বিভীষিকা মুছে অদম্য পাঁচ নারী এখন সাফল্যের বাতিঘর

সমাজ আর পরিবারের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে জীবনযুদ্ধে জয়ী হয়েছেন সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার পাঁচ নারী। দারিদ্র্য, কুসংস্কার আর বঞ্চনাকে পেছনে ফেলে তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই পাঁচ 'অপরাজিতা’কে পাঁচটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে সম্মাননা দিয়েছে উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর । তাদের প্রত্যেকের জীবনকাহিনি যেন হার না মানা এক একটি অধ্যায়। কলারোয়া উপজেলার ‘অদম্য নারী পুরস্কার' ২০২৫ প্রাপ্তদের জীবনকাহিনি এখানে তুলে ধরা হলো:  নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করা পারুল খাতুন। তিনি কলারোয়ার সীমান্তবর্তী মাদরা গ্রামের সিরাজুল ইসলামের কন্যা। বাবা-মার অভাবের সংসার। ২০০৮ সালে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। স্বামী ভ্যানচালক। বিয়ের পর যৌতুকের দাবিতে তার ওপর শারীরিক ও মানুষিক নির্যাতন নেমে আসে। এর মধ্যে একটি কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। সন্তান জন্মের পর তার সঙ্গে স্বামীর মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয় এবং স্বামী তাকে তালাক দিয়ে দেন। তখন তিনি তার বাবার বাড়িতে চলে আসেন। নিরুপায় হয়ে দালালের মাধ্যমে চাকরির লোভে তিনি ভারতের মুম্বাই শহরে যান। সেখানে তিনি চরম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। পরে রাইটস, যশোর এনজিও এর মাধ্য

বিভীষিকা মুছে অদম্য পাঁচ নারী এখন সাফল্যের বাতিঘর

সমাজ আর পরিবারের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে জীবনযুদ্ধে জয়ী হয়েছেন সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার পাঁচ নারী। দারিদ্র্য, কুসংস্কার আর বঞ্চনাকে পেছনে ফেলে তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই পাঁচ 'অপরাজিতা’কে পাঁচটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে সম্মাননা দিয়েছে উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর । তাদের প্রত্যেকের জীবনকাহিনি যেন হার না মানা এক একটি অধ্যায়। কলারোয়া উপজেলার ‘অদম্য নারী পুরস্কার' ২০২৫ প্রাপ্তদের জীবনকাহিনি এখানে তুলে ধরা হলো: 

নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করা পারুল খাতুন।

তিনি কলারোয়ার সীমান্তবর্তী মাদরা গ্রামের সিরাজুল ইসলামের কন্যা। বাবা-মার অভাবের সংসার। ২০০৮ সালে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। স্বামী ভ্যানচালক। বিয়ের পর যৌতুকের দাবিতে তার ওপর শারীরিক ও মানুষিক নির্যাতন নেমে আসে। এর মধ্যে একটি কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। সন্তান জন্মের পর তার সঙ্গে স্বামীর মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয় এবং স্বামী তাকে তালাক দিয়ে দেন। তখন তিনি তার বাবার বাড়িতে চলে আসেন। নিরুপায় হয়ে দালালের মাধ্যমে চাকরির লোভে তিনি ভারতের মুম্বাই শহরে যান। সেখানে তিনি চরম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। পরে রাইটস, যশোর এনজিও এর মাধ্যমে দেশে ফিরে আসেন। বর্তমানে তিনি কৃষি কাজ, নকশি কাঁথা সেলাই ও দর্জির কাজ, হাঁস মুরগি পালন করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তিনি পূর্বের তুলনায় অনেক ভালো আছেন। সবকিছু ভুলে গিয়ে তিনি নতুনভাবে বাঁচার প্রেরণা পেয়েছেন। কোনো নির্যাতন তার জীবনের গতিপথ রুদ্ধ করতে পারেনি। কাজ করে তিনি এখন স্বাবলম্বী হয়েছেন। 

শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী কলারোয়া পৌরসভার মির্জাপুর গ্রামের আব্দুল খালেক খানের কন্যা নাজমুন নাহার। তিন বোন। বাবা সামান্য বেতনে চাকরি করতেন। বাবার আয়ের টাকা দিয়ে সংসার চালানো দুরূহ হয়ে পড়েছিল।

