বিশ্বের প্রায় অর্ধেক সিগারেট বিক্রি হয় যে দেশে
২০১২ সালের এক উষ্ণ বসন্তের দিনে বেইজিংয়ে বিল গেটসের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন চীনের তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বৈঠক শেষে কক্ষ থেকে বের হওয়ার সময় তাদের আলোচনার মোড় ঘোরে ধূমপানের দিকে। আলোচনা হওয়াটাই স্বাভাবিক, কারণ বিশ্বের মোট উৎপাদিত ও বিক্রিত সিগারেটের প্রায় অর্ধেকই একা ব্যবহার করে চীন। শি জিনপিং সেদিন বিল গেটসকে বলেছিলেন, বহু বছর আগে ধূমপান ছেড়ে দেওয়ার পর তিনি এখন অনেক ভালো বোধ করছেন। তামাক ব্যবহারকে চীনের একটি মারাত্মক সমস্যা হিসেবেও অভিহিত করেছিলেন তিনি। পরের বছরই চীনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া শি জিনপিং প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ‘তামাক নিয়ন্ত্রণে তিনি কিছু একটা করবেন’। এর কিছুদিন পর বিল গেটসের সঙ্গে একটি তামাকবিরোধী প্রচারণায় অংশ নেন শি জিনপিংয়ের স্ত্রী ও জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী পেং লিউয়ান। কিন্তু এই ১৪ বছরে শি জিনপিং চীনের ইতিহাসের অন্যতম ক্ষমতাধর নেতা হয়ে উঠলেও দেশটিতে তামাক নিয়ন্ত্রণ বা গণপরিসরে ধূমপান নিষিদ্ধের জাতীয় আইন বাস্তবায়নের গতি অত্যন্ত ধীর। বিশ্বজুড়ে যেখানে সিগারেটের বিক্রি কমছে, চীন হাঁটছে ঠিক তার উল্টো পথে। বিশ্বে কমলেও চীনে বাড়ছে সিগারেটের বিক্রি সাবেক চীনা রোগ নিয়ন
২০১২ সালের এক উষ্ণ বসন্তের দিনে বেইজিংয়ে বিল গেটসের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন চীনের তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বৈঠক শেষে কক্ষ থেকে বের হওয়ার সময় তাদের আলোচনার মোড় ঘোরে ধূমপানের দিকে। আলোচনা হওয়াটাই স্বাভাবিক, কারণ বিশ্বের মোট উৎপাদিত ও বিক্রিত সিগারেটের প্রায় অর্ধেকই একা ব্যবহার করে চীন।
শি জিনপিং সেদিন বিল গেটসকে বলেছিলেন, বহু বছর আগে ধূমপান ছেড়ে দেওয়ার পর তিনি এখন অনেক ভালো বোধ করছেন। তামাক ব্যবহারকে চীনের একটি মারাত্মক সমস্যা হিসেবেও অভিহিত করেছিলেন তিনি। পরের বছরই চীনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া শি জিনপিং প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ‘তামাক নিয়ন্ত্রণে তিনি কিছু একটা করবেন’।
এর কিছুদিন পর বিল গেটসের সঙ্গে একটি তামাকবিরোধী প্রচারণায় অংশ নেন শি জিনপিংয়ের স্ত্রী ও জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী পেং লিউয়ান। কিন্তু এই ১৪ বছরে শি জিনপিং চীনের ইতিহাসের অন্যতম ক্ষমতাধর নেতা হয়ে উঠলেও দেশটিতে তামাক নিয়ন্ত্রণ বা গণপরিসরে ধূমপান নিষিদ্ধের জাতীয় আইন বাস্তবায়নের গতি অত্যন্ত ধীর। বিশ্বজুড়ে যেখানে সিগারেটের বিক্রি কমছে, চীন হাঁটছে ঠিক তার উল্টো পথে।
বিশ্বে কমলেও চীনে বাড়ছে সিগারেটের বিক্রি
সাবেক চীনা রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) কর্মকর্তাদের গড়া একটি বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে সিগারেটের ব্যবহার ২৬ শতাংশ কমেছে। কিন্তু এই একই সময়ে চীনে সিগারেটের ব্যবহার উল্টো ৩৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে!
আরও পড়ুন>>
ধূমপানের জন্য ক্যাম্পাসে আরও বেঞ্চ দেওয়ার দাবি শিক্ষার্থীর
প্লেনের ভেতর বিড়ি জ্বালানোয় যাত্রীর বিরুদ্ধে মামলা
দেশে ই-সিগারেট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করলো সরকার
বর্তমানে চীনে প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি (২ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন) স্টিক সিগারেট বিক্রি হয়, যা বিশ্বজুড়ে মোট বিক্রি হওয়া সিগারেটের প্রায় অর্ধেক। তরুণদের মধ্যে ধূমপানের হার কিছুটা কমলেও সামগ্রিকভাবে দেশটিতে সিগারেটের বিক্রি বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। এর অন্যতম প্রধান কারণ কম দাম; চীনে এক প্যাকেট সিগারেটের গড় মূল্য মাত্র তিন ডলার, যা আমেরিকার তুলনায় প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ।
তামাক কোম্পানির ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাব
চীনে সিগারেট বিক্রি কমানোর এই ব্যর্থতার পেছনে রয়েছে ‘স্টেট টোব্যাকো মনোপলি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’-এর বিশাল প্রভাব। এই সরকারি সংস্থাই দেশটির তামাক খাত নিয়ন্ত্রণ করে, আবার তাদের অধীনেই পরিচালিত হয় বিশ্বের বৃহত্তম সিগারেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘চীন ন্যাশনাল টোব্যাকো কর্পোরেশন’।
২০২৫ সালে এই তামাক কোম্পানিটি থেকে সরকারের লাভ ও কর বাবদ রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ২৪ হাজার ৪০০ কোটি (২৪৪ বিলিয়ন) ডলার। এটি চীনের মোট জাতীয় রাজস্বের প্রায় সাত শতাংশ এবং দেশটির ঘোষিত বার্ষিক প্রতিরক্ষা বাজেটের প্রায় সমপরিমাণ!
অর্থনৈতিক মন্দা এবং আবাসন খাতের সংকটের কারণে চীনের স্থানীয় সরকারগুলোর যখন আয়ের উৎস কমছে, তখন এই তামাকের রাজস্বই হয়ে উঠেছে তাদের মূল ভরসা। শুধু তাই নয়, এই তামাক খাতের মুনাফা শি জিনপিংয়ের কিছু কৌশলগত এজেন্ডাতেও অর্থায়ন করছে। গত বছর এই তামাক প্রশাসন চীনের একটি অন্যতম বৃহৎ ব্যাংকের আর্থিক সংকট কাটাতে ১০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে। এ ছাড়া দেশটির ১০ হাজার কোটি ডলারের জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর (চিপ) ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডেও তারা একটি বড় অংশীদার।
জাতীয় নিষেধাজ্ঞা আটকে দিয়েছে তামাক লবি
২০১৭ সালের দিকে চীনে ইনডোর বা গণপরিসরে ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার জন্য একটি জাতীয় আইনের জোর প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। কিন্তু তামাক প্রশাসনের তীব্র লবিংয়ের মুখে সেই আইন আটকে যায়। দায় ঠেলে দেওয়া হয় স্থানীয় সরকারগুলোর ওপর, যেখানে আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল।
আমেরিকা বা পশ্চিমা দেশগুলোর সিগারেটের প্যাকেটে যেখানে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির ছবি দেওয়া থাকে, সেখানে চীনের সিগারেটের প্যাকেটে পান্ডা বা ঐতিহাসিক ‘গেট অব হেভেনলি পিস’-এর মতো জাতীয় প্রতীকের ছবির পাশে কেবল এক লাইনের একটি সতর্কবার্তা দেওয়া থাকে।
চীনের সিডিসির ২০২২ সালের একটি গবেষণায় সরাসরি বলা হয়েছে, সরকারি তামাক একচেটিয়া ব্যবসার হস্তক্ষেপ এবং তামাকের প্রতি সরকারের ‘দ্ব্যর্থবোধক দৃষ্টিভঙ্গি’র কারণেই দেশটিতে ধূমপান নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
স্থানীয় বাজেটের অর্ধেকই আসে তামাক থেকে
কোভিড-১৯ মহামারির পর গণ-টেস্টিংয়ের খরচ মেলাতে গিয়ে চীনের স্থানীয় সরকারগুলো যখন চরম আর্থিক সংকটে পড়ে, তখন তামাক ব্যুরোগুলোর প্রভাব আরও বাড়ে। বেইজিংয়ের ইউনিভার্সিটি অব ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের অধ্যাপক ঝেং রং জানান, চীনে বিক্রি হওয়া প্রতিটি সিগারেটের মূল্যের প্রায় অর্ধেক টাকা সরাসরি সরকারের তহবিলে যায়।
চীনের প্রধান তামাক উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোতে এই নির্ভরশীলতা আরও তীব্র। যেমন—২০২৪ সালে ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিংয়ের মোট সিটি বাজেটের অর্ধেকেরও বেশি এসেছে তামাকের কর থেকে। একইভাবে ২০২২ সালে হুনান প্রদেশের চাংদে শহরের কর রাজস্বের ২০ শতাংশই এসেছে তামাক খাত থেকে।
থমকে গেছে শি জিনপিংয়ের উদ্যোগ
ক্ষমতায় আসার পরপরই ২০১৩ সালে শি জিনপিং সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য সরকারি অনুষ্ঠান এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে ধূমপান নিষিদ্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এর ফলে বেইজিংয়ের মতো বড় শহরগুলোতে কিছু ইনডোর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছিল। ২০১৫ সালে তামাকের কর বাড়িয়ে সিগারেটের দাম ১০ শতাংশ বাড়ানো হয়।
কিন্তু এরপরই যেন সব গতি হারিয়ে ফেলে। ২০১৫ সালের পর চীন বিদেশি বেসরকারি সংস্থাগুলোর ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে, যারা মূলত চীনের তামাকবিরোধী প্রচারণায় বড় তহবিল জোগান দিত। তহবিল বন্ধ হওয়ায় প্রচারণাগুলো ঝিমিয়ে পড়ে।
স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ম্যাথিউ কোহরম্যান জানান, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে অনেকেই মানসিক চাপ কমাতে নিকোটিন বা ধূমপানের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। আর তামাক আইন বাস্তবায়নে শিথিলতার কারণে মানুষ যেকোনো জায়গায় সহজেই ধূমপান করতে পারছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
কেএএ/
What's Your Reaction?