মন্দ বিষয় গোপন রাখার তাগিদ
সৃষ্টিগতভাবে মানুষের মধ্যে ভালো-মন্দ সব গুণ দেওয়া হয়েছে। তবে সামাজিকতা, চক্ষুলজ্জা ও অপমানের ভয় অনেক সময় মানুষকে অনেক খারাপ কাজ করা থেকে বিরত রাখে। হতে পারে এ ভয়টাই একদিন তাকে আল্লাহর দিকে নিয়ে যাবে, যখন সে তার ভুল বুঝতে পারবে এবং তার কৃত অপরাধের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে। কিন্তু যখন তার অপরাধ জনসমক্ষে প্রকাশ করে দেওয়া হয়, তখন সেই ভয় বা চক্ষুলজ্জা আর তার মাঝে কাজ করে না। সে তখন ভাবতে থাকে, ‘কী হবে আর ভালো থেকে, ক্ষতি যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে, লোকজন তো জেনেই গেছে এরই মধ্যে’, তখন সে প্রকাশ্যে পাপ কাজে লিপ্ত হতে থাকে। তা ছাড়া বারবার পাপের কথা বলতে থাকলে মানুষের অন্তর থেকে পাপের ভয় দূর হয়ে যায়। তখন পাপকে আর পাপ বলে মনেই হয় না। যে পাপের কথা বলে বেড়াতে লজ্জাবোধ করে না, একই পাপে লিপ্ত হওয়া তার জন্য অসম্ভব কিছু নয়। আর এভাবেই সমাজে পাপ ছড়িয়ে পড়তে থাকে। আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘আল্লাহ কোনো মন্দ বিষয় প্রকাশ করা পছন্দ করেন না। তবে কারও প্রতি জুলুম হয়ে থাকলে সে কথা আলাদা। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্ববিষয়ে জ্ঞাত।’ (সুরা নিসা: ১৪৮) কেউই চায় না যে, তার গোপনীয় বিষয়গুলো অন্য কেউ খুঁজে বের করে মানুষের কাছে
সৃষ্টিগতভাবে মানুষের মধ্যে ভালো-মন্দ সব গুণ দেওয়া হয়েছে। তবে সামাজিকতা, চক্ষুলজ্জা ও অপমানের ভয় অনেক সময় মানুষকে অনেক খারাপ কাজ করা থেকে বিরত রাখে। হতে পারে এ ভয়টাই একদিন তাকে আল্লাহর দিকে নিয়ে যাবে, যখন সে তার ভুল বুঝতে পারবে এবং তার কৃত অপরাধের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে। কিন্তু যখন তার অপরাধ জনসমক্ষে প্রকাশ করে দেওয়া হয়, তখন সেই ভয় বা চক্ষুলজ্জা আর তার মাঝে কাজ করে না। সে তখন ভাবতে থাকে, ‘কী হবে আর ভালো থেকে, ক্ষতি যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে, লোকজন তো জেনেই গেছে এরই মধ্যে’, তখন সে প্রকাশ্যে পাপ কাজে লিপ্ত হতে থাকে। তা ছাড়া বারবার পাপের কথা বলতে থাকলে মানুষের অন্তর থেকে পাপের ভয় দূর হয়ে যায়। তখন পাপকে আর পাপ বলে মনেই হয় না। যে পাপের কথা বলে বেড়াতে লজ্জাবোধ করে না, একই পাপে লিপ্ত হওয়া তার জন্য অসম্ভব কিছু নয়। আর এভাবেই সমাজে পাপ ছড়িয়ে পড়তে থাকে। আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘আল্লাহ কোনো মন্দ বিষয় প্রকাশ করা পছন্দ করেন না। তবে কারও প্রতি জুলুম হয়ে থাকলে সে কথা আলাদা। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্ববিষয়ে জ্ঞাত।’ (সুরা নিসা: ১৪৮)
কেউই চায় না যে, তার গোপনীয় বিষয়গুলো অন্য কেউ খুঁজে বের করে মানুষের কাছে তা প্রকাশ করুক। বরং সবাই চায় যে, তার গোপনীয় বিষয়গুলো যেন প্রকাশ না পায়। তাই অন্যের দোষ-ত্রুটি খুঁজে বেড়ানো মানুষের কাছে একটি নিন্দনীয় স্বভাব। শুধু তাই নয়, এমন স্বভাব মহান আল্লাহর কাছেও অপছন্দনীয়। এজন্য পরের দোষ খুঁজে বেড়ানো ইসলামে সম্পূর্ণরূপে নিষেধ করা হয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা একে অন্যের গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না।’ (সুরা হুজরাত: ১২)
আলোচ্য আয়াতের ওপর নির্ভর করে আমরা যদি সোনালি যুগের সোনালি মানুষ সাহাবিদের দিকে তাকাই, তাহলে আমরা এ ব্যাপারে তাদের জীবনের বাস্তব আমল সম্পর্কে জানতে পারব। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.) একদিন কোনো কাজে এক রাতে বাইরে বের হলেন। তার সঙ্গে ইবনে মাসউদ (রা.) ছিলেন। এক জায়গায় তারা আগুনের আলো দেখতে পেলেন। বিষয়টা তদন্ত করতে উভয়ই সেদিকে চলতে লাগলেন। একসময় তারা আগুনের উৎস স্থান খুঁজে পেয়ে এক ঘরের সামনে উপনীত হলেন। ইবনে মাসউদ (রা.)কে বাইরে রেখে ওমর (রা.) ভেতরে প্রবেশ করলেন। তখন গভীর রাত। ভেতরে গিয়ে দেখলেন, ঘরে প্রদীপ জ্বলছে। সেখানে এক বৃদ্ধ বসে আছে। তার সামনে পান করার মতো কিছু একটা রাখা আছে। আর এক দাসী তাকে গান শোনাচ্ছে। বৃদ্ধ লোকটি তাদের প্রবেশের বিষয়টি টের পায়নি। যখন টের পেল ততক্ষণে ওমর (রা.) তার একেবারে কাছে পৌঁছে গেছেন। ওমর (রা.) বললেন, ‘আজ রাতের মতো এমন খারাপ দৃশ্য আমি আর কখনো দেখিনি। একজন বৃদ্ধ মানুষ; যে বলতে গেলে মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, সে এমন মন্দ কাজে লিপ্ত!’ বৃদ্ধ লোকটি মাথা তুলে বলল, ‘আপনি যা বলেছেন, সেটা সঠিক। কিন্তু আপনি নিজে যা করেছেন, তা এর চেয়েও জঘন্য। আপনি অন্যের ঘরে ঢুকে দোষ সন্ধান করেছেন। অথচ আল্লাহতায়ালা এ ধরনের দোষ খুঁজে বেড়াতে নিষেধ করেছেন। তা ছাড়া আপনি অনুমতি ছাড়াই ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছেন। ওমর (রা.) নিজের ভুল বুঝতে পারলেন এবং চোখ থেকে অনুতাপের অশ্রু ঝরল। ওমর (রা.) সেখান থেকে চলে গেলেন। দীর্ঘদিন পর দেখা গেল, ওই বৃদ্ধ লোকটি ওমর (রা.)-এর দরবারে এসে মজলিসের শেষপ্রান্তে কিছুটা আড়াল হয়ে বসে পড়ল। হজরত ওমর (রা.) তাকে দেখে ফেললেন এবং বললেন, ‘বৃদ্ধ লোকটিকে আমার কাছে নিয়ে এসো।’ এদিকে বৃদ্ধ লোকটি ধরে নিল যে, সেদিন ওমর (রা.) নিজের চোখে যা দেখেছেন, তার জন্য আজ শাস্তি অবধারিত। বৃদ্ধ লোকটিকে তার কাছে নিয়ে আসা হলে ওমর (রা.) তার একেবারে বাহু সংলগ্ন করে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন, ‘ভালো করে শুনে রাখো, আল্লাহর শপথ করে বলছি, সে রাতে আমি তোমাকে যা করতে দেখেছি, তা অদ্যাবধি কাউকে বলিনি। তোমার দোষ গোপন করে রেখেছি। এমনকি ইবনে মাসউদ আমার সঙ্গে ছিল, তাকেও না।’ বৃদ্ধ লোকটি ওমর (রা.)-এর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, সেই সত্তার শপথ, যিনি মুহাম্মদ (সা.)কে সত্যসহ রাসুল করে পাঠিয়েছেন, আমিও সেই কাজ আর কখনো করিনি। তখন ওমর (রা.) জোর আওয়াজে আল্লাহু আকবার বলে উঠলেন। কিন্তু আশপাশের কারও জানা ছিল না যে কেন হঠাৎ তিনি তাকবির ধ্বনি দিলেন। (হায়াতুস সাহাবা: ২/৫৩৮৮)
উপরোক্ত ঘটনায় আমাদের জন্য দুটি শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। এক. অন্যের দোষ-ত্রুটি খুঁজে বেড়ানো যাবে না। যদিও সে শাসক হয়। আর অনিচ্ছা সত্ত্বেও যদি অন্যের দোষ চোখে পড়ে, তাহলে সেটা গোপন করে রাখতে হবে। দুই. অন্যের ঘরে প্রবেশ করার আগে অবশ্যই তার অনুমতি গ্রহণ করতে হবে। আমরা যদি নিজেরাই নিজেদের আমল সম্পর্কে একটু চিন্তাভাবনা করি, তাহলে দেখা যাবে আমারা প্রত্যেকেই রাতের আঁধারে অথবা একা নিরালায় শয়তানের খপ্পরে পড়ে কমবেশি অনেক বড় বড় অপরাধ করে ফেলেছি, যে অপরাধের কথা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কেউই জানে না। তাইতো বলা হয়, পিতা-মাতার গোপনীয় অপরাধের কথা যদি সন্তান জানত, তাহলে কোনো সন্তানই পিতা-মাতাকে ঘৃণায় সম্মান করত না। আবার সন্তানের গোপনীয় অপরাধের কথা যদি কোনো পিতা-মাতা জানত, তাহলে পিতা-মাতা কখনো তাকে সন্তান বলে পরিচয় দিত না। সুতরাং কেউ যদি চায় যে, তার দোষগুলো যেন আল্লাহতায়ালা গোপন করে রাখে, তাহলে সে যেন অন্য মুসলমান ভাইয়ের দোষগুলো গোপন করে রাখে। এ সম্পর্কে রাসুল (সা.) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন করে রাখবে, মহান আল্লাহতায়ালা দুনিয়া ও পরকালে তার দোষ গোপন করে রাখবেন।’ (মুসলিম: ৬৪৭২)
বান্দার যেসব দোষ-ত্রুটি আল্লাহতায়ালা গোপন করে রেখেছেন, সেসব দোষ-ত্রুটি অন্যের কাছে প্রকাশ করে দেওয়া আল্লাহ অপছন্দ করেন। যারা অন্যের দোষ খুঁজে বের করে মানুষের কাছে প্রকাশ করে দেয়, তাদের দোষ আল্লাহতায়ালা প্রকাশ করে দেন। এ সম্পর্কে হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অন্যের দোষ খুঁজে ফেরে, আল্লাহতায়ালা তার দোষ উন্মোচন করে দেন। আর শুনে রাখো, আল্লাহতায়ালা কারও দোষ উন্মোচন করলে, সে যেখানেই থাকুক তার নিস্তার নেই, অবশ্যই সে লাঞ্ছিত হবে।’ (আবু দাউদ: ৪৮৮০)। এ সম্পর্কে ইমাম নববী (রহ.) লিখেছেন, ‘একমাত্র দুর্বল ইমানদার ও মুনাফিকরাই মানুষের দোষ খুঁজে বেড়ায় এবং অন্যের কাছে প্রকাশ করে দেয়।’ তাই নিজের দোষ গোপন করতে আমরা কখনো অন্যের দোষ প্রকাশ করব না।
আল্লাহতায়ালা নিজে দয়াপরশ হয়ে বান্দার অনেক অপরাধ গোপন করে রাখেন। কিন্তু দুর্ভাগা অনেক মানুষই চায় না যে, তার গোপন অপরাধগুলো গোপন থাক। তাইতো অনেক মানুষই রাতের আঁধারে তাদের কৃত অপরাধগুলো দিনের আলোতে অন্যের কাছে নির্লজ্জতার সঙ্গে প্রকাশ করে দেয়, যা আল্লাহর বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যে নিজের গোপনীয় বিষয় নিজেই অন্যের কাছে প্রকাশ করে, আল্লাহতায়ালা তার গোপনীয় অপরাধগুলো কখনো ক্ষমা করেন না। এ সম্পর্কে হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমার উম্মতের সবার গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। কিন্তু নিজেরা নিজেদের দোষ-ত্রুটি জাহিরকারীদের পাপ ক্ষমা করা হবে না। (কিছু কিছু মানুষ আছে) তারা নিজেদের দোষ-ত্রুটি এমনভাবে প্রকাশ করে, যেমন কোনো ব্যক্তি রজনীতে কোনো অপকর্ম করে। এরপর প্রভাত হয়। মহান আল্লাহ পাক তার কর্মফলগুলো গোপন করে রেখেছেন। এরপর সে সকালবেলা বলে, হে অমুক! আমি গত রাতে এমন এমন কাজ করেছি। অথচ সে রাতযাপন করেছিল এমন অবস্থায় যে, মহান আল্লাহতায়ালা তার অপরাধসমূহ গোপন করে রেখেছিলেন আর ভোরবেলা সে মহান আল্লাহর গোপনীয়তা প্রকাশ করে দেয়।’ (বুখারি: ৬০৬৯)।
তাই উপরোক্ত হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা হচ্ছে, আমরা কখনো আমাদের কৃত অপরাধসমূহ অন্যের কাছে অযাচিতভাবে প্রকাশ করব না। অন্যের কোনো দোষ-দুর্বলতাও মানুষের সামনে প্রকাশ করব না। আল্লাহতায়ালা আমাদের সব গোপনীয় অপরাধমূলক কাজ থেকে বিরত থাকার তওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: ইমাম ও খতিব
What's Your Reaction?