মতলবের ক্ষীর, মেঘনার ঢেউ আর বারী সিদ্দিকীর গান
পূর্ব প্রকাশের পর (চতুর্থ পর্ব) আমার বাড়ি ‘মতলব’ জানার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা একগাল হেসে টিপ্পনী কেটে বলত, ‘এসো হে মতলববাজ, এসো এসো।’ এক মেয়ে বন্ধুর নাক সিটকানো মন্তব্য ছিল অপেক্ষাকৃত কম অপমানজনক—‘আকার, ওকার, ইকার নেই, এ কেমন নাম!’ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে, এমনকি বিবাহিত জীবনেও, এই মতলব নাম নিয়ে খোঁটা শুনতে হয়েছে বেশ কয়েকবার। অথচ তখনকার দিনে শিক্ষা বোর্ডে মতলব হাই স্কুলের প্রদীপ্ত ফলাফলের জন্য মতলব তৎকালীন পুরো পাকিস্তানে অভূতপূর্ব পরিচিতি ও প্রশংসা লাভ করেছিল; মুখে মুখে ফিরত তার তারিফ। মতলবের ক্ষীরের খ্যাতির কথা কী আর বলব! আপাতত এটুকু বলাই কাফি যে, একবার যে মতলবের ক্ষীর খেয়েছে, সে ভুলেও ভুলতে পারে না সেই ক্ষীরের স্বাদ। কখনও যদি সুপারিগাছের বাকলে বানানো চামচ দিয়ে ক্ষীরের হাঁড়ি থেকে ক্ষীর তুলে দেওয়া হতো এই বালকের হাতে, চেটে মনে হতো ক্ষীর নয়, যেন অমৃত। এ তো গেল দেশের ভেতরের কথা। পৃথিবীর বহু দেশ ঘুরেছি এবং যতবার বিদেশে গিয়েছি, সময়ে-সময়ে মতলব নামটা আমাকে মহিমান্বিত করেছেঃ — Are you from Bangladesh? — Yes, I am. — Which area? — Matlab. — Wow, Matlab? Great! I have been there. পৃথিবীজুড়ে বিখ্
পূর্ব প্রকাশের পর (চতুর্থ পর্ব)
আমার বাড়ি ‘মতলব’ জানার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা একগাল হেসে টিপ্পনী কেটে বলত, ‘এসো হে মতলববাজ, এসো এসো।’ এক মেয়ে বন্ধুর নাক সিটকানো মন্তব্য ছিল অপেক্ষাকৃত কম অপমানজনক—‘আকার, ওকার, ইকার নেই, এ কেমন নাম!’
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে, এমনকি বিবাহিত জীবনেও, এই মতলব নাম নিয়ে খোঁটা শুনতে হয়েছে বেশ কয়েকবার। অথচ তখনকার দিনে শিক্ষা বোর্ডে মতলব হাই স্কুলের প্রদীপ্ত ফলাফলের জন্য মতলব তৎকালীন পুরো পাকিস্তানে অভূতপূর্ব পরিচিতি ও প্রশংসা লাভ করেছিল; মুখে মুখে ফিরত তার তারিফ।
মতলবের ক্ষীরের খ্যাতির কথা কী আর বলব! আপাতত এটুকু বলাই কাফি যে, একবার যে মতলবের ক্ষীর খেয়েছে, সে ভুলেও ভুলতে পারে না সেই ক্ষীরের স্বাদ। কখনও যদি সুপারিগাছের বাকলে বানানো চামচ দিয়ে ক্ষীরের হাঁড়ি থেকে ক্ষীর তুলে দেওয়া হতো এই বালকের হাতে, চেটে মনে হতো ক্ষীর নয়, যেন অমৃত।
এ তো গেল দেশের ভেতরের কথা। পৃথিবীর বহু দেশ ঘুরেছি এবং যতবার বিদেশে গিয়েছি, সময়ে-সময়ে মতলব নামটা আমাকে মহিমান্বিত করেছেঃ
— Are you from Bangladesh?
— Yes, I am.
— Which area?
— Matlab.
— Wow, Matlab? Great! I have been there.
পৃথিবীজুড়ে বিখ্যাত বাংলাদেশের একমাত্র উপজেলার নাম মতলব—কলেরা গবেষণার সূতিকাগার; শিক্ষাদীক্ষায় অগ্রসরমান একটি জনপদ।
সেই মতলব থানার (এখন উপজেলা) উত্তরে ষাটনল ইউনিয়নে আমার জন্ম। ষাটনল ছিল এক সময়ের বিখ্যাত লঞ্চ-স্টিমার ঘাট। স্টিমার মানে রাজকীয় রকেট স্টিমার—কাছিমের মতো দেখতে লম্বা এক জাহাজ, কয়লার আগুনে শক্তি নিয়ে দুপাশের বড় বড় পাখায় পানি অপসারণ করে চলত ধপাস ধপাস শব্দে।
একবার দাদার সঙ্গে হাফপ্যান্ট পরা আমি ও বড় কাকার ছেলে রশিদ ভাই নারায়ণগঞ্জ থেকে রকেটে আসছিলাম। আমার উচ্ছ্বাস দেখে কে! একবার ইঞ্জিনঘরে তো অন্যবার সিঁড়ি বেয়ে দোতলায়; একবার দুই পাশের পাখার ধপাস ধপাস ধ্বনি শুনি, অন্যবার ঢেউ গুনি। এমনি করে কোনো এক মুহূর্তে ভয়ে ভয়ে সামনে থাকা ভিআইপি কেবিনের দিকে পা বাড়াই। দেখি দীর্ঘদেহী, পরনে পাজামা-পাঞ্জাবি এবং চোখে কালো ফ্রেমের চশমাধারী এক লোক আমাকে তাঁর কেবিনে ডেকে নিলেন। আমি তো ভয়ে হিম হয়ে গেলাম। আমার চিবুকে হাত দিয়ে নাম-ধাম জিজ্ঞেস করার পর একটা ছড়া লিখে দিলেন। পরে রশিদ ভাই বললেন, উনি ছিলেন পল্লীকবি জসীমউদ্দীন।
সে সময়টায় ষাটনলে নদীর পাড় থেকে বেশ কিছুদূর পর্যন্ত কাঠের জেটি ছিল যাত্রীদের ওঠানামার জন্য; ছিল নৌকা, লঞ্চ আর ফেরিওয়ালাদের ভিড়। রাত অবধি ষাটনল সরগরম থাকত যাত্রীদের পদভারে। সেখান থেকে হেঁটে কিংবা নৌকায় ঘণ্টাখানেকের পথ শেষে আমার গ্রাম সুগন্ধি—মেঘনা নদীর পাড়ে।
শ্যামল মিত্রের বিখ্যাত গানের কথা একটু ঘুরিয়ে চোখের সামনে ভেসে ওঠে আমার গ্রাম—
“মেঘনা নদীর পারে আমার ছোট্ট সবুজ গ্রাম,
আছে মনে সেই সে গাঁয়ের নাম।
যেথায় মাঝির গান আমার জুড়িয়ে দিত প্রাণ,
ফিরে কি পাব না তারে...”
ষাটনল মতলবের সবচেয়ে উত্তরে অবস্থিত একটি বড় ইউনিয়ন। বিশেষ করে ষাটনল স্টেশনের চারপাশের নৈসর্গিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রান্তিক হলেও কক্সবাজারের কথা মনে করিয়ে দেয়। সেখানে যখন জোরে বাতাস বয়, সমুদ্রসৈকতের আবহ কিঞ্চিৎ অনুভূত হয়।
‘আপনাকে একটা তথ্য দিই। ১৯৭৩-৭৪ সালে নয়াদিল্লিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যকার বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভারতের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট তিনটি কারখানা করার সিদ্ধান্ত হয়—সিমেন্ট, স্পঞ্জ আয়রন এবং সার কারখানা। এর মধ্যে সার কারখানাটি হওয়ার কথা ছিল ষাটনলে। ভারত থেকে উচ্চপর্যায়ের একটি টিম এসে জায়গা পছন্দ করে অনুমোদনও দিয়েছিল। কিন্তু ১৯৭৫ সালের মর্মান্তিক পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতায় আসা পরবর্তী সরকার সেই প্রকল্প নিয়ে আর এগোয়নি।’
শুনেছিলাম, পাকিস্তান আমলের উর্দু ছবি ‘বাহানা’সহ বিখ্যাত কিছু ছায়াছবির শুটিং হয়েছিল এখানটায়। তীরে আছড়ে পড়া মেঘনার ঢেউ, পানির কলতান, গাছগাছালিতে ভরা বিস্তৃত সবুজ প্রান্তর উদাস মনে হাওয়া জাগায়।
তাছাড়া নৌকায় করে ষাটনল থেকে সুগন্ধি যেতে যেতে ছইয়ের ওপর বসে দেখতাম ঘোমটা মাথায়, কলসি কাঁখে নারীর নদীতে নাইতে যাওয়া; নদীর ধার ঘেঁষে শিশু-কিশোরের দৌড়ঝাঁপ; উঁচু ঢেউয়ের সঙ্গে শরীর দুলিয়ে চিৎকার-চ্যাঁচামেচি; গুণ টানা নৌকার দৃশ্য। এসব আজও মনে গাঁথা।
ষাটনলে আরও ছিল—এবং এখনও নাকি আছে—সুন্দর এক ডাকবাংলো; ছিল ওয়্যারলেস স্টেশন। একসময় এখানে যে বড় বড় লোকের পা পড়ত, ডাকবাংলোটি যেন সোনালি অতীতের সে কথাই স্মরণ করিয়ে দিতে চায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এই জায়গায় যথাযথ অবকাঠামো দিয়ে একটি উন্নত পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করা হয়েছে।
প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী ও অর্থ-পরিকল্পনা সচিব এম. সায়েদুজ্জামান একদিন যখন জানলেন আমি মতলবের লোক, আমাকে বললেন—
‘আপনাকে একটা তথ্য দিই। ১৯৭৩-৭৪ সালে নয়াদিল্লিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যকার বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভারতের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট তিনটি কারখানা করার সিদ্ধান্ত হয়—সিমেন্ট, স্পঞ্জ আয়রন এবং সার কারখানা। এর মধ্যে সার কারখানাটি হওয়ার কথা ছিল ষাটনলে। ভারত থেকে উচ্চপর্যায়ের একটি টিম এসে জায়গা পছন্দ করে অনুমোদনও দিয়েছিল। কিন্তু ১৯৭৫ সালের মর্মান্তিক পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতায় আসা পরবর্তী সরকার সেই প্রকল্প নিয়ে আর এগোয়নি।’
অনুমান করতে কষ্ট হয় না যে, সার কারখানাটি স্থাপিত হলে দারিদ্র্যপীড়িত ষাটনল তথা মতলবের মানুষের ভাগ্যের চাকা কিছুটা হলেও ঘুরতে পারত; একটি অনুন্নত ও বিচ্ছিন্ন জনপদ হয়ে উঠতে পারত আলোর দিশারী।
কথায় বলে, তুমি যাবে বঙ্গে, কপাল যাবে সঙ্গে। সম্ভবত এরই নাম গরিবের ফাটা কপাল—
‘কান্দ কেনে মন,
কান্দিয়া কান্দিয়া যাইব তোমার জীবন রে,
কান্দ কেনে মন পাগলা রে...’
কিন্তু একদিন কান্না থামে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পণরক্ষা’ গল্পের মতো—
“অনাবৃষ্টি যখন চলিতে থাকে তখন দিনের পর দিন কাটিয়া যায়, মেঘের আর দেখা নাই... কিন্তু বৃষ্টি যখন নামে তখন দিগন্তের এক কোণে যেমনি মেঘ দেখা দেয়, অমনি দেখিতে দেখিতে আকাশ ছাইয়া ফেলে এবং অবিরল বর্ষণে পৃথিবী ভাসাইয়া যাইতে থাকে।”
সময়ের আবর্তনে সুগন্ধি গ্রাম, ষাটনল তথা মতলব উত্তরের অবস্থাও অনেকটা সেরকম হয়েছিল, তবে হঠাৎ করে নয়—ঘটেছিল পরিকল্পিতভাবে। যুদ্ধ ও প্রেমে নাকি কোনো কিছুই পরিকল্পনামাফিক হয় না, কিন্তু অর্থনৈতিক অগ্রগতি কখনো পরিকল্পনা ছাড়া হয় না। কী করে মেঘনা-ধনাগোদা বাঁধ এলাকার টার্নিং ও আর্নিং পয়েন্ট হলো, সে গল্প না হয় অন্য দিনের জন্য থাক।
তখনও মেঘনা-ধনাগোদা বাঁধ নির্মিত হয়নি।
সুগন্ধি গ্রামে আনুমানিক দেড় থেকে দুই শত ঘর ছিল। গ্রামের পশ্চিম দিকটায় মূল মেঘনা থেকে আসা একটি শাখানদী প্রবাহিত। তারই দুটি প্রশাখা সুগন্ধির আশপাশ দিয়ে চলে গেছে ভেতরের দিকে। ভরা বর্ষায় ফেনফেনা পানিতে এগুলোতে ভরা যৌবনের ঢেউ খেলে, আর শীত-গ্রীষ্মে মৃতপ্রায় রোগীর মতো ছিপছিপে চেহারা—যেমন কবি বলেছেন,
“আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে,
বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।”
নদীর পাড় ঘেঁষে উত্তরে গেলেই সটাকি বাজার। বাড়ি থেকে সরু একটি মেঠোপথে দশ-বিশ মিনিটের রাস্তা। সটাকিতে সপ্তাহে দুদিন হাট আর প্রতিদিন সকালে মাছ, দুধ ও তরিতরকারির বাজার বসে। উত্তর দিক থেকে বাজারে ঢুকতেই একটি বড় বটগাছ শীতল ছায়া আর মিষ্টি বাতাস ছড়িয়ে প্রাণ জুড়ানো অভ্যর্থনা জানায়।
গ্রীষ্মকালে সুগন্ধি গ্রামের দক্ষিণ দিকটা ধু-ধু প্রান্তর। কেউ বলে ‘তাউত্যার চক’। ওখানটায় কাঠফাটা রোদে ফসলের মাঠ চৌচির হয়ে থাকে।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘মহেশ’ গল্পে যেমনটি বিধৃত আছে, সুগন্ধি তথা মতলব উত্তরের অবস্থা একদা অনেকটা সেই রকম ছিল—
“বৈশাখ শেষ হইয়া আসে, কিন্তু মেঘের ছায়াটুকু কোথাও নাই...”
এক ফোঁটা পানির জন্য চাতক পাখি যেমন মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে, গ্রীষ্মকালে তেমনি অবস্থা সুগন্ধি তথা মতলবের উত্তরাঞ্চলের কৃষকের। আর তাই বোধ হয় সেই গানটি গাওয়া—
‘আল্লাহ মেঘ দে, পানি দে, ছায়া দে রে তুই আল্লাহ...’
তবে রাতের বেলায় তালের পাখায় বাতাস করতে করতে হোগলা বিছিয়ে উঠোনে জম্পেশ আড্ডা কিংবা সেখানে চাটাই পেতে চাঁদনি রাতের দৃশ্য উপভোগ করার অভিজ্ঞতা স্মৃতিতে এখনও এঁটে আছে। তেমনি মনে গেঁথে আছে ‘ছাড়া বাড়ির’ (গাছগাছালি আর বাঁশঝাড়বেষ্টিত খালি জায়গা) পাশ দিয়ে যেতে ভূতের ভয়ে ভোঁ-দৌড় দেওয়া কিংবা চোখ বুজে কানফাটানো চিৎকার করে গান গাওয়ার কথা।
তবে বর্ষাকালে সুগন্ধির অবস্থা একেবারে অন্যরকম—জলে টইটম্বুর। খুবই নিম্নাঞ্চল হওয়ায় বর্ষা মৌসুম শুরু হতে না হতেই সরীসৃপের মতো বাড়ির ভিটায় পানি এসে হাজির; মাঠঘাট ও গোচারণভূমি পানির নিচে।
আষাঢ় মাসে পুকুরের আইলে বসে দক্ষিণ দিকে তাকালে শুধু পানি আর পানি। পুরো এলাকা অনেকটা হাওরের মতো জলাধারের রূপ ধারণ করত। চারদিকে নৌকার মিছিল; এমনকি এ বাড়ি-ও বাড়ি করতেও নৌকা লাগত। প্রসারিত দৃষ্টিতে মনে হতো, দ্বীপের মতো কিছু গাছ ও ঘরবাড়ি নিয়ে পানিতে ভাসছে মোল্লাকান্দি, কেশেরকান্দি, সিকিরচর—যেন হাওরাঞ্চলের ‘হাটি’।
তখন অঝোরে বৃষ্টি নামলে অনুভূতিটা হতো বারী সিদ্দিকীর ভরাট গলায় গাওয়া সেই গানটির মতো—
আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানিরে
পুবালি বাতাসে,
বাদাম দ্যাইখা চাইয়া থাকি,
আমার নি কেউ আসেরে...
(চলবে)
লেখক : অর্থনীতিবিদ, কলামিস্ট। সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
এইচআর/জেআইএম
What's Your Reaction?