায় মার্জ করা হবে।’
২১ জুলাই ওই প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরবর্তী কোনো পদক্ষেপ জানা না গেলেও চলতি মাসের শুরুতে তড়িঘড়ি করে বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির খসড়া নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।
৬ আগস্ট জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অপারেশন-২ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব আসিফ আহমেদ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিপূর্বক সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের জন্য একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।’
চিঠিতে ১০ আগস্টের মধ্যে বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা-২০২৬ এর (খসড়া) স্বাক্ষরকারীর বিভাগে পাঠানোর জন্য বিপিসির চেয়ারম্যানকে (অতিরিক্ত দায়িত্ব) নির্দেশনা দেওয়া হয়।
জনগণের মালিকানাধীন সম্পত্তি সরকারের হাতেই থাকবে। সরকার এগুলো জনকল্যাণে ব্যবহার করবে। এটাই সাংবিধানিক ভিত্তি। সরকার পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি যে বেসরকারিকরণ করতে যাচ্ছে, এজন্য যে তোড়জোড় শুরু করেছে, এটি অতীত থেকে ধারাবাহিকভাবে শুরু হয়ে আসছে।-ক্যাবের জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম
জ্বালানি বিভাগের ওই আদেশের পর বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) বিকেলেই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে বিপিসির চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনকারী জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব জিয়াউল হককে পদোন্নতি দিয়ে একই বিভাগের সচিব করা হয়।
৬ আগস্ট (বৃহস্পতিবার) জ্বালানি বিভাগ থেকে ওই চিঠি ইস্যুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিপিসির চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব জিয়াউল হককে পদোন্নতি দিয়ে একই বিভাগের সচিব করা হয়।
মাঝখানে শুক্র ও শনিবার (৭ ও ৮ আগস্ট) বাদ দিলে সময় রয়েছে রোববার (৯ আগস্ট) ও সোমবার (১০ আগস্ট) পর্যন্ত মাত্র দুদিন। এর মধ্যে ৯ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজারের মহেশখালী মাতারবাড়ির জ্বালানি হাব পরিদর্শন করবেন।
পেট্রোলিয়াম জ্বালানি তেল আমদানি বিপণনে সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু সরকার জনগণের স্বার্থে নিজের প্রতিষ্ঠানকে আরও সচল না করে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত করছেন, জনগণ হিসেবে এটা আমাদের কাম্য নয়।-সুজন চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি অর্থনীতিবিদ ড. সেকান্দার খান
প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে বিপিসির সচিবসহ অপারেশন বিভাগের কর্মকর্তাদের ব্যস্ত সময় কাটাতে হচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে মাত্র দুদিন সময় দিয়ে নীতিমালার মতো সূক্ষ্ম ও স্পর্শকাতর বিষয়ে সিদ্ধান্ত চাওয়া নিয়েও তৈরি হয়েছে সমালোচনা।
এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘জনগণের মালিকানাধীন সম্পত্তি সরকারের হাতেই থাকবে। সরকার এগুলো জনকল্যাণে ব্যবহার করবে। এটাই সাংবিধানিক ভিত্তি। সরকার পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি যে বেসরকারিকরণ করতে যাচ্ছে, এজন্য যে তোড়জোড় শুরু করেছে, এটি অতীত থেকে ধারাবাহিকভাবে শুরু হয়ে আসছে।’
এ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘এসব বেসরকারিকরণ হতে হলে একটি শক্তিশালী রেগুলেটরি অথরিটি দরকার। কিন্তু সে পদ্ধতি বাংলাদেশে যে অচল এবং কার্যকর হয়নি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে মানুষ যে লুণ্ঠিত হয়েছে, তার নিকট অতীত দৃষ্টান্ত আমাদের রয়েছে।’
যে কারণে আগের সরকারকে বিদায় নিতে হয়েছে, সরকার এতকিছু জেনে বোঝার পরেও সেটাই যদি শক্তিশালী করতে চায়, সরকার যদি এ কার্যক্রম থেকে সরে না আসে, সেটা জাতির জন্য বড় দুর্ভাগ্যের বিষয় হবে বলে মনে করেন এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ।-তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির অন্যতম সদস্য রুহিন হোসেন প্রিন্স
আমাদের দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের অন্যতম কারণ এগুলোকে আমদানিনির্ভর করে ফেলা। আমদানিনির্ভর করে এগুলোকে কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি করে ফেলা হয়েছে। এগুলোর বিকল্প হিসেবে আমাদের আলো, বায়ু, পানির রূপান্তরিত শক্তিকে ব্যবহার করার উদ্যোগ নেওয়া। গ্যাস উত্তোলনের পদক্ষেপ নেওয়া।
পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি বেসরকারিতে দেওয়ার পদক্ষেপ মোটেও ইতিবাচক হবে না বলে দাবি করেন তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির অন্যতম সদস্য রুহিন হোসেন প্রিন্স।
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের অন্যতম কারণ এগুলোকে আমদানিনির্ভর করে ফেলা। আমদানিনির্ভর করে এগুলোকে কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি করে ফেলা হয়েছে। এগুলোর বিকল্প হিসেবে আমাদের আলো, বায়ু, পানির রূপান্তরিত শক্তিকে ব্যবহার করার উদ্যোগ নেওয়া। গ্যাস উত্তোলনের পদক্ষেপ নেওয়া। পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি বেসরকারিতে দেওয়ার যে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, সেটা মোটেও ইতিবাচক হবে না।’

তারল্য সংকটে দেউলিয়া হওয়ার পথে বিপিসি
তিনি সরকারকে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানান। পাশাপাশি সরকারকে নিজেদের উদ্যোগেই বিদ্যুতের পাশাপাশি পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি ব্যবস্থাপনা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি অর্থনীতিবিদ ড. সেকান্দার খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা লাভের জন্যই ব্যবসা করে। বেসরকারিতে জ্বালানি আমদানির সুযোগ দেওয়া মানেই, ব্যবসায়ীরা লাভ করেই আমদানি করবে।’
তিনি বলেন, ‘পেট্রোলিয়াম জ্বালানি তেল আমদানি বিপণনে সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু সরকার জনগণের স্বার্থে নিজের প্রতিষ্ঠানকে আরও সচল না করে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত করছেন, জনগণ হিসেবে এটা আমাদের কাম্য নয়।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র যুগ্ম সচিব (অপারেশন অনুবিভাগ) মনির হোসেন চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি দেশের বাইরে। দুদিন হলো আমেরিকা এসেছি। সচিব মহোদয়ের বদলি ও পদোন্নতির বিষয়টি জেনেছি। তবে বেসরকারিতে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির নীতিমালা তৈরির কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না আমার জানা নেই। জেনে বলতে হবে।’
পরে সদ্য পদোন্নতি পেয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব হিসেবে পদায়ন আদেশ হওয়া বিপিসির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জিয়াউল হককে বেশ কয়েকবার ফোন দিলেও তিনি সাড়া দেননি।
এমডিআইএইচ/এএসএ
What's Your Reaction?

