ভাঙনের মুখে রাশিয়া-ইরান কৌশলগত জোট, ইতিহাস ও বাস্তবতা কী বলছে

প্রায় ১৯৭ বছর আগে তৎকালীন পারস্যে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার গ্রিবোয়েদভকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে তার মরদেহ বিকৃত করে তেহরানের একটি আবর্জনার স্তূপে ফেলে রাখা হয়েছিল। চশমাপরা ৩৪ বছর বয়সী এই কূটনীতিককে রুশ অভিজাত সমাজে একাধারে কবি, নাট্যকার, সুরকার, সৈনিক ও ভাষাবিদ হিসেবে সম্মান করা হতো। তার লেখা নাটক ‘উই ফ্রম উইট’ এখনো রাশিয়ার শিক্ষাক্রমের অংশ, আর তার রচিত একটি ওয়াল্টজ সংগীত দেশটিতে এখনো জনপ্রিয়। বহুভাষাবিদ ও নির্ভীক কূটনীতিক গ্রিবোয়েদভ ইরানের শাহ ফাতহ-আলির দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। শাহ চেয়েছিলেন, রুশ দূতাবাসে আশ্রয় নেওয়া কয়েকজন আর্মেনীয় পলাতককে তার হাতে তুলে দিতে। তাদের মধ্যে ছিলেন রাজকোষের এক খোজা কর্মকর্তা এবং হারেমের দুই নারী। নবস্বাক্ষরিত তুর্কমানচাই চুক্তি অনুযায়ী, রুশ প্রজা ও খ্রিস্টান সংখ্যালঘুরা রুশ নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে চলে যাওয়ার অধিকার পেয়েছিল। ফলে গ্রিবোয়েদভ তাদের সুরক্ষা দেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ১৮২৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি হাজার হাজার উত্তেজিত পার্সিয়ান তেহরানে রুশ দূতাবাসে হামলা চালায়। এতে গ্রিবোয়েদভ, কয়েক ডজন কূটনীতিক এবং কসাক অশ্বারোহী সদ

ভাঙনের মুখে রাশিয়া-ইরান কৌশলগত জোট, ইতিহাস ও বাস্তবতা কী বলছে

প্রায় ১৯৭ বছর আগে তৎকালীন পারস্যে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার গ্রিবোয়েদভকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে তার মরদেহ বিকৃত করে তেহরানের একটি আবর্জনার স্তূপে ফেলে রাখা হয়েছিল।

চশমাপরা ৩৪ বছর বয়সী এই কূটনীতিককে রুশ অভিজাত সমাজে একাধারে কবি, নাট্যকার, সুরকার, সৈনিক ও ভাষাবিদ হিসেবে সম্মান করা হতো। তার লেখা নাটক ‘উই ফ্রম উইট’ এখনো রাশিয়ার শিক্ষাক্রমের অংশ, আর তার রচিত একটি ওয়াল্টজ সংগীত দেশটিতে এখনো জনপ্রিয়।

বহুভাষাবিদ ও নির্ভীক কূটনীতিক গ্রিবোয়েদভ ইরানের শাহ ফাতহ-আলির দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। শাহ চেয়েছিলেন, রুশ দূতাবাসে আশ্রয় নেওয়া কয়েকজন আর্মেনীয় পলাতককে তার হাতে তুলে দিতে। তাদের মধ্যে ছিলেন রাজকোষের এক খোজা কর্মকর্তা এবং হারেমের দুই নারী।

নবস্বাক্ষরিত তুর্কমানচাই চুক্তি অনুযায়ী, রুশ প্রজা ও খ্রিস্টান সংখ্যালঘুরা রুশ নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে চলে যাওয়ার অধিকার পেয়েছিল। ফলে গ্রিবোয়েদভ তাদের সুরক্ষা দেন।

এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ১৮২৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি হাজার হাজার উত্তেজিত পার্সিয়ান তেহরানে রুশ দূতাবাসে হামলা চালায়। এতে গ্রিবোয়েদভ, কয়েক ডজন কূটনীতিক এবং কসাক অশ্বারোহী সদস্য নিহত হন।

তবে এই রুশবিরোধী বিদ্রোহের শিকড় ছিল আরও গভীরে।

১৮২৯ সালের জানুয়ারিতে গ্রিবোয়েদভকে পারস্যের কাছ থেকে ২ কোটি রৌপ্য রুবল ক্ষতিপূরণ আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। বর্তমান মূল্যে যার পরিমাণ ২০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

১৮২৬-২৮ সালের রুশ-পারস্য যুদ্ধে পরাজয়ের পর এই অর্থ দিতে গিয়ে পারস্য কার্যত নিঃস্ব হয়ে পড়ে।

গ্রিবোয়েদভ নিজেই বলেছিলেন, পারস্যের অবস্থা ছিল বর্ণনাতীত দুর্দশাগ্রস্ত। এমনকি শাহ পরিবারের সদস্যরাও সোনার ঝাড়বাতি গলিয়ে এবং পোশাকের মূল্যবান পাথর খুলে অর্থ জোগাড় করেছিলেন।

এই যুদ্ধের ফলেই রাশিয়া বর্তমান আজারবাইজান, আর্মেনিয়া, জর্জিয়া এবং দাগেস্তানের বড় অংশ নিজেদের দখলে নেয়।

রাষ্ট্রদূত হত্যার পর পারস্য রুশ প্রতিশোধের আশঙ্কায় ভুগতে থাকে। তাই ১৮২৯ সালের আগস্টে শাহের নাতিকে সেন্ট পিটার্সবার্গে পাঠানো হয় পার্সিয়ান ডায়মন্ড উপহার হিসেবে দেওয়ার জন্য।

৮৯ ক্যারেট ওজনের এই হলুদাভ হীরাটি একসময় ভারতের মুঘল সম্রাটদের সম্পদ ছিল। বর্তমানে এটি মস্কোতে সংরক্ষিত আছে।

আজও গ্রিবোয়েদভকে রুশ কূটনীতিকদের আদর্শ হিসেবে দেখা হয়। ২০২০ সালে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ তাকে মহান পূর্বসূরি হিসেবে উল্লেখ করেন।

ইউক্রেনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক পেন্টা সেন্টারের প্রধান ভলোদিমির ফেসেঙ্কো বলেন, গ্রিবোয়েদভের মৃত্যু রাশিয়া-ইরান দ্বন্দ্বের সবচেয়ে পরিচিত সাংস্কৃতিক ঘটনা।

উনবিংশ শতাব্দীর বাকি সময়জুড়ে রাশিয়া দক্ষিণ ককেশাস ও মধ্য এশিয়ায় পারস্যের আরও ভূখণ্ড দখল করতে থাকে।

রাশিয়া পারস্যকে একটি দুর্বল এশীয় রাষ্ট্র হিসেবে দেখত এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে গ্রেট গেম-এ তাকে একটি দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করত।

১৮৭৯ সালে ব্রিটিশ প্রভাব মোকাবিলায় জার আলেকজান্ডার দ্বিতীয় রুশ-পারস্য কসাক ব্রিগেড গঠনে সহায়তা করেন।

এই বাহিনী দ্রুত পারস্যের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক ইউনিটে পরিণত হয় এবং ভবিষ্যৎ শাহ রেজা পাহলভীর ক্ষমতায় ওঠার পথ প্রশস্ত করে।

১৯২০ সালে সোভিয়েত সরকার উত্তর পারস্যে একটি কমিউনিস্ট রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা করলেও ১৯২১ সালের মধ্যেই তা ব্যর্থ হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্টালিন ইরানের তেল সম্পদের ওপর একচেটিয়া অধিকার দাবি করেন এবং কুর্দিস্তানকে স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত করার হুমকি দেন।

ফলে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভী পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পরও ইরানের নতুন সরকার সোভিয়েত ইউনিয়নকে প্রায়ই ছোট শয়তান বলে আখ্যা দিত।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে। রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে নিজের প্রভাব ধরে রাখতে ইরানকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখতে শুরু করে।

মস্কো জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ঠেকাতে বা বিলম্বিত করতে ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে।

বিনিময়ে তেহরান রাশিয়া থেকে যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ছোট অস্ত্র কিনতে বিপুল অর্থ ব্যয় করে।

১৯৯৭ সালে দুই দেশ তাজিকিস্তানের গৃহযুদ্ধের শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নেও ভূমিকা রাখে। রুশ পারমাণবিক প্রতিষ্ঠান রোসাটম জার্মান নকশার বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্পন্ন করেছে এবং ২০২৫ সালে আরও চারটি কেন্দ্র নির্মাণে ২৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে।

বর্তমানে রুশ জ্বালানি কোম্পানিগুলো ইরানের মোট তেল-গ্যাস উৎপাদনের প্রায় ৬ শতাংশে কাজ করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া-ইরান সম্পর্ক আদর্শিক নয়, বরং বাস্তব স্বার্থনির্ভর। রাশিয়া-ইরান সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ নিকিতা স্মাগিন বলেন, তারা একে অপরকে পছন্দ করে না। ইরানিদের কাছে রাশিয়ার স্মৃতি মূলত নেতিবাচক।

তার মতে, দুই দেশকে কাছাকাছি এনেছে মূলত পশ্চিমা চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান। তাদের বন্ধুত্বের ভিত্তি হলো একটি অভিন্ন শত্রু; যুক্তরাষ্ট্র।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ২০২৪ সালে বলেছিলেন, আমাদের সম্পর্ক প্রকৃত মিত্রতার সম্পর্ক।

২০২৩ সালে পুতিনের সমর্থনেই ইরান ব্রিকস জোটে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সদস্যপদ লাভ করে।

২০১৫ সালে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতন ঠেকাতে রাশিয়া ও ইরান যৌথভাবে হস্তক্ষেপ করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনও এই সমীকরণে যুক্ত হয়েছে।

আজারবাইজানভিত্তিক বিশ্লেষক এমিল মুস্তাফায়েভ বলেন, এটি কোনো আনুষ্ঠানিক জোট নয়, বরং পশ্চিমা চাপের বিরুদ্ধে একটি কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা।

তবে চীন সবচেয়ে শক্তিশালী হলেও সবচেয়ে সতর্ক অংশীদার বলে মনে করেন স্মাগিন।

রাশিয়া কখনোই ইরানের প্রধান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেনি।

২০০৯ সালে ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট শিমন পেরেস মস্কো সফর করে ইরানের কাছে এস-৩০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিক্রি না করার অনুরোধ জানান।

রাশিয়া সেই বিক্রি ২০১৬ সাল পর্যন্ত স্থগিত রাখে। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে ইসরায়েলি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ইরানের বহু এস-৩০০ ব্যবস্থা ধ্বংস করে।

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু হলে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থান নেয়। তবে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি প্রকাশ্যে রাশিয়ার পক্ষে অবস্থান নেন।

পরে ইরান রাশিয়াকে শাহেদ ড্রোন, গোলাবারুদ, হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট সরবরাহ করে।

রাশিয়াও পাল্টা সহায়তা হিসেবে উন্নত ন্যাভিগেশন প্রযুক্তিসহ কিছু পরিবর্তিত শাহেদ ড্রোন ইরানে পাঠায়।

এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনার অবস্থান সম্পর্কিত গোয়েন্দা তথ্যও তেহরানকে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনি নিহত হওয়ার পর রাশিয়া হামলার নিন্দা জানালেও সরাসরি সামরিক সহায়তায় এগিয়ে আসেনি।

নিউ ইউরেশিয়ান স্ট্র্যাটেজিস সেন্টারের গবেষক রুসলান সুলেইমানভ বলেন, এটি পুতিনের ভাবমূর্তির জন্য বড় ধাক্কা। এতে আবারও প্রমাণ হয়েছে যে তিনি তার মিত্রদের কার্যকরভাবে সাহায্য করতে সক্ষম নন।

কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, ইউক্রেন ইস্যুতে পশ্চিমাদের কাছ থেকে ছাড় আদায়ের বিনিময়ে মস্কো ইরানকে ত্যাগ করতেও প্রস্তুত ছিল। তবে বর্তমানে সেই সুযোগ আর নেই বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

সূত্র : আল জাজিরা

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow