'মা নেই, আছে শুধু একলা মা দিবস
কিছু স্মৃতি থাকে যা সময়ের সাথে সাথে ধূসর হয় না, বরং মনের গহীন কোণে আরও বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। আমার কাছে মা মানেই হলো একটি সাদা-কালো স্থির চিত্র। শুনেছি, সেই ছবিটা বিয়ের আগে বাবাকে পাঠানোর জন্যই তোলা হয়েছিল। ঝাপসা হয়ে আসা সেই ছবির এক কোণে মা’র সেই স্নিগ্ধ হাসিটা আজও পরম মমতায় আটকে আছে। মা’র সংসার, আমাদের সেই ছোট্ট আপন ঘর—সেখানে এই হাসিটাই ছিল আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র আশ্রয়। আজ ২০২৬ সালের এই মে মাসে যখন চারদিকে মা দিবসের উৎসবের রং ছড়ানো, তখন আমার আকাশজুড়ে শুধু অক্টোবরের সেই বিষণ্ন মেঘ। গত বছরের সেই একটি মাস আমার জীবনের সমস্ত আলো কেড়ে নিয়ে মা-কে এক না ফেরার দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। মা নেই—এই তিনটা শব্দ যে কত বড় এক সমুদ্রের সমান দীর্ঘশ্বাস, তা বোঝানোর মতো ভাষা আমার জানা নেই। আমাদের শৈশব আর কৈশোরটা ছিল আদ্যোপান্ত ‘মা-ময়’। মা’র ব্যবহৃত পারফিউমের সেই মায়াবী ঘ্রাণ আজও আমার নাকে লেগে আছে। আমাদের জামাকাপড়ের পছন্দ থেকে শুরু করে কথা বলার ভঙ্গি, চুলে চিরুনি চালানো থেকে শুরু করে জীবনের বড় বড় সিদ্ধান্ত—সবখানেই ছিল মা’র হাতের ছোঁয়া। মা মানুষ হিসেবে কেমন ছিলেন, সেই বিচার করার মতো ধৃষ্টতা আমাদের কোনোদিন ছিল
কিছু স্মৃতি থাকে যা সময়ের সাথে সাথে ধূসর হয় না, বরং মনের গহীন কোণে আরও বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। আমার কাছে মা মানেই হলো একটি সাদা-কালো স্থির চিত্র। শুনেছি, সেই ছবিটা বিয়ের আগে বাবাকে পাঠানোর জন্যই তোলা হয়েছিল। ঝাপসা হয়ে আসা সেই ছবির এক কোণে মা’র সেই স্নিগ্ধ হাসিটা আজও পরম মমতায় আটকে আছে।
মা’র সংসার, আমাদের সেই ছোট্ট আপন ঘর—সেখানে এই হাসিটাই ছিল আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র আশ্রয়। আজ ২০২৬ সালের এই মে মাসে যখন চারদিকে মা দিবসের উৎসবের রং ছড়ানো, তখন আমার আকাশজুড়ে শুধু অক্টোবরের সেই বিষণ্ন মেঘ। গত বছরের সেই একটি মাস আমার জীবনের সমস্ত আলো কেড়ে নিয়ে মা-কে এক না ফেরার দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। মা নেই—এই তিনটা শব্দ যে কত বড় এক সমুদ্রের সমান দীর্ঘশ্বাস, তা বোঝানোর মতো ভাষা আমার জানা নেই।
আমাদের শৈশব আর কৈশোরটা ছিল আদ্যোপান্ত ‘মা-ময়’। মা’র ব্যবহৃত পারফিউমের সেই মায়াবী ঘ্রাণ আজও আমার নাকে লেগে আছে। আমাদের জামাকাপড়ের পছন্দ থেকে শুরু করে কথা বলার ভঙ্গি, চুলে চিরুনি চালানো থেকে শুরু করে জীবনের বড় বড় সিদ্ধান্ত—সবখানেই ছিল মা’র হাতের ছোঁয়া। মা মানুষ হিসেবে কেমন ছিলেন, সেই বিচার করার মতো ধৃষ্টতা আমাদের কোনোদিন ছিল না; আমাদের কাছে ধ্রুব সত্য ছিল শুধু একটাই—মা আমাদের জন্য পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ। সেই পর্বতসম ভরসা নিয়েই আমরা বড় হয়েছি। মা থাকা মানেই ছিল একধরনের নিশ্চয়তা, একধরনের অভয়বাণী যে যাই হয়ে যাক না কেন, দিনশেষে ফিরে যাওয়ার একটা জায়গা আছে।
কিন্তু আমরা তো কেউ নিখুঁত ছিলাম না। আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনটা কোনো রূপকথার গল্প ছিল না। কত শত রাগ, অভিমান আর ক্ষোভ আমরা মনের ভেতর পাথর করে জমিয়ে রেখেছি। আজ যখন মা নেই, তখন সেই ছোট ছোট জেদগুলো যেন গলা চেপে ধরে। কত শত সময়ে দেখা গেছে, তুচ্ছ কোনো কারণে ইগো জিতে গেছে, আর মা’র সাথে আমাদের দূরত্ব বেড়ে গেছে। হয়তো কথা না বলে দিনের পর দিন কাটিয়ে দিয়েছি একই ছাদের নিচে। অথচ মা’র সেই শান্ত অস্তিত্বটাই ছিল আমাদের মনের শান্তি। আমরা জানতাম মা আছেন, ব্যস—এটুকুই ছিল যথেষ্ট।
২০১৯ সালটা ছিল আমাদের জীবনের কালবৈশাখী। মা’র প্রথম স্ট্রোক আমাদের সাজানো পৃথিবীটাকে এক নিমেষে ওলটপালট করে দিল। সেই হাসিখুশি, চঞ্চল মা-কে আমরা আর আগের মতো পেলাম না। মা’র অসুস্থতা আমাদের শিখিয়ে দিল জীবন কতটা রূঢ় হতে পারে। যে আমি কখনো নিজের খাওয়ার প্লেটটা সিঙ্কে রাখার প্রয়োজন মনে করিনি, মা’র অসুস্থতায় সেই আমাকেই প্রথম উনুন জ্বালাতে হলো।
রান্না শিখলাম জীবনের তাগিদে, মা’র পছন্দের খাবারগুলো করার ব্যর্থ চেষ্টায়। আপুনি নিজের অজান্তেই হয়ে উঠল মা’র প্রতিচ্ছবি, আমাদের আরেকজন মা। আর বাবা? তিনি হয়তো নিজের ভেতরে ভেতরে গুমরে মরতেন, তবু শিখলেন কীভাবে একাকীত্বের সাথে লড়াই করে নিজের কাজটুকু গুছিয়ে নিতে হয়। শুধু আমাদের পরিবারের সেই ছোট সদস্যটি, যাকে আমরা বাবু বলি—সে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে চেয়ে দেখল কীভাবে তার শৈশবের আকাশটা কালো মেঘে ঢেকে যাচ্ছে। সে কিছু বোঝার আগেই দেখল বাড়ির প্রধান চালিকাশক্তি কেমন করে হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল।
মা, তোমার সেই সাদা-কালো ছবির হাসিটাই আমার জীবনের ধ্রুবতারা। তুমি আছ, তুমি চিরকাল থাকবে আমার সত্তায়। এই পৃথিবীতে আমার পরিচয় একটাই—আমি তোমার সন্তান। মা মনে থাকুক। আমাদের সমস্ত সাহসে, আমাদের সমস্ত ভালো লাগায় মা বেঁচে থাকুক চিরকাল। শুভ মা দিবস, মা। ওপারে ভালো থেকো।
মা চলে যাওয়ার পর প্রথম সেই শীতের দিনগুলো ছিল বিষণ্নতায় মোড়ানো। উত্তরবঙ্গের হাড়কাঁপানো শীতের তীব্রতা আর স্থায়িত্বের সাথে পাল্লা দিয়েই চলত মা’র পিঠা বানানোর উৎসব। যতদিন শীত থাকত, ততদিন আমাদের বাসায় 'দুধ চিতই' থাকবেই—এটা ছিল অলিখিত এক নিয়ম। মা অসুস্থ হওয়ার পর এই আয়োজনের জাঁকজমক কিছুটা কমলেও নিয়মটা কখনও ভাঙেনি। এ বছর শীতটাও ঠিক সময়েই এসেছে, কিন্তু সেই নিয়মটা তো আর নেই। মা নেই—আজ আর কোনো আনুষ্ঠানিকতাও নেই।
মা’র অনুপস্থিতিতে এ বছর ভাবলাম নিজেই উদ্যোগ নিই। সপ্তাহখানেক আগে লামু’র মা, যিনি সম্পর্কে আমার কাজিন, তাকে যখন এই দুধ চিতই বানানোর আয়োজনের কথা বলছিলাম, তখন বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠছিল। আজকাল মা’র গল্প করতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। মাঝে মাঝে ভাবি, মাথায় জেদ চাপলে মা’র একশ একটা গল্প নিয়ে আস্ত একটা বই-ই লিখে ফেলব! মা’র পিঠা বানানোর সেই নিপুণ হাতজোড়া আর উনুনের ধোঁয়ায় মা’র সেই লাল হয়ে যাওয়া মুখটা আজ কেবলই স্মৃতি।
মা’র মৃত্যুর পর আমি যখন আমার এই নতুন বাসায় উঠি, তখন বুকের ভেতরটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল। আমি লিখেছিলাম— "মা, দেখে যাও তোমার মেয়ে আজ তার নিজের ঘর গুছিয়েছে। কিন্তু এই ঘরের প্রতিটি দেওয়ালে তোমার অনুপস্থিতি চিৎকার করে বলছে যে, তুমি ছাড়া কোনো ঘরই আসলে পূর্ণ হয় না।" আজ এই নতুন ঘরে সব আছে—সৌখিন আসবাব, পরিপাটি পর্দা, নামীদামি পারফিউম—শুধু নেই সেই মানুষটি, যার পায়ের নিচে আমার বেহেশত ছিল। মা দিবসের এই সকালে যখন ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে "Happy Mother's Day", তখন এই নতুন দেয়ালগুলো আমাকে বিদ্রূপ করে। মনে হয়, কেউ যদি একবারের জন্যও মা’র সেই পুরোনো ডাকটা ফিরিয়ে দিত!
সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় মা’র জীবনের শেষ দিনগুলোর কথা ভেবে। বাস্তবতা এতটাই কঠিন ছিল যে, শেষের দিকে আমাদের মাঝে একধরনের বিষণ্ন দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। হয়তো মা প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ছিলেন, আর আমরা তাঁর সেই তিল তিল করে শেষ হয়ে যাওয়া দেখে ভয়ে, চরম অসহায়তায় দূরে সরে যাচ্ছিলাম। কেন যে আমরা আমাদের ভেতরের সেই উপচে পড়া ভালোবাসা আর আকুলতাটা বাইরে প্রকাশ করতে পারলাম না! কেন শেষবার মা’র কপালে হাত রেখে বলতে পারলাম না, "মা, আমরা তোমাকে ছাড়া কিচ্ছু বুঝি না!" এই অক্ষমতার আফসোস, এই না-বলা কথাগুলোর ভার এখন সারা জীবন আমাকে বয়ে বেড়াতে হবে। অপরাধবোধের এই দহন কোনোদিন নিভবে না।
আজ যাঁদের মা পাশে আছেন, তাঁদের জন্য বলতে চাই—দয়া করে সময়ের অভাব বা ইগোকে আপনাদের মাঝখানে আসতে দেবেন না। মা’র সাথে একটু বেশি করে কথা বলুন, তাঁর ঝাপসা হয়ে আসা চোখের দিকে তাকিয়ে একটু হাসুন। কারণ মা যখন চলে যান, তখন শুধু একজন মানুষই চলে যান না, আপনার শৈশবের বাগানটা চিরতরে শুকিয়ে যায়। মা’র ছোট ছোট আবদারগুলো অপূর্ণ রাখবেন না।
একদিন দেখবেন আপনