‘বুক ফাটা কান্না নিয়ে ১২ বছর ধরে অপেক্ষায় আছি’
‘বুক ফাটা কান্না নিয়ে ১২ বছর ধরে অপেক্ষা করছি সাত খুন মামলার রায় কবে কার্যকর হবে? আমাদের চোখের পানি শুকিয়ে গেছে, স্বজনদের ছবি আর তাদের জীবদ্দশায় নানা স্মৃতিচারণই এখন আমাদের সম্বল, মরে যাওয়ার আগে খুনি হত্যাকারীদের ফাঁসির রায় দেখে যেতে পারলে মরেও শান্তি পেতাম।’ সোমবার (২৭ এপ্রিল) বেলা ১১টায় সিদ্ধিরগঞ্জের মৌচাক বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সাত খুন মামলার রায় কার্যকরের দাবিতে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে এ কথাগুলো বলেন সাত খুন মামলায় নিহতের স্বজনদের পরিবারের সদস্যরা। মানববন্ধনে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা জানান, দীর্ঘ ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো এই বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের রায় কার্যকর হয়নি, যা তাদের জন্য চরম হতাশা ও বেদনার। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী মামলার বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি মানববন্ধনে কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, ২০১৪ সালের সেই নির্মম হত্যাকাণ্ড দেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। তিনি অভিযোগ করেন, নূর হোসেনের প্রভাবে র্যাব সদস্যদের মাধ্যমে অমানবিক নির্যাতন চালিয়ে সাতজনকে হত্যা করে মরদেহ শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। আমরা ১২ বছর ধরে বুকভর
‘বুক ফাটা কান্না নিয়ে ১২ বছর ধরে অপেক্ষা করছি সাত খুন মামলার রায় কবে কার্যকর হবে? আমাদের চোখের পানি শুকিয়ে গেছে, স্বজনদের ছবি আর তাদের জীবদ্দশায় নানা স্মৃতিচারণই এখন আমাদের সম্বল, মরে যাওয়ার আগে খুনি হত্যাকারীদের ফাঁসির রায় দেখে যেতে পারলে মরেও শান্তি পেতাম।’
সোমবার (২৭ এপ্রিল) বেলা ১১টায় সিদ্ধিরগঞ্জের মৌচাক বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সাত খুন মামলার রায় কার্যকরের দাবিতে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে এ কথাগুলো বলেন সাত খুন মামলায় নিহতের স্বজনদের পরিবারের সদস্যরা।
মানববন্ধনে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা জানান, দীর্ঘ ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো এই বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের রায় কার্যকর হয়নি, যা তাদের জন্য চরম হতাশা ও বেদনার।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী মামলার বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি মানববন্ধনে কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, ২০১৪ সালের সেই নির্মম হত্যাকাণ্ড দেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে।
তিনি অভিযোগ করেন, নূর হোসেনের প্রভাবে র্যাব সদস্যদের মাধ্যমে অমানবিক নির্যাতন চালিয়ে সাতজনকে হত্যা করে মরদেহ শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। আমরা ১২ বছর ধরে বুকভরা কষ্ট নিয়ে বেঁচে আছি। আমাদের একটাই দাবি—এই হত্যার বিচার যেন জীবিত অবস্থায় দেখে যেতে পারি।
তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত এই মামলার রায় কার্যকর করা জরুরি। একইসঙ্গে তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল, আইনমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
নিহত জাহাঙ্গীরের স্ত্রী সামছুন নাহার নুপুর বলেন, আমার সন্তান বাবাকে খুঁজে ফেরে, কিন্তু আমি তাকে তার বাবাকে ফিরিয়ে দিতে পারি না। ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার কার্যকর হয়নি। আমি দ্রুত এই রায় কার্যকর দেখতে চাই। এই হত্যাকাণ্ডে শুধু সাতজন মানুষ নয়, ধ্বংস হয়েছে সাতটি পরিবার।
সাত খুনে নিহত তাজুল ইসলামের পিতা আবুল খায়ের জানান, মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে আপিল বিভাগে ঝুলে আছে, যা তাদের কাছে বোধগম্য নয়। তিনি দ্রুত বিচার কার্যকরের দাবি জানান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
অপরদিকে বেলা ১১টায় মামলার রায় দ্রুত কার্যকরের দাবিতে জেলা আইনজীবী সমিতি প্রাঙ্গণে মানববন্ধন করেছেন আইনজীবী সমিতির সদস্যরা। একইসঙ্গে এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবিও জানান তারা।
সমিতির সভাপতি সরকার হুমায়ুন কবিরের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন প্রধানের সঞ্চালনায় এ মানববন্ধনে প্রধান অতিথি ছিলেন মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান। এ ছাড়া এতে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দেন নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ্ আল আমিন, জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবুল কালাম আজাদ জাকির, নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালের পিপি খোরশেদ আলম মোল্লা, জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন প্রমুখ।
মামলার আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, সাত খুনের ঘটনার পর জড়িত আসামিদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে আন্দোলন–সংগ্রাম করতে হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডের বিচারের রায় অবিলম্বে কার্যকর করা হোক। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কার্যকর হলে যারা গুম খুন করে, আসামিপক্ষ যত শক্তিশালী বা প্রভাবশালী হোক না কেন, তারা আইনের আওতায় আসবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ কমবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।
সাখাওয়াত হোসেন আরও বলেন, যারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, তাদের পরিবারগুলো মানবেতর জীবন যাপন করছে। যেহেতু প্রশিক্ষিত বাহিনীর দ্বারা এসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, তাই রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ্ আল আমিন বলেন, অতীতে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে গডফাদার ওসমান পরিবারের সম্পর্ক আছে। এই সাত খুন ও ত্বকী হত্যার মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনাগুলোয় কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো প্রশাসন ও সরকারের পক্ষ থেকে গডফাদারদের প্রতি একধরনের প্রোটেকশন ছিল। আমরা চাই, অপরাধী যে কেউ হলেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সাত খুন মামলাটি আপিল বিভাগে ঝুলে আছে, বিষয়টি আশু নিষ্পত্তি হবে এবং রায় কার্যকর হবে।
প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সাত খুন যা বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত ও নৃশংস একটি হত্যাকাণ্ড। এ ঘটনায় ২০১৪ সালের ১১ মে হাইকোর্ট এক আদেশে র্যাব-১১-এর তৎকালীন অধিনায়ক লে. কর্নেল তারেক সাঈদ, মেজর আরিফ হোসেন এবং লে. কমান্ডার এম এম রানাকে অবিলম্বে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন।
আদালতের নির্দেশে ১৬ মে লে. কর্নেল তারেক সাঈদ এবং মেজর আরিফ হোসেনকে ঢাকা সেনানিবাস এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পরে সাত খুনের দায়েরকৃত মামলায় দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত মামলার রায় প্রদান করেন। রায়ে সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন ও র্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ মোট ২৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন আদালত। একই বছর ২২ আগস্ট হাইকোর্ট সেই রায়ের পর্যালোচনায় ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন এবং বাকি ১১ জনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
বর্তমানে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা আসামিদের মধ্যে রয়েছেন র্যাব-১১-এর চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ মুহাম্মদ, মেজর (অব.) আরিফ হোসেন ও লে. কমান্ডার (অব.) মাসুদ রানা। এ ছাড়া বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আরও নয়জন র্যাবের বরখাস্ত কর্মকর্তা ও সদস্যও রয়েছেন।
২০১৮ সালের ১৯ নভেম্বর হাইকোর্টে সাত খুন মামলার রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করে। রায়ের কপি নিয়ে আসামিপক্ষ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করেন। সুপ্রিম কোর্ট আবেদন আমলে নেয়। সেই থেকে মামলাটি আপিল বিভাগে ঝুলে আছে শুনানির জন্য। গত ১২ বছরে একটি শুনানিও হয়নি।
What's Your Reaction?