নাজমুন নাহার সবার বড়। বাবার কষ্ট তাকে খুবই ব্যথিত করতো। তিনি ১৯৯৩ সালে প্রাথমিক বৃত্তি
পরীক্ষায় ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পান। ১৯৯৮ সালে স্টার মার্কস পেয়ে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

২০০০ সালে তিনি বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। এরপর
বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজে সুযোগ পান। তাকে শিক্ষাজীবনে নানা অর্থনৈতিক
প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। বর্তমানে তিনি (বিসিএস স্বাস্থ্য) চিকিৎসক ও লেকচারার কমিউনিটি মেডিসিন, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজে কর্মরত আছেন। সীমাহীন প্রতিকূলতার মাঝে স্বপ্ন পূরণে দৃঢ় ছিলেন। শত বাধা বিপত্তি পেরিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে দেশের মানুষের সেবা করার প্রত্যয়ে নিয়োজিত আছেন তিনি।

সফল জননী নারী, উপজেলার দক্ষিণ ভাদিয়ালি গ্রামের রবিউল ইসলামের সহধর্মিণী ময়না খাতুন। স্বামী দিনমজুর। এক ছেলে এক মেয়ে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে পড়ালেখা করতে নিজে ঋণ নিয়ে এবং আত্মীয়-স্বজন, গ্রামের ধনী ব্যক্তিরা আর্থিকভাবে তাকে সহযোগিতা করেছেন। অনেক কষ্ট করে পুত্রকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। তার পুত্র সকল পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়।

২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষে সে নওগাঁ মেডিকেল কলেজে সুযোগ পেয়ে ভর্তি হয়। দারিদ্র্য, শত বাধা
উপেক্ষা করে ছেলেকে মেডিকেল কলেজে ভর্তি করিয়ে ভবিষ্যতে তার সন্তান দেশের একজন স্বনামধন্য
ডাক্তার হবে এ আশায় স্বপ্ন দেখছেন ময়না খাতুন।

অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জনকারী নারী উপজেলার কয়লা গ্রামের মমতাজ পারভীন। পিতা আব্দুর রউফ। বেকার স্বামীর অসচ্ছল সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর জন্য এনজিওতে চাকরি নেন। তাদের ঘরে একটি কন্যা সন্তানের জন্ম হয়।

স্বামী জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়লে তাদের মধ্যে মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়। স্বামী বাড়ি থেকে চলে
যান। নিরুদ্দেশ থাকেন দুই বছর। এরপর স্বামী তালাক দেন তাকে। মমতাজ বাবার বাড়িতে চলে আসেন। মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে দর্জির কাজ ও কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন তিনি। দিন দিন ব্যবসায় উন্নতি লাভ করতে থাকেন। ব্যবসারও প্রসার ঘটতে থাকে। তার অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো হতে থাকে। বর্তমানে তিনি
খুবই ভালো আছেন। তার কর্মকাণ্ড দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছেন এলাকার অনেক মহিলা।

সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন উপজেলার রাজনগর গ্রামের মৃত আজগর আলির স্ত্রী মনোয়ারা। সকল বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে নিজের ও সমাজের লোকদের ভাগ্য পরিবর্তন করার জন্য সেবামূলক কাজ করে গেছেন।

মহিলাদের স্বাবলম্বী করতে তিনি বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ রেখে প্রশিক্ষণের
ব্যবস্থা করেন। প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজে ও অসংখ্য অসচ্ছল মহিলাকে বাঁচার পথ দেখিয়েছেন। সমাজে নানা ধরনের অন্যায়, অসংগতি দূর করতে সফল উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি জনসেবা করতে গিয়ে মানুষের ভালোবাসায় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।

কলারোয়া উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নুরুন নাহার আক্তার বলেন, এই পাঁচ নারী সমাজের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। বিপন্ন অন্য নারীদেরকে তারা অনুপ্রাণিত করেছেন। তাদের এই জীবনসংগ্রাম নারীদের প্রতিকূলতা জয় করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগাবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow