ভারতে নৃশংস সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ফিরে এল ২০১২ সালের দিল্লি ঘটনার স্মৃতি

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ২০১২ সালে চলন্ত বাসে এক তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও নির্মম নির্যাতনের ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল। সেই ঘটনার ১৩ বছর পর দেশটির বিহার রাজ্যে এক নারীকে ঘিরে নতুন একটি ভয়াবহ ধর্ষণের ঘটনা সামনে এসেছে, যা আবারও দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, ঘটনাটি শুধু যৌন সহিংসতার নয়, বরং ধর্ষণের শিকার নারীদের প্রতি পুলিশ ও চিকিৎসা ব্যবস্থার উদাসীনতারও প্রতিচ্ছবি। ভারতের আইন অনুযায়ী যৌন সহিংসতার শিকার ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করা যায় না। তাই প্রতিবেদনে ২৮ বছর বয়সী ওই নারীকে ছদ্মনাম ‘সোমা’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। চার সন্তানের জননী সোমা জানান, গত ১১ জুন রাতে বিহারের বেগুসরাই জেলার একটি গ্রামে নিজ বাড়িতেই একদল ব্যক্তি তাকে ধর্ষণ করে। তিনি অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা তার শরীরে বিভিন্ন বস্তু প্রবেশ করিয়ে ভয়াবহ নির্যাতন চালায়। বেগুসরাই ভারতের সবচেয়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা জেলাগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত। বাড়িতে ঢুকে হামলা সোমার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার রাতে তিনি ঘরের বাইরে থাকা শৌচাগারে ছিলেন। ওই শৌচাগারে দরজা ছিল না, শুধু একটি পর্দা টাঙানো ছিল। তিনি বলেন, পাঁচজন লোক

ভারতে নৃশংস সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ফিরে এল ২০১২ সালের দিল্লি ঘটনার স্মৃতি

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ২০১২ সালে চলন্ত বাসে এক তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও নির্মম নির্যাতনের ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল। সেই ঘটনার ১৩ বছর পর দেশটির বিহার রাজ্যে এক নারীকে ঘিরে নতুন একটি ভয়াবহ ধর্ষণের ঘটনা সামনে এসেছে, যা আবারও দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, ঘটনাটি শুধু যৌন সহিংসতার নয়, বরং ধর্ষণের শিকার নারীদের প্রতি পুলিশ ও চিকিৎসা ব্যবস্থার উদাসীনতারও প্রতিচ্ছবি।

ভারতের আইন অনুযায়ী যৌন সহিংসতার শিকার ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করা যায় না। তাই প্রতিবেদনে ২৮ বছর বয়সী ওই নারীকে ছদ্মনাম ‘সোমা’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে।

চার সন্তানের জননী সোমা জানান, গত ১১ জুন রাতে বিহারের বেগুসরাই জেলার একটি গ্রামে নিজ বাড়িতেই একদল ব্যক্তি তাকে ধর্ষণ করে। তিনি অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা তার শরীরে বিভিন্ন বস্তু প্রবেশ করিয়ে ভয়াবহ নির্যাতন চালায়।

বেগুসরাই ভারতের সবচেয়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা জেলাগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত।

বাড়িতে ঢুকে হামলা

সোমার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার রাতে তিনি ঘরের বাইরে থাকা শৌচাগারে ছিলেন। ওই শৌচাগারে দরজা ছিল না, শুধু একটি পর্দা টাঙানো ছিল।

তিনি বলেন, পাঁচজন লোক হঠাৎ সেখানে ঢুকে পড়ে। তারা আমার কাপড় খুলে ফেলে, মুখ বেঁধে দেয় এবং হাত বেঁধে ফেলে। আমি প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলে ব্লেড দিয়ে আমার বুকে আঘাত করে এবং এরপর আমাকে ধর্ষণ করে।

সোমা জানান, তার স্বামী প্রথমে তার গোঙানির শব্দকে বিড়ালের আওয়াজ ভেবেছিলেন। পরে সন্দেহ হলে বাইরে বের হতে গিয়ে দেখেন ঘরের দরজা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ। পরে প্রতিবেশীর সহায়তায় দরজা খুলে তাকে উদ্ধার করা হয়।

ধর্ষণের প্রমাণ মিলেছে

বেগুসরাইয়ের পুলিশ সুপার মানিশ জানান, চিকিৎসা প্রতিবেদনে যৌন নির্যাতনের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।

তিনি বলেন, মামলায় তিনজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং আরও দুইজন অজ্ঞাত আসামি রয়েছে। এরই মধ্যে দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি আসামিদের ধরতে বিশেষ তদন্ত দল (এসআইটি) অভিযান চালাচ্ছে।

পুলিশ জানিয়েছে, কয়েকজন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আগেও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ছিল।

পুলিশের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ

সোমার স্বামী অভিযোগ করেন, ঘটনার পর অচেতন অবস্থায় স্ত্রীকে বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের একটি থানায় নিয়ে গেলে পুলিশ অভিযোগ নিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেয়।

পরে দায়িত্বে অবহেলা, উদাসীনতা ও সংবেদনশীলতার অভাবের অভিযোগে ওই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাজীব কুমারকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

পুলিশ জানায়, ১৩ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়।

চিকিৎসা নিয়েও প্রশ্ন

সোমা ও তার পরিবারের অভিযোগ, হামলার পরও তিনি যথাযথ চিকিৎসা পাননি।

প্রথমে একটি বেসরকারি ক্লিনিক জরুরি চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে তাকে একটি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়া হয় এবং সেখান থেকে জেলা হাসপাতালে পাঠানো হয়।

সোমা বলেন, জ্ঞান ফেরার পর তিনি চিকিৎসকদের ধর্ষণের বিষয়টি জানান। তবে শুরুতে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

অন্যদিকে বেগুসরাইয়ের সিভিল সার্জন অশোক কুমার দাবি করেন, হাসপাতালে আনার সময় রোগী পেটব্যথার অভিযোগ করেছিলেন এবং ১৩ জুন ধর্ষণের বিষয়টি জানার পরই প্রয়োজনীয় মেডিকেল পরীক্ষা করা হয়।

শরীর থেকে উদ্ধার হয় বস্তু

সোমার স্বামী জানান, হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরও তিনি বারবার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিলেন এবং তীব্র পেটব্যথায় ভুগছিলেন।

একজন ধাত্রী সন্দেহ প্রকাশ করেন যে তার শরীরের ভেতরে কিছু আটকে আছে।

১৮ জুন সকালে সোমার শরীর থেকে একটি খালি গুলির খোসা বের হয়ে আসে বলে পরিবারের দাবি। পরে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা আরও কিছু বস্তু অপসারণ করেন।

সিভিল সার্জন অশোক কুমার বলেন, এটি একটি খালি কার্তুজের খোসা ছিল। পুনরায় পরীক্ষা করে আরও কিছু বস্তু অপসারণ করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি স্থিতিশীল আছেন এবং সুস্থ হয়ে উঠছেন।

২০১২ সালের দিল্লি ঘটনার সঙ্গে তুলনা

সোমার ঘটনায় ভারতের বিভিন্ন মহলে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে এবং অনেকেই এর সঙ্গে ২০১২ সালের দিল্লির বহুল আলোচিত গণধর্ষণ মামলার তুলনা করছেন।

সেই ঘটনায় ২৩ বছর বয়সী এক ফিজিওথেরাপি শিক্ষার্থীকে চলন্ত বাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পাশাপাশি তার শরীরেও বিভিন্ন বস্তু প্রবেশ করিয়ে নির্যাতন করা হয়েছিল। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তার মৃত্যু হয়।

ঘটনাটি বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের জন্ম দেয় এবং ভারতে ধর্ষণবিরোধী আইন আরও কঠোর করা হয়। গুরুতর ধর্ষণের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধানও যুক্ত করা হয়।

তবে এরপরও ভারতে প্রতিবছর ৩০ হাজারের বেশি ধর্ষণের মামলা নথিভুক্ত হয়।

নারী অধিকারকর্মী যোগিতা ভায়ানা বলেন, আমরা কোনো শিক্ষা নিতে পারিনি। সমাজ ভয়াবহ যৌন সহিংসতার ঘটনার প্রতি অনেকটাই সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলেছে।

তার মতে, ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও সেই ভয় সমাজের সব স্তরে পৌঁছায়নি।

সন্তানদের কাছে ফিরতে চান সোমা

বর্তমানে সোমা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সাংবাদিক, রাজনীতিক ও সমাজকর্মীদের নিয়মিত ভিড়ের মধ্যে তিনি এখনও শারীরিক যন্ত্রণায় ভুগছেন।

তার চার সন্তান বর্তমানে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরের একটি গ্রামে আত্মীয়দের কাছে রয়েছে।

সোমা বলেন, আমি আমার সন্তানদের জন্য খুব চিন্তিত। তারা এখনও অনেক ছোট। আমি দ্রুত সুস্থ হয়ে তাদের কাছে ফিরতে চাই।

সূত্র: বিবিসি

এমএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow