বিশ্বকাপের মিশর-আর্জেন্টিনা ম্যাচ যেভাবে ফিলিস্তিন ইস্যুর প্রতীক হয়ে উঠল 

বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে মিশর ও আর্জেন্টিনার লড়াই শুধু ফুটবলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিতর্কিত রেফারিং, ভিএআর ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন এবং গ্যালারিতে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের পতাকা প্রদর্শনের ঘটনায় ম্যাচটি দ্রুতই ফিলিস্তিন ইস্যুকে ঘিরে বৈশ্বিক রাজনৈতিক বিতর্কের প্রতীক হয়ে ওঠে। ম্যাচে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকার সময় মিশরের দ্বিতীয় গোল বাতিল করা হয়। এছাড়া আর্জেন্টিনার একটি গোলের আগে ভিএআর পর্যালোচনার আবেদনও গ্রহণ করা হয়নি। এতে অনেক সমর্থক ও বিশ্লেষক অভিযোগ করেন, ভিএআর সমানভাবে ব্যবহার করা হয়নি এবং মিসরের ৩-২ গোলের হার ন্যায়সংগত ছিল না। মিশরের কোচ হোসাম হাসান ম্যাচ শেষে বলেন, খেলাটি ‘ন্যায্য হয়নি’। তিনি ইঙ্গিত দেন, ফিফা হয়তো আর্জেন্টিনা ও তাদের তারকা লিওনেল মেসিকে জেতাতে চেয়েছিল। পরে মিসর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দেয়। এই বিতর্কের আড়ালে আরও বড় একটি বিষয় সামনে এসেছে। ফিলিস্তিন ইস্যু এখন আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনেও রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ডে পরিণত হচ্ছে।  ম্যাচের আগে থেকেই কোচ হোসাম হাসান প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে আসছিলেন। ৩ জুলাই প্রথমবা

বিশ্বকাপের মিশর-আর্জেন্টিনা ম্যাচ যেভাবে ফিলিস্তিন ইস্যুর প্রতীক হয়ে উঠল 

বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে মিশর ও আর্জেন্টিনার লড়াই শুধু ফুটবলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিতর্কিত রেফারিং, ভিএআর ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন এবং গ্যালারিতে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের পতাকা প্রদর্শনের ঘটনায় ম্যাচটি দ্রুতই ফিলিস্তিন ইস্যুকে ঘিরে বৈশ্বিক রাজনৈতিক বিতর্কের প্রতীক হয়ে ওঠে।

ম্যাচে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকার সময় মিশরের দ্বিতীয় গোল বাতিল করা হয়। এছাড়া আর্জেন্টিনার একটি গোলের আগে ভিএআর পর্যালোচনার আবেদনও গ্রহণ করা হয়নি। এতে অনেক সমর্থক ও বিশ্লেষক অভিযোগ করেন, ভিএআর সমানভাবে ব্যবহার করা হয়নি এবং মিসরের ৩-২ গোলের হার ন্যায়সংগত ছিল না।

মিশরের কোচ হোসাম হাসান ম্যাচ শেষে বলেন, খেলাটি ‘ন্যায্য হয়নি’। তিনি ইঙ্গিত দেন, ফিফা হয়তো আর্জেন্টিনা ও তাদের তারকা লিওনেল মেসিকে জেতাতে চেয়েছিল। পরে মিসর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দেয়।

এই বিতর্কের আড়ালে আরও বড় একটি বিষয় সামনে এসেছে। ফিলিস্তিন ইস্যু এখন আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনেও রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ডে পরিণত হচ্ছে। 

ম্যাচের আগে থেকেই কোচ হোসাম হাসান প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে আসছিলেন। ৩ জুলাই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে মিসরের জয় পাওয়ার পর তিনি মাঠে ফিলিস্তিনের পতাকা ওড়ান এবং সেই জয় ফিলিস্তিনের জনগণকে উৎসর্গ করেন।

আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচের আগের সংবাদ সম্মেলনেও তিনি ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ নিয়ে আবেগঘন বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘যার ফিলিস্তিনিদের জন্য সহানুভূতি নেই, সে মানুষই নয়।’

ম্যাচ চলাকালে গ্যালারিতেও এই রাজনৈতিক মতপার্থক্যের প্রকাশ দেখা যায়। গাজার ফিলিস্তিনিরা মিসরের পতাকা উড়িয়ে দলটিকে সমর্থন জানান। অন্যদিকে স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার কিছু সমর্থক ইসরায়েলের পতাকা প্রদর্শন করলে মিসরের সমর্থকেরা ফিলিস্তিনের পতাকা তুলে ধরেন।   

আর্জেন্টিনার জনগণের একটি বড় অংশ ইসরায়েলের সমালোচক হলেও দেশটির বর্তমান সরকার ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই নিজেকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে জায়নবাদপন্থী প্রেসিডেন্ট’ বলে উল্লেখ করেছেন। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইসরায়েলের দৃঢ় সমর্থক। 

ট্রাম্প ও ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথাও কারো অজানা নয়। তাদের এ সম্পর্ক ফিফার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ফিফা ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর দ্রুত রাশিয়াকে নিষিদ্ধ করলেও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একই ধরনের ব্যবস্থা নেয়নি। এ নিয়েও ক্রীড়াঙ্গনে সমালোচনা রয়েছে।  

এসব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণেই মিসর-আর্জেন্টিনা ম্যাচের বিতর্ককে অনেকেই কেবল একটি ফুটবল ম্যাচ হিসেবে দেখেননি। বরং অনেক সমর্থকের কাছে এটি এমন একটি বিশ্বব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে, যেখানে শক্তিশালী পক্ষ তুলনামূলক বেশি সুবিধা পায় । এতে করে আস্থার সংকট তৈরি হয় নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর।

এর মানে এই নয় যে ফিফা গোপনে আর্জেন্টিনাকে জেতানোর ষড়যন্ত্র করেছে। ক্ষমতার প্রভাব সব সময় পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে কাজ করে না, কখনও তা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থার সংকটের মধ্য দিয়েও প্রকাশ পায়।

মিশর-আর্জেন্টিনা ম্যাচের বিতর্ক হয়তো দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকবে। তবে একইসঙ্গে বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে কোচ হোসাম হাসানের ফিলিস্তিনের পতাকা ওড়ানো এবং ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরার ঘটনাও অনেকের মনে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

লেখক: অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি, মিডিয়া স্টাডিজ প্রোগ্রাম, দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow