২০১৯ সালে গঠন করা বাংলাদেশ পুলিশ আরচারি ক্লাব ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশ যতগুলো ডিসিপ্লিনের ক্লাব পরিচালনা করে সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সফল আরচারি। এই পাঁচ বছরে দারুণ সফলতার পরিচয় দেওয়া আরচারি ক্লাব ভেঙ্গে দেওয়ায় ২৫ জন আরচারের ক্যারিয়ারে নেমে এসেছে অন্ধকার।
হতাশ হওয়া আরচাররা বিভিন্নজনের কাছে যাচ্ছেন; কিন্তু কোনো জায়গা থেকে আশার আভাস পাচ্ছেন না। বিলুপ্ত এই ক্লাবের আরচাররা এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সাথে দেখা করে তাদের দুঃখ-কস্টের কথা জানিয়ে ক্লাবটি পুনরায় পরিচালনার ব্যবস্থা গ্রহণের আকুল আবেদন জানানোর অপেক্ষায়। তারা দেখা করার চেষ্টা করছেন পুলিশের আইজির সাথেও।
জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নতুন সরকার গঠন হয়। তারপর থেকেই পুলিশের আরচারদের ভাতা বন্ধ হয়ে যায়। ৫ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৩০ হাজার টাকা করে ভাতা পেতেন পুলিশের আরচারি খেলোয়াড় ও কোচরা।
ভাতা বন্ধ হওয়ার পর থেকেই হতাশার মধ্যে দিন কাটছিল আরচারদের। পুলিশ আরচারি খেলায় থাকছে না সেটা নিশ্চিত হয় যখন ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের জন্য বাংলাদেশ পুলিশ তাদের ক্রীড়া ক্লাবগুলোর কমিটি ঘোষণা করে।
২০২৪-২৫ অর্থ বছরে পুলিশ ২৫টি ডিসিপ্লিনের ক্লাব ঘোষণা করেছে। সেখানে আছে বেসবল, ডিউবল, ফুটভলি, টার্গেটবলের মতো অখ্যাত সব খেলা। অথচ ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে অলিম্পিকের ডিসিপ্লিন আরচারির ক্লাব। ভেঙ্গে দেওয়ার তালিকায় আছে দাবা ও জিমন্যাস্টিকসহ আরো কয়েকটি ডিসিপ্লিনও। ২৫টি ক্রীড়া ডিসিপ্লিনের জন্য ১৩টি ও একটি কালচারাল ক্লাব ঘোষণা করে প্রত্যেকটির সভাপতি ও সম্পাদক নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ।
বাংলাদেশ পুলিশ আরচারি ক্লাবের কোচ ও অধিনায়ক মো. আবুল কাশেম মামুন জাগো নিউজকে বলেছেন, ‘২০১৯ সালে এই ক্লাব গঠনের পর থেকে আমি ছিলাম। আমাদের বছরব্যাপী ক্যাম্প হতো নড়াইল পুলিশ লাইনে। ছেলে ও মেয়ে ২৫ জন আরচার ছিলেন পুলিশ ক্লাবের ক্যাম্পে। আমরা দুইবার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। বাংলাদেশ গেমস চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। গত বছর এপ্রিলে ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিত সপ্তম কার্তিনি আন্তর্জাতিক আরচারি চ্যাম্পিয়নশিপে আমরা ৭ স্বর্ণ, ৪ রৌপ্য ও ৩ ব্রোঞ্জ জিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। আরচারি ক্লাব গঠনের পর আমরা যত পদক এনে দিয়েছি পুলিশের খেলাধুলার ইতিহাসেও সব মিলিয়ে এত পদক আসেনি। অথচ কি কারণে সফল সেই ক্লাবটিকেই বিলুপ্ত করা হলো আমরা জানি না।’
রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর পুলিশ প্রশাসনেও বড় ধরণের পরিবর্তন হয়। গত আগস্টে পুলিশ আরচারি ক্লাবের কোচ মামুন ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনাও করেছিলেন ওই সময়ের ক্লাব সভাপতির সাথে।
‘আরচারি দলকে কিভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়। কিভাবে আরো সাফল্য আনা যায় সে বিষয় নিয়ে আগস্টে আমি আলোচনা করেছিলাম সভাপতি স্যারের সাথে। তিনি অত্যন্ত ইতিবাচক ছিলেন। পরে দেখি আমাদের ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং সবশেষে জানলাম ক্লাবই বিলুপ্ত করা হয়েছে। আমরা আরচাররা এখন চোখেমুখে অন্ধকার দেখছি’-বলেছেন মো. আবুল কাশেম মামুন।
ক্লাব বিলুপ্ত করায় যে ২৫ আরচার বেকার হয়ে গেলেন, তাদের মধ্যে অন্তত ১৫ জন জাতীয় দলের সাবেক ও বর্তমান খেলোয়াড়। এতদিন তারা আশায় ছিলেন পুলিশে চাকরি হবে বলে। এখন শুনলেন ক্লাবই নেই। এখন তাদের তীর-ধুনক হাতে খেলায়ই অনিশ্চিত হলে গেলো।
‘আমরা ২০১৯ সাল থেকে খেলে আসছি। আমাদেরতো চাকরি দেওয়ার কথা ছিল। দেয়নি। সবার বয়সও শেষ। এ সময়ে এসে যদি টিমটাও বাদ হয়ে যায়, তাহলে সবাই বেকার। এতদিন দেশের জন্য পুলিশের জন্য এত কিছু করলাম। নিজের একটা গতি হয়েছিল। পুলিশের চাকরি হলো না, সরকারও কিছু করলো না। আশা করেছিলাম এখন আমাদের চাকরি হবে; কিন্তু আরো বৈষম্যের শিকার হলাম’- হতাশ কণ্ঠে বলছিলেন দলের কোচ ও অধিনায়ক মামুন।
মো. আবুল কাশেম মামুন ছাড়াও এই ক্লাবের তারকা আরচারদের মধ্যে ছিলেন- তামিমুল ইসলাম, আশিকুজ্জামান অনয়, ভানরুম বম, ইতি খাতুন, অলিম্পিয়ান শ্যামলী রায়, বিউটি রায়, জ্যোতি মনি চাকমা, জ্যোতি রানী। তাদের মধ্যে জ্যোতি চাকমা ও জ্যোতি রানী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে চাকরি নিয়েছেন। হাকিম আহমেদ রুবেলতো হতাশায় খেলা ছেড়ে আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছেন।
ক্লাব বিলুপ্তি হওয়ার পরও গত ৮ মার্চ নারী দিবসে ও ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের প্রতিযোগিতায় পুলিশের খেলোয়াড় ইতি খাতুন অংশ নিয়ে দুই প্রতিযোগিতায়ই স্বর্ণ জিতেছেন। ইতি নারী বিসে স্বর্ণ জিতে ক্রীড়া উপদেষ্টার হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেছেন।
তামিমুল ইসলাম বিকেএসপি থেকে ২০২০ সালে পুলিশ আরচারি ক্লাবে যোগ দিয়েছিলেন। পাঁচ বছরে তিনি তিনটি আন্তর্জাতিক স্বর্ণসহ ৮টি স্বর্ণপদক উপহার দিয়েছেন। ক্লাব বিলুপ্তির পর হতাশ হয়ে বসে আছন রংপুরে নিজ বাড়িতে।
‘বিকেএসপি থেকে আরচারি শিখেছি। এরপর পুলিশ ক্লাবে। অন্য কিছু তো শিখিনি। তাই অন্য কাজ করতেও পারছি না। পুলিশ থেকে আমাদের সবসময়ই বলা হতো থেকে যাওয়ার জন্য। চাকরির কথাও বলা হয়েছিল। এখন খেলাই বন্ধ। যেসব ডিসিপ্লিনের খেলোয়াড়রা পুলিশ চাকরি করেন তাদের খেলা রাখা হয়েছে। চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড়দের নিয়ে করা ডিসিপ্লিন বাদ দেওয়া হয়েছে। আমাদের অন্য ক্লাবে যাওয়ার সুযোগ ছিল। যাইনি পুলিশ থেকে থেকে যেতে বলায়। ক্লাব ভেঙ্গে দিয়েছে জানতে পেরে এখন কি করবো বুঝতে পারছি না। হতাশ হয়ে বাড়িতে বসে আছি’- রংপুর থেকে বলছিলেন তামিমুল ইসলাম।
বিষয়টি জানতেন না জাতীয় দলের জার্মান কোচ মার্টিন ফ্রেডরিখ। দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ফ্রেডরিখ বলেন, ‘ওহ! আমি তোমার কাছ থেকে কথাটি এখনই শুনলাম। অনেক দিন ধরে পুলিশের কিছু সমস্যা ছিল জানতাম। হ্যাঁ, ক্লাব ভেঙ্গে দেওয়া আমাদের দেশের তীরন্দাজদের জন্য ভালো খবর নয়। পুলিশ ক্লাব বাংলাদেশের অন্যতম শক্তিশালী দল ছিল। এটা দুঃখজনক...।’
পুলিশ আরচারি ক্লাবের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন এডিশনাল ডিআইজি গাজী মো. মোজাম্মেল হক। আরচারি ক্লাব বিলুপ্তি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন,‘২০১৮ সালের এশিয়ান গেমসের পর তৎকালীন আইজিকে আরচারি ক্লাব গঠনের প্রস্তাব দিলে তিনি রাজী হন এবং ২০১৯ সালে এই ক্লাব গঠন করা হয়। এবার ক্লাব ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে। আসলে পুলিশের নিজস্ব আরচার নেই। আরচারি কোটায় ভর্তিরও ব্যবস্থা নেই। ক্লাব ভেঙ্গে দেওয়ায় অনেক আরচারের ক্ষতি হলো। জাতীয় দলের জার্মান কোচ মার্টিন ফ্রেডরিখও আমাকে বলেছিলেন,ক্লাব না থাকলে আরচাররে ক্ষতি হবে। এখানে অনেক খেলোয়াড়ের রুটি-রুজির বিষয় আছে।’
‘আসলে বছরে কোটি টাকা ব্যয় হতো। স্পন্সরও পাওয়া যায় না। তাই কর্তৃপক্ষ ক্লাব ভেঙ্গে দিয়েছে। আমাদের আরচারিতে অনেক সাফল্য ছিল। ক্লাব প্রতিষ্ঠার পর আরচারির থেকে পুলিশের সাফল্যে যোগ হয়েছে ১০০ স্বর্ণপদক। পুলিশের ইতিহাসেও এত পদক আসেনি, যা এসেছে আরচারি থেকে। সাফল্য পেতে আমরা সাড়া বছর নড়াইল পুলিশ লাইনে ক্যাম্প করেছি। আরচারি নিয়ে আমার আরো বড় স্বপ্ন ছিল। আমারও চাকরি শেষের দিকে। ৩ অক্টোবর অবসরে যাচ্ছি। আরচারিকে আরো ওপরে দেখে যেতে পারলে ভালো লাগতো।’
২০২৪-২৫ অর্থবছরে পুলিশ যে খেলাগুলোয় অংশ নেবে
ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, টেনিস, বাস্কেটবল, বেসবল, ডিউবল, ফুটভলি, টার্গেটবল, ভলিবল, হ্যান্ডবল, অ্যাথলেটিকস, কুস্তি, বক্সিং, শরীরগঠন, উশু, ব্যাডমিন্টন, শ্যুটিং, কাবাডি, সাঁতার, জুডো, কারাতে, তায়কোয়ানদো ও ভারোত্তোলন। তৃতীয় প্যারায় ২৫ ক্রীড়া ডিসিপ্লিনের জায়গায় হবে ২৪ টি।
আরআই/আইএইচএস/