ভোটের মাঠে কি দৃশ্যমান হচ্ছে ‘হাদি ইফেক্ট’?

শরীফ ওসমান হাদি নিহত হওয়ার পর তার জানাজায় ঢাকায় লাখো মানুষের ঢল নেমেছিল। কিছু সময়ের জন্য পুরো দেশ শোক ও আবেগে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই আবেগ অনেকটাই স্তিমিত হয়ে আসে। বাংলাদেশের ইতিহাসে শহীদের স্মৃতি চিরস্থায়ী হলেও, গণমানুষের শোক দীর্ঘদিন একই রকম থাকে না। জীবনের বাস্তব চাপ, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও নিরাপত্তাহীনতার ভেতর শোক ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যায়। এই অভিজ্ঞতা নতুন নয়। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের কথাই ধরা যাক। পুলিশের রাবার বুলেটের সামনে দুহাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা তার ছবি ইতোমধ্যে দেয়ালচিত্র, পাঠ্যবই ও শিল্পকর্মে স্থান পেয়েছে। আবু সাঈদের ছবি অমর হয়েছে, কিন্তু তার মৃত্যুজনিত শোক এখন মূলত সীমাবদ্ধ পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যেই। এর একটি বাস্তব কারণও আছে। আবু সাঈদের মৃত্যু একটি ঐতিহাসিক পরিণতির জন্ম দেয়। তার শহীদ হওয়া গণঅভ্যুত্থানকে ত্বরান্বিত করে, যার পরিণতিতে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার সরকার উৎখাত হয়। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সেই অধ্যায় সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু শরীফ ওসমান হাদির ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। নিহত হওয়ার এক মাসেরও বেশি সময় পরও হাদির

ভোটের মাঠে কি দৃশ্যমান হচ্ছে ‘হাদি ইফেক্ট’?
শরীফ ওসমান হাদি নিহত হওয়ার পর তার জানাজায় ঢাকায় লাখো মানুষের ঢল নেমেছিল। কিছু সময়ের জন্য পুরো দেশ শোক ও আবেগে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই আবেগ অনেকটাই স্তিমিত হয়ে আসে। বাংলাদেশের ইতিহাসে শহীদের স্মৃতি চিরস্থায়ী হলেও, গণমানুষের শোক দীর্ঘদিন একই রকম থাকে না। জীবনের বাস্তব চাপ, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও নিরাপত্তাহীনতার ভেতর শোক ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যায়। এই অভিজ্ঞতা নতুন নয়। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের কথাই ধরা যাক। পুলিশের রাবার বুলেটের সামনে দুহাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা তার ছবি ইতোমধ্যে দেয়ালচিত্র, পাঠ্যবই ও শিল্পকর্মে স্থান পেয়েছে। আবু সাঈদের ছবি অমর হয়েছে, কিন্তু তার মৃত্যুজনিত শোক এখন মূলত সীমাবদ্ধ পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যেই। এর একটি বাস্তব কারণও আছে। আবু সাঈদের মৃত্যু একটি ঐতিহাসিক পরিণতির জন্ম দেয়। তার শহীদ হওয়া গণঅভ্যুত্থানকে ত্বরান্বিত করে, যার পরিণতিতে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার সরকার উৎখাত হয়। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সেই অধ্যায় সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু শরীফ ওসমান হাদির ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। নিহত হওয়ার এক মাসেরও বেশি সময় পরও হাদির মৃত্যু ঘিরে শোক ও আবেগ কমেনি। বরং তা আরও তীব্র হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে তাকে ঘিরে যে সম্মান, আলোচনা ও আবেগ দেখা যাচ্ছে, তা ইঙ্গিত দিচ্ছে এক গভীর অসন্তোষের দিকে। অনেকেই একে বলছেন ‘হাদি প্রভাব’ বা ‘হাদি ইফেক্ট’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিভিশন টকশোতে হাদি পরিচিতি পান তার সরাসরি ও তীক্ষ্ণ ভাষার জন্য। শারীরিকভাবে সাধারণ হলেও তার শক্তি ছিল ভাষায়। তিনি কথা বলতেন শহুরে অভিজাত পরিমণ্ডলের পরিশীলিত ভাষায় নয়, বরং গ্রামবাংলার টানে ভর করা সরল কিন্তু ধারালো বাংলায়। এই ভাষাই তাকে সাধারণ মানুষের কাছে আপন করে তোলে। মাদ্রাসায় পড়াশোনা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সময় কাটানো এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত পারিবারিক পটভূমি হাদিকে এক অনন্য অবস্থানে দাঁড় করায়। তিনি ছিলেন না পুরোপুরি ক্ষমতাকাঠামোর ভেতরে, আবার একেবারে বাইরেও নন। তার প্রকাশ্য ধর্মীয় পরিচয় বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সমাজের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত ছিল। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর মূলধারার গণমাধ্যমে হাদির উপস্থিতি বাড়তে থাকে। আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিসরে ফিরে আসার চেষ্টা তিনি প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন। তার ভাষা ছিল কঠোর, সচেতনভাবে সংঘর্ষমুখী। তিনি বারবার সতর্ক করেন যে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের আগে সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার নতুন করে বিপদের জন্ম দিতে পারে। এই লড়াই ছিল মূলত সংস্কৃতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা সাংস্কৃতিক পরিসরে প্রতিষ্ঠা করে রেখেছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ব্যাখ্যা মতাদর্শ থেকে রূপ নেয় এক ধরনের বাধ্যতামূলক বিশ্বাসে। ইতিহাস পুনর্লিখন, শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রায় পৌরাণিক মর্যাদায় উন্নীত করা এবং ভিন্ন মতকে প্রান্তিক করে ফেলার অভিযোগ জমতে থাকে। এর ফলে ধর্মীয়ভাবে সংবেদনশীল কিন্তু রাজনৈতিকভাবে মধ্যপন্থী বহু মানুষ নিজেকে সেই সাংস্কৃতিক বয়ানে খুঁজে পাননি। প্রকাশ্য বিরোধিতা অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক ও পেশাগত ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই অসন্তোষ দীর্ঘদিন চাপা পড়ে থাকলেও পুরোপুরি দমে যায়নি। হাদির মৃত্যু সেই চাপা ক্ষোভকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। অনেকের কাছে তার শহীদ হওয়া কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং অসমাপ্ত প্রশ্নের প্রতীক। সেই কারণেই তার মৃত্যু এখনো জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এবং শোক এখনো অমীমাংসিত।   মৃত্যুর পর হাদির আকার যেন আরও বড় হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই বৃহত্ত্বের সঙ্গে তার শক্তি বেড়েছে কি না, সেই প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। ইতিহাস কখনো কোনো নিশ্চয়তা দেয় না। তার হত্যাকাণ্ড ইতিমধ্যেই অন্যদের জন্য সুযোগ তৈরি করেছে; তার নামে কথা বলার, তার ছবি ব্যবহার করে লাভবান হওয়ার, বলিদানকে রাজনৈতিক মুদ্রায় রূপান্তরিত করার। শহীদত্ব সবসময়ই সহজে দখলযোগ্য একটি সম্পদ। তবু এটা ভুল ধারণা হবে যে, শোকের তীব্রতা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাদি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বেন। জনগণের আবেগ অনিবার্যভাবে কমে আসে, কিন্তু অসমাপ্ত লড়াই কমে না। তিনি যে ধারণা বহন করতেন, সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসন পুনরুদ্ধারের জোর দাবি, কোনো আপস ছাড়াই দুর্নীতির মুখোমুখি হওয়া, অভিজাতদের অনুমতির অপেক্ষায় না থাকা; সেই ধারণা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি, তো দূর হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আলজাজিরায় প্রকাশিত ‘Making sense of Bangladesh’s ‘Hadi effect’ shaping the vote’ থেকে সংক্ষেপে অনূদিত লেখক : ফয়সাল মাহমুদ, দিল্লি বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow