ভবদহের ‘দুঃখ’ ঘোচাতে ১৯০ কোটি টাকার প্রকল্প

2 days ago 9

১৪০ কোটি টাকা ব্যয় হবে নদী খননে
নতুন মেশিন ‘ওয়াটার মাস্টার’ যুক্ত হচ্ছে খনন কাজে
বাস্তবায়নে সেনাবাহিনী

ভবদহ অঞ্চলের চার দশকের দুঃখ ঘোচাতে প্রায় ১৯০ কোটি টাকার একগুচ্ছ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। প্রকল্পগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এই অঞ্চলের স্থানীয় জলাবদ্ধতার অবসানের সম্ভাবনা দেখছেন স্থানীয় জনগণ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ (পাউবো) সংশ্লিষ্টরা। এই অঞ্চলের জলাবদ্ধ লাখো মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে এরইমধ্যে প্রকল্পগুলো একনেকে অনুমোদন হয়েছে।

প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ভবদহ সংলগ্ন ৮১ কিলোমিটার নদী খনন ও ৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে আমডাঙ্গা খাল খনন এবং বেড়িবাঁধ নির্মাণ।

ভবদহের ‘দুঃখ’ ঘোচাতে ১৯০ কোটি টাকার প্রকল্প

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে আগামী মাস থেকে শুরু হতে যাচ্ছে ৮১ কিলোমিটার নদী খননের কাজ। এর আগে আমডাঙ্গা খাল খনন ও বেড়িবাঁধ নির্মাণের ৪৯ কোটি টাকার অনুমোদন দেওয়া হয়। চলতি মাসে লেফটেন্যান্ট কর্নেল এবং মেজর পদমর্যাদার সেনাবাহিনীর প্রকৌশল কোরের নেতৃত্বে ভবদহ এলাকায় সমীক্ষা চলেছে।

এদিকে টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) নাকি আরও উন্নত প্রযুক্তিতে পলি অপসারণ হবে—এ নিয়ে ভবদহ এলাকায় সমীক্ষা চালাচ্ছে আইডব্লিউএম (ইনস্টিটিউট অব ওয়ার মডেলিং)। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন এবং সেনাবহিনীর সঙ্গে পাউবোর এমওইউ বা সমঝোতা স্মারক হলেই পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি সাপেক্ষে কাজ শুরু হবে বলে পাউবো সূত্রে জানা গেছে।

ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি ও স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ ৪৪ বছর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই জনপদের মানুষ স্থায়ী জলাবদ্ধতার শিকার। ভবদহ স্লুইস গেট প্রস্তাবসহ নদী পানি ব্যবস্থাপনার প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ওপর হস্তক্ষেপ এর কারণ। এই জনপদে ভবদহ স্লুইস গেট একটি মরণ ফাঁদ। এর কোনো কার্যকারিতা এবং তার পানি নিষ্কাশনের ক্ষমতাও নেই। পাম্পের মাধ্যমে সেচ প্রকল্প তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। ২০০-৩০০ ফুট প্রশস্ত ও সুগভীর নদী হত্যা করা হয়েছে। ৪৪ বছরে সংস্কারের নামে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় পানি উন্নয়ন বোর্ড ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ও ঠিকাদার চক্রের সিন্ডিকেট লুটপাটের সুবিধার্থেই তা করা হয়েছে বলে প্রমাণিত হয়েছে।

ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ জানান, জলাবদ্ধতা দূরীকরণে জনগণ উদ্ভাবিত টিআরএম প্রকল্প গণআন্দোলনে গৃহীত হলেও বিগত সরকার ২০১২ সালে ‘সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর হামলার’ অজুহাতে বাতিল করে দেয়। এখন এই জনপদের মণিরামপুর, কেশবপুর বা অভয়নগর শুধু নয়, জলাবদ্ধতা বিস্তৃত হয়েছে খুলনার ডুমুরিয়া ও যশোর শহর পর্যন্ত।

ভবদহের ‘দুঃখ’ ঘোচাতে ১৯০ কোটি টাকার প্রকল্প

ভবদহ অঞ্চলের বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে এ পর্যন্ত প্রায় হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সিংহভাগ অর্থ লুটপাট হয়েছে বলে দাবি পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটিসহ ভুক্তভোগীদের। ১৯৯৬ সালে কেজেডিআরপির (খুলনা-যশোর ড্রেনেজ রিহেবিলেশন প্রকল্প) আওতায় ২২৯ কোটি, ২০০২ সালে খুলনা-যশোর পানি নিষ্কাশন প্রকল্পের আওতায় ২৫২ কোটি, ২০০৬ সালে ৬৯ কোটি, ২০১১ সালে ৭১ কোটি, ২০১৪ সালে ৪৪ কোটি, পাম্প ও বিভিন্ন সময় পলি অপসারণসহ নানা প্রকল্পে সবমিলিয়ে প্রায় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে।

জলাবদ্ধতার স্থায়ী সংকটের এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ভবদহ অঞ্চলের চার দশকের দুঃখ ঘোচাতে সরবশেষ প্রায় ১৯০ কোটি টাকার একগুচ্ছ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ভবদহ সংলগ্ন ৮১ কিলোমিটার নদী খনন ও ৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে আমডাঙ্গা খাল খনন এবং বেড়িবাঁধ নির্মাণ।

আমডাঙ্গা খাল খনন প্রকল্প

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী জানান, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আমডাঙ্গা খাল খননে ৪৯ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এরইমধ্যে জমি অধিগ্রহণের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে। পাউবোর সঙ্গে ডিএলএস বা জমি অধিগ্রহণ সমঝোতা হলেই কাজ শুরু হবে। এরমধ্যে জিকরা খাল পর্যন্ত ২.২ কিলোমিটার আমডাঙ্গা খাল প্রশস্তকরণ ও গভীর করে খনন করা হবে এবং এই মাটি দিয়ে একই সঙ্গে খালের দুই ধারে নির্মাণ করা হবে বাঁধ।

ভবদহের ‘দুঃখ’ ঘোচাতে ১৯০ কোটি টাকার প্রকল্প

তিনি আরও জানান, দুটি কালভার্ট খালের প্রশস্তের সমানসহ আমডাঙ্গা খালের রেগুলেটর থেকে ভৈরব নদ পর্যন্ত ৩৩ ফুট প্রশস্ত ও গভীর করে ৪৫০ মিটার আরসিসি ইউ ড্রেন করা হবে। মানুষের ভোগান্তি না হয়, সেজন্য ইউ-ড্রেনের ওপর নির্মাণ করা হব দুটি ছোট সেতু। পাশাপাশি ইউ-ড্রেনের দুই পাশে মানুষের চলাচলের জন্য পাঁচ ফুট প্রশস্তের রাস্তা নির্মাণ করা হবে।

নদী খনন প্রকল্প

বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮১.৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের আপার ভদ্রা, হরিহর, হরি, টেকা ও শ্রী নদী খনন করা হবে। এরইমধ্যে গৃহীত এই প্রকল্পের সব পর্যায়ের কাজ সম্পন্ন করে গত ১৯ জুন একনেকের সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়। চলতি মাসের ১৭-১৮ তারিখ লেফটেন্যান্ট কর্নেল এবং মেজর পদমর্যাদার সেনাবাহিনীর প্রকৌশল কোরের নেতৃত্বে ভবদহ এলাকায় সমীক্ষা চলেছে। এই কাজ সেনাবাহিনীর তত্ত্ববধানে শুরু হবে। ভবদহে সমীক্ষাকারী আইডব্লিউএমের প্রতিবেদন এবং সেনাবহিনীর সঙ্গে পাউবোর এমওইউ হলেই পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি সাপেক্ষে আগামী সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে কাজের উদ্বোধন হবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

ওয়াটার মাস্টার মেশিন ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পাম্প প্রকল্প

দেশে প্রথমবারের মতো কেনা হচ্ছে ওয়াটার মাস্টার মেশিন। এই মেশিন একইসঙ্গে নদী খনন, পলি অপসারণ, ড্রেজিং এবং কচুরিপানা অপসারণ করতে সক্ষম, যা বছরজুড়েই ভবদহ এলাকায় থাকবে। ৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে সুইডেন থেকে কেনা হচ্ছে এই মেশিন। এছাড়া ৩৫ কিইসেক পানি অপসারণ কেনা হচ্ছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন আটটি পাম্প। যার পাঁচটি ভবদহে স্থাপন করা হবে এবং কেশবপুর উপজেলার বিলখুকশিয়ায় সাবস্টেশনসহ বাকি তিনটি পাম্প স্থাপন করা হবে। এই প্রকল্পে ৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। পানি সম্পদ মন্ত্রাণালয়ের দাপ্তরিক কাজ শেষ হলেই অনলাইন টেন্ডারিং করা হবে।

ভবদহের ‘দুঃখ’ ঘোচাতে ১৯০ কোটি টাকার প্রকল্প

ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতা বিশ্বজিত জানান, ২০০৬ সালে ৬৯ কোটি টাকা ব্যয়ে বিল খুকশিয়ায় টিআরএম প্রকল্পের বাস্তবায়ন করা হয়। কৃষকরা ঠিকমতো ক্ষতিপূরণ পান। কিন্তু ২০১১ সালে ৭১ কোটি টাকা ব্যয়ে বিল কপালিয়ায় টিআএম প্রকল্প চালুর উদ্যোগ নিলেও কৃষকদের ক্ষতিপূরণ নিয়ে নানা টালবাহানা চলে। এতে ফুঁসে ওঠেন স্থানীয়রা। এক পর্যায়ে কৃষকদের ক্ষতিপূরণ ছাড়াই ২০১২ সালের ৫ মে টিআরএম উদ্বোধনের উদ্যোগ নেওয়া হলে তৎকালীন হুইপ আব্দুল ওহাবসহ পাউবোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কৃষকদের তোপের মুখে পড়েন এবং হামলার শিকার হন। এতে হুইপসহ কর্মকর্তার একাধিক গাড়ি ভাংচুর অগ্নিসংযোগ করেন বিক্ষুব্ধ কৃষকরা।

পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রণজিৎ বাওয়ালি জানান, আগের যত প্রকল্প সবই লুটপাট হয়েছে। তাদের বরাবরই দাবি ছিল, সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ভবদহ প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন।

কার্ত্তিক মল্লিক, কাকলী রাণী, উৎপল বিশ্বাস, হীরামনসহ একাধিক ভুক্তভোগী জানান, আগে ভবদহ সংকট নিরসনে আশ্বাস দিলেও কাজ হয়নি। এ কারণে এলাকার বেশিরভাগ লোকজনই বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছেন। তবে, এবার যেহেতু সেনাবাহিনীর অধীনে বাস্তবায়ন হবে, এই কারণে একটু আশার আলো দেখছেন তারা।

পাউবো যশোর জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী বলেন, এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ভুক্তভোগীদের ভোগান্তি লাঘব হবে বলে।

ভবদহ স্লুইস গেটের ইতিবৃত্ত

যশোর ও খুলনা জেলার অধীন মণিরামপুর, কেশবপুর, অভয়নগর, যশোর সদর উপজেলা, ডুমুরিয়া, ফুলতলা ও বটিয়াঘাটা উপজেলার এক লাখ ২৮ হাজার হেক্টর জমিতে লবণ পানি ঢুকে প্রতি বছর ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হতে থাকে। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার এই অঞ্চলে সবুজ বিপ্লবের নামে টেকা ও মুক্তেশ্বরী নদীর ওপর প্রথম নির্মাণ করে স্লুইস গেট। একইসঙ্গে এই এলাকায় তিনটি পোল্ডার, ১০ হাজার ৫৬৬ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ, ২৮২টি স্লুইস গেট নির্মিত হয়। কিন্তু ৮০’র দশকে পলি জমে এই এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে আজ স্থায়ী জলাবদ্ধতায় রূপ নিয়েছে।

তবে, ৫০ বছর মেয়াদি এই স্লুইস গেট নির্মাণের পর ৬০ বছর পার হয়ে গেছে। খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে এই গেট। যে কারণে সব গেট একবারে খুলে দিতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা। কম সংখ্যক গেট খুলে পানি সরানো হচ্ছে।

এসআর/জিকেএস

Read Entire Article