মহাজীবনের যাত্রাপথ
আমি এই পৃথিবীর সন্তান নই আমি এই দুনিয়ার সন্তান নই। পৃথিবী আমার সফরের একটি অধ্যায় মাত্র। আমি এই মাটিতে আছি; কিন্তু এই মাটিই আমার আদি নিবাস নয়। আমার শরীর পৃথিবীর, কিন্তু আমার অস্তিত্বের ইবতিদা পৃথিবীতে হয়নি। আমার নাম, পরিচয়পত্র, জন্মতারিখ, পারিবারিক নসব ইত্যাদি আমার সামাজিক পরিচয়। কিন্তু এগুলো আমার অস্তিত্বের সংজ্ঞা নয়। এগুলো আমার দীর্ঘ যাত্রায় বিশেষ কিছু সংযোজন। মানুষের সবচেয়ে বড় গলতি হলো, সে নিজের অস্তিত্বকে নিজের জন্মের সঙ্গে একীভূত করে ফেলে। সে মনে করে, মাতৃগর্ভের আগে তার কোনো ইতিহাস ছিল না। অথচ এই ধারণা মানুষকে নিজের সত্তা সম্পর্কে নাবালেগ বানিয়ে দেয়। কারণ, যে সত্তাকে কেবল জন্ম দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়, তাকে মরণ শেষ করে দিতে পারে। কিন্তু মানুষের অস্তিত্ব যদি জন্মের পূর্ববর্তী কোনো ধারাবাহিকতার হিস্যা হয়, তবে মৃত্যু আর সমাপ্তি হয় না। মরণ হয়ে ওঠে আরেকটি অভিযাত্রার সূচনা। আমি সেই ধারাবাহিকতার সন্তান। আমার ইতিহাস জন্মসনদ দিয়ে শুরু হয়নি। আমার অস্তিত্বের পয়লা পৃষ্ঠা লেখা হয়েছে দৃশ্যমান মহাবিশ্বেরও আগে। এই ইতিহাস জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাস নয়, জীববিজ্ঞানের ইতিহাস নয়; এটি অস্তি
আমি এই পৃথিবীর সন্তান নই
আমি এই দুনিয়ার সন্তান নই। পৃথিবী আমার সফরের একটি অধ্যায় মাত্র। আমি এই মাটিতে আছি; কিন্তু এই মাটিই আমার আদি নিবাস নয়। আমার শরীর পৃথিবীর, কিন্তু আমার অস্তিত্বের ইবতিদা পৃথিবীতে হয়নি। আমার নাম, পরিচয়পত্র, জন্মতারিখ, পারিবারিক নসব ইত্যাদি আমার সামাজিক পরিচয়। কিন্তু এগুলো আমার অস্তিত্বের সংজ্ঞা নয়। এগুলো আমার দীর্ঘ যাত্রায় বিশেষ কিছু সংযোজন।
মানুষের সবচেয়ে বড় গলতি হলো, সে নিজের অস্তিত্বকে নিজের জন্মের সঙ্গে একীভূত করে ফেলে। সে মনে করে, মাতৃগর্ভের আগে তার কোনো ইতিহাস ছিল না। অথচ এই ধারণা মানুষকে নিজের সত্তা সম্পর্কে নাবালেগ বানিয়ে দেয়। কারণ, যে সত্তাকে কেবল জন্ম দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়, তাকে মরণ শেষ করে দিতে পারে। কিন্তু মানুষের অস্তিত্ব যদি জন্মের পূর্ববর্তী কোনো ধারাবাহিকতার হিস্যা হয়, তবে মৃত্যু আর সমাপ্তি হয় না। মরণ হয়ে ওঠে আরেকটি অভিযাত্রার সূচনা। আমি সেই ধারাবাহিকতার সন্তান। আমার ইতিহাস জন্মসনদ দিয়ে শুরু হয়নি। আমার অস্তিত্বের পয়লা পৃষ্ঠা লেখা হয়েছে দৃশ্যমান মহাবিশ্বেরও আগে। এই ইতিহাস জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাস নয়, জীববিজ্ঞানের ইতিহাস নয়; এটি অস্তিত্বের ইতিহাস। এখানে ঘড়ি দিয়ে সময়ের হিসাব করা যায় না। কারণ এখানে এখনো সময় নিজেই সম্পূর্ণ রূপে আবির্ভূত হয়নি। এখানে স্থান ও কালের সীমারেখার আগের এক বাস্তবতায় অস্তিত্ব নিজের প্রথম পরিচয় লাভ করে।
আমি অতিক্রম করেছি আলমে আমর! আলমে আমর অস্তিত্বের আদেশগত ভিত্তি। এখানে বস্তু নেই, পরিবর্তন নেই, বিবর্তন নেই; আছে কেবল সৃষ্টির আদিম আহ্বান, কুন; হও। এই একটিমাত্র খোদায়ি হুকুমের মধ্যে সমস্ত সম্ভাব্য অস্তিত্বের বীজ নিহিত ছিল। আমি সেই হুকুমের ফল। তাই আমার অস্তিত্বের গভীরে একটি মৌলিক অভিমুখ কাজ করে। আমি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যহীন নই। আমার সত্তায় এমন এক নৈতিক দিকনির্দেশনা নিহিত আছে, যা আমাকে ক্রমাগত বিশ্বাস, সত্য, ন্যায় ও পরিপূর্ণতার দিকে আহ্বান জানায়। এই আহ্বান আমার অস্তিত্বের স্থাপত্যে নিহিত।
এই স্তরে অস্তিত্ব এখনো ইতিহাসে প্রবেশ করেনি। কিন্তু ইতিহাসের সমস্ত সম্ভাবনা এখানে ইতোমধ্যেই নিহিত। এখানে কোনো ঘটনা নেই, কিন্তু সমস্ত ঘটনার আদেশগত ভিত্তি আছে। এখানে কোনো সময় নেই, কিন্তু সমস্ত সময়ের উৎস আছে। এখানে কোনো পদার্থ নেই, কিন্তু সমস্ত পদার্থের সম্ভাব্যতা এখানে সুপ্ত। সৃষ্টিজগতের বহুত্ব এখানে এখনো একত্বের মধ্যে নিবিষ্ট। তাই আলমে আমর সৃষ্টির সূচনা, সৃষ্টির অর্থগত ভিত্তি। এখান থেকেই অস্তিত্বের প্রতিটি স্তর তার হেদায়েত হাসিল করে।
এই কারণে মানুষের অস্তিত্ব নিছক কারণ-কার্য সম্পর্কের নতিজা নয়। মানুষ কেবল জৈবিক বিবর্তনের আকস্মিক বিন্যাসও নয়। তার গভীরে এমন একটি উদ্দেশ্যমূলক স্থাপত্য বিদ্যমান যা তাকে ক্রমাগত নিজের উৎসের দিকে ফিরিয়ে নিতে চায়। মানুষ যত দূরেই সরে যাক, তার সত্তার গভীরে সেই আদিম আহ্বানের অনুরণন কখনো পুরোপুরি নিভে যায় না। এটি সেই আদেশগত অস্তিত্বের অন্তর্লিখিত ভাষা।
এখানেই মানুষের স্বাধীনতারও ভিত্তি নিহিত। কারণ এখানে আদেশ মানে অভিমুখ। মানুষকে এখতিয়ারসহ সৃষ্টি করা হয়েছে। ফলে সে সেই আহ্বানে সাড়া দিতে পারে, আবার তাকে প্রত্যাখ্যানও করতে পারে। নৈতিকতার পরম মহিমা বিকশিত হয় স্বাধীনতার ভেতর হেদায়েতকে গ্রহণ ও বহন করার মধ্য দিয়ে। কিন্তু আদেশ নিজেই অস্তিত্বের পরিপূর্ণতা নয়। আদেশ সম্ভাবনাকে জন্ম দেয়, আর সম্ভাবনা আত্মপ্রকাশ করতে চায়। সে জন্য চাই একটি অস্তিত্বগত স্তর। তাই আমরের অন্তর্নিহিত অভিমুখ যখন পরিচয়ের দিকে অগ্রসর হলো, তখন অস্তিত্ব তার প্রথম অন্তর্লৌকিক প্রকাশের দিকে যাত্রা করল। সৃষ্টির হুকুম তখন রূপ নিল সৃষ্ট সত্তার আত্মসচেতনতায়। সেই কারণেই আলমে আমরে আমার সফর থেমে থাকেনি; বরং অস্তিত্বের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতায় আমি প্রবেশ করেছি অস্তিত্বের পরবর্তী স্তরে। এরপর আমি যাপন করেছি আলমে আরওয়াহে।
মহাজাগতিক আমর এখন আত্মপরিচয়ের অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতায় রূপ নিতে শুরু করেছে। যে আহ্বান আলমে আমরে ছিল অস্তিত্বের ভিত্তি, এখানে তা হয়ে উঠেছে রুহের অন্তর্লিখিত পরিচয়। সৃষ্টির উদ্দেশ্য এখন নিজের সাক্ষীকে খুঁজে পেতে শুরু করেছে।
এখানে আমি না কোনো দেহ, না কোনো জাতির কেউ। কোনো ভাষা বা ভূখণ্ডের মানুষও ছিলাম না এখানে। এখানে আমি কেবল বিশুদ্ধ রুহ। এখানেই আমার অস্তিত্ব পয়লা নিজের স্বাতন্ত্র্য উপলব্ধি করে। এখানেই জানতে শুরু করি, আমি নিছক কোনো জৈবিক উপাদান নই; আমি এক নৈতিক সত্তা। আমার ভেতরে যে সত্যের আকর্ষণ, সৌন্দর্যের প্রতি বিস্ময়, ন্যায়ের জন্য অস্থিরতা কিংবা অনন্তের প্রতি আকুলতা, এসবের উৎস এই স্তরেই নিহিত।
এখানে পরিচয়ের সমস্ত জাহেরি স্তর গরহাজির। মানুষ এখানে কোনো রাষ্ট্রের নাগরিক নয়, কোনো সভ্যতার সদস্য নয়, কোনো সংস্কৃতির উত্তরাধিকারীও নয়। এখানে পরিচয় কেবল অস্তিত্বগত। এখানেই মানুষ প্রথম উপলব্ধি করে যে তার মূল্য তার রুহানী মর্যাদায়। তাই মানুষের প্রকৃত সমতা দেহে নয়, রুহে; প্রকৃত মর্যাদা বংশে নয়, অস্তিত্বে।
এই স্তরে জ্ঞান কোনো তথ্য ছিল না। জ্ঞান ছিল কেবলই উপস্থিতি। এখানে সত্য কোনো যুক্তির উপসংহার নয়; সত্য এখানে প্রত্যক্ষতার অভিজ্ঞতা। তাই পৃথিবীতে এসে মানুষ যতই জ্ঞান অর্জন করুক, তার ভেতরে এমন এক অনুভূতি থেকে যায় যে, সে যেন কোনো ভুলে যাওয়া সত্যকে পুনরায় স্মরণ করার চেষ্টা করছে। শেখা অনেক সময় নতুন কিছু পাওয়া নয়; বরং হারিয়ে যাওয়া কোনো প্রাচীন শাহাদাহ বা সাক্ষ্যের পুনরুদ্ধার। এই কারণেই পৃথিবীতে এসে মানুষ এমন অনেক কিছুর জন্য আকুল হয়, যার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা পৃথিবীর হাতে নেই।
কেন মানুষ অনন্ত জিন্দেগির কল্পনা করে? কেন সে চিরস্থায়ী মহব্বত চায়? কেন সে এমন ইনসাফের প্রত্যাশা করে, যা পৃথিবীর কোনো আদালত কায়েম করতে পারে না পুরোপুরি? কারণ তার রুহ পৃথিবীর সীমাবদ্ধ বাস্তবতার চেয়ে বৃহত্তর এক হাকিকতের অভিপ্রায় বহন করে। মানুষের প্রতিটি গভীর তামান্না আসলে তার পূর্ববর্তী অস্তিত্বস্তরের একটি প্রতিধ্বনি। এই প্রতিধ্বনিই মানুষের সমস্ত উচ্চতর সভ্যতার উৎস। ধর্ম তো বটেই, সমাজ, পরিবার, সম্পর্ক, ভারসাম্য, কানুন, শিল্প, সাহিত্য, দর্শন, ছন্দ ও নৈতিকতার পরম গভীরে মানুষের সেই বিস্মৃত নিবাসের স্মৃতি কাজ করে। মানুষ সৌন্দর্য সৃষ্টি করে, কারণ সে এক পরিপূর্ণ সৌন্দর্যের আভাস বহন করে। মানুষ ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে চায়, কারণ সে এমন এক ন্যায়ের সাক্ষী, যা পৃথিবীর সীমাবদ্ধ কাঠামোর অধিক। মানুষ ভালোবাসে, কারণ তার রুহ মিলনের জন্য নির্মিত, মিলনে বিকশিত। অতএব আমার রুহ আমার সমস্ত অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যাকারী কেন্দ্র। আমার ইতিহাস যতটা বাহ্যিক, তার চেয়েও বেশি অন্তর্লৌকিক। সভ্যতার প্রকৃত ইতিহাস শুরু হয় মানুষের রুহে, তারপর তা আকার হাসিল করে ভাষায়, সংস্কৃতিতে, প্রতিষ্ঠানে এবং রাষ্ট্রে ।
কিন্তু রুহের এই পরিচয় এখনো ইতিহাসে অবতীর্ণ হয়নি। পরিচয়কে দায়িত্বে রূপ দিতে, সম্ভাবনাকে ধারণক্ষম বাস্তবতায় পরিণত করতে প্রয়োজন ছিল রুহের জন্য একটি জৈবিক অবকাঠামো। কারণ পৃথিবীর ইতিহাসে অংশগ্রহণের জন্য কেবল রুহ যথেষ্ট নয়। তার জন্য এমন একটি দেহও প্রয়োজন, যার মাধ্যমে সে সময়, পরিবর্তন এবং কর্মের জগতে দাখিল হতে পারে। তাই অস্তিত্বের সফর আবারও এক নতুন মঞ্জিলে অগ্রসর হলো। তারপর...... (ধারাবাহিক চলবে)
লেখক: কবি ও গবেষক
What's Your Reaction?