বুদ্ধ পূর্ণিমায় পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারে রাতের স্মৃতি
বুদ্ধ পূর্ণিমার জ্যোৎস্নায় পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারে দাঁড়িয়ে হারানো ইতিহাস, জ্ঞানসভ্যতা ও আত্মঅনুসন্ধানের গভীর অলৌকিক রাতের স্মৃতি জমা হলো আজ। আজকের রাতটি কেবল একটি রাত নয়, যেন সময়ের গভীর গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া বিস্মৃত যুগের দরজা খুলে বসে থাকা অলৌকিক প্রহর। আমি দাঁড়িয়ে আছি পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, যাকে অনেকে সোমপুর মহাবিহার নামেও চেনেন। চারদিকে নিস্তব্ধতা, ইতিহাসের ভারে নুয়ে থাকা ইটের দেওয়াল আর আকাশভরা পূর্ণিমার আলো—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে আমি আর বর্তমানের মানুষ নই, আমি যেন হারিয়ে গেছি বারোশ বছরের পুরোনো এক জগতে। আজ বুদ্ধ পূর্ণিমা। এই পবিত্র রাত যেন এই প্রাচীন মহাবিহারকে নতুন করে প্রাণ দিয়েছে। চাঁদের সাদা আলো পড়ে আছে ধ্বংসপ্রাপ্ত স্তম্ভগুলোর ওপর, আর সেই আলোয় যেন জীবন্ত হয়ে উঠছে ইতিহাস। মনে হচ্ছে, এই ইটগুলো কথা বলছে, এই দেওয়ালগুলো নিঃশব্দে গল্প শোনাচ্ছে বুদ্ধ পূর্ণিমার জ্যোৎস্নায় পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারে দাঁড়িয়ে হারানো ইতিহাস, জ্ঞানসভ্যতা ও আত্মঅনুসন্ধানের গভীর অলৌকিক রাতের স্মৃতি একটি সভ্যতার, একটি জ্ঞানচর্চার, একটি গৌরবময় অতীতের গল্প। চারিদিকে অদ্ভুত এক নীরবতা। মাঝে মাঝে দূরে কোথাও খেকশিয়ালের ডাক ভ
বুদ্ধ পূর্ণিমার জ্যোৎস্নায় পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারে দাঁড়িয়ে হারানো ইতিহাস, জ্ঞানসভ্যতা ও আত্মঅনুসন্ধানের গভীর অলৌকিক রাতের স্মৃতি জমা হলো আজ। আজকের রাতটি কেবল একটি রাত নয়, যেন সময়ের গভীর গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া বিস্মৃত যুগের দরজা খুলে বসে থাকা অলৌকিক প্রহর। আমি দাঁড়িয়ে আছি পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, যাকে অনেকে সোমপুর মহাবিহার নামেও চেনেন। চারদিকে নিস্তব্ধতা, ইতিহাসের ভারে নুয়ে থাকা ইটের দেওয়াল আর আকাশভরা পূর্ণিমার আলো—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে আমি আর বর্তমানের মানুষ নই, আমি যেন হারিয়ে গেছি বারোশ বছরের পুরোনো এক জগতে।
আজ বুদ্ধ পূর্ণিমা। এই পবিত্র রাত যেন এই প্রাচীন মহাবিহারকে নতুন করে প্রাণ দিয়েছে। চাঁদের সাদা আলো পড়ে আছে ধ্বংসপ্রাপ্ত স্তম্ভগুলোর ওপর, আর সেই আলোয় যেন জীবন্ত হয়ে উঠছে ইতিহাস। মনে হচ্ছে, এই ইটগুলো কথা বলছে, এই দেওয়ালগুলো নিঃশব্দে গল্প শোনাচ্ছে বুদ্ধ পূর্ণিমার জ্যোৎস্নায় পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারে দাঁড়িয়ে হারানো ইতিহাস, জ্ঞানসভ্যতা ও আত্মঅনুসন্ধানের গভীর অলৌকিক রাতের স্মৃতি একটি সভ্যতার, একটি জ্ঞানচর্চার, একটি গৌরবময় অতীতের গল্প।
চারিদিকে অদ্ভুত এক নীরবতা। মাঝে মাঝে দূরে কোথাও খেকশিয়ালের ডাক ভেসে আসছে। সেই ডাক যেন রাতের নিস্তব্ধতাকে আরও গভীর করে তুলছে। বাতাসে এক ধরনের শীতলতা কিন্তু সেই শীতলতার ভেতরেও আছে রহস্যময় উষ্ণতা; যেন অতীতের স্মৃতি আমাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। এই পরিবেশে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে হলো মানুষ আসলে কত ক্ষণস্থায়ী আর ইতিহাস কত দীর্ঘ, কত গভীর!
আমি তাকিয়ে আছি এই বিশাল স্থাপনার দিকে। আজ এটি ধ্বংসস্তূপ—কিন্তু একসময় এটি ছিল জ্ঞানের এক বিশাল মহাসমুদ্র। ভাবতেই অবাক লাগে, যখন পৃথিবীর অনেক সভ্যতা তখনো তাদের পূর্ণ বিকাশে পৌঁছায়নি, যখন ডিসকভারি অব আমেরিকা ঘটেনি, যখন ইউরোপিয়ান ডিসকভারি অব অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাস লেখা হয়নি; তখন এই বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে ছিল এমন এক বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে সারা পৃথিবী থেকে ছাত্ররা আসতেন জ্ঞান অর্জনের জন্য।
এই মহাবিহার কেবল একটি ধর্মীয় স্থান ছিল না, এটি ছিল আন্তর্জাতিক শিক্ষাকেন্দ্র। চীন, তিব্বত, মায়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া—দূর-দূরান্ত থেকে জ্ঞানপিপাসু মানুষ এখানে আসতো। এখানে তারা শিখতেন দর্শন, ধর্ম, সাহিত্য, বিজ্ঞান মানবজীবনের নানা দিক। ভাবতে অবাক লাগে, আজ আমরা উন্নত বিশ্বের দিকে তাকিয়ে থাকি, অথচ একসময় এই বাংলাই ছিল জ্ঞানের আলোকবর্তিকা। এ মহাবিহারের প্রতিষ্ঠাতা ধর্মপাল পাল রাজবংশের এক মহান শাসক। তাঁর হাত ধরেই গড়ে উঠেছিল এ বিশাল প্রতিষ্ঠান। সেই সময় পাল রাজবংশ শুধু একটি রাজ্য শাসন করছিল না, তারা গড়ে তুলছিল জ্ঞানভিত্তিক সভ্যতা। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় সোমপুর মহাবিহার হয়ে উঠেছিল অনন্য শিক্ষাকেন্দ্র।
আমি যখন এই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকি, তখন মনে হয় জায়গাটিতে একসময় কত জীবন চলাচল করতো! ভিক্ষুরা ধ্যান করতেন, ছাত্ররা পাঠ নিতেন, গুরুদের কণ্ঠে উচ্চারিত হতো জ্ঞানের বাণী। সেই কণ্ঠগুলো আজ নেই, কিন্তু তাদের প্রতিধ্বনি যেন এখনো ভেসে বেড়াচ্ছে এই বাতাসে। বিশেষ করে আজকের পূর্ণিমা রাত যেন সেই অতীতকে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরছে। চাঁদের আলোয় এ মহাবিহারের প্রতিটি অংশ যেন নতুন করে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছে, আমি যদি একটু মনোযোগ দিয়ে শুনি, তাহলে হয়তো শুনতে পাবো সেই প্রাচীন স্তোত্র, সেই ধ্যানের মন্ত্র, সেই শিক্ষার শব্দ।
জায়গাটির সঙ্গে তুলনা করা হয় নালন্দা মহাবিহারের সঙ্গে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, পাহাড়পুরের নিজস্ব এক মহিমা আছে। যা অন্য কোথাও নেই। এটি শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি একটি অনুভূতি, একটি ইতিহাস, একটি আত্মপরিচয়। তখনই মনে হয় বাংলাদেশকে যদি পৃথিবীর কাছে পরিচয় করাতে হয়, তাহলে এই পাহাড়পুর অবশ্যই তার অন্যতম মুখ হতে পারে। যেমন সুন্দরবন আমাদের প্রকৃতির বিস্ময়, তেমনি পাহাড়পুর আমাদের ইতিহাসের গৌরব।
রাত যত গভীর হচ্ছে, আমার ভেতরের অনুভূতিগুলোও তত গভীর হচ্ছে। আমি হাঁটছি ধীরে ধীরে এই প্রাচীন ইটের পথ ধরে। প্রতিটি পদক্ষেপে মনে হচ্ছে, আমি ইতিহাসের ওপর দিয়ে হাঁটছি। এই পথ দিয়ে হয়তো কোনো একদিন অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান হেঁটে গিয়েছিলেন, তাঁর চিন্তায় ডুবে, তাঁর জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে।
এই নিস্তব্ধ রাত আমাকে অনেক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। আমরা কি সত্যিই আমাদের ইতিহাসকে বুঝি? আমরা কি জানি, এই মাটির ভেতরে কত গল্প লুকিয়ে আছে? আমরা কি উপলব্ধি করি, আমাদের পূর্বপুরুষরা কতটা সমৃদ্ধ একটি সভ্যতা গড়ে তুলেছিল? পাহাড়পুরে দাঁড়িয়ে মনে হয় আমরা যেন সেই ইতিহাস থেকে অনেক দূরে সরে গেছি। আমরা আজকের ব্যস্ত জীবনে ভুলে গেছি আমাদের শেকড়, আমাদের পরিচয়। অথচ এই ধ্বংসপ্রাপ্ত ইটগুলো এখনো দাঁড়িয়ে আছে নীরবে, অবিচলভাবে আমাদের সেই অতীতের কথা মনে করিয়ে দিতে।
পূর্ণিমার আলো ধীরে ধীরে আরও উজ্জ্বল হচ্ছে। আমি আকাশের দিকে তাকাই একটি পূর্ণ চাঁদ, বিশাল, উজ্জ্বল, নিঃশব্দ। মনে হয়, এই চাঁদই হয়তো সেই চাঁদ, যা বারোশ বছর আগে এই মহাবিহারের ওপর আলো ফেলেছিল। সেই একই আলো, একই আকাশ কিন্তু মানুষ বদলে গেছে, সময় বদলে গেছে। এ অভিজ্ঞতা শুধু একটি ভ্রমণ নয়, এটি এক ধরনের আত্মঅনুসন্ধান। এখানে এসে আমি শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থান দেখি না, আমি দেখি আমার নিজের শেকড়, আমার নিজের পরিচয়। আমি অনুভব করি, আমি এই ইতিহাসেরই একটি অংশ।
রাতের শেষ প্রহরে দাঁড়িয়ে আমি অনুভব করি পাহাড়পুর আমাকে বদলে দিয়েছে। এই জায়গা আমাকে শিখিয়েছে, ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় নয়, এটি আমাদের চারপাশে, আমাদের ভেতরে, আমাদের অস্তিত্বে। আজকের এই বুদ্ধ পূর্ণিমার রাতে, এই প্রাচীন মহাবিহারের মাঝে দাঁড়িয়ে আমি যেন নতুন করে উপলব্ধি করি জ্ঞান, ইতিহাস আর মানুষের চিরন্তন যাত্রা কখনো থেমে থাকে না।
এসইউ
What's Your Reaction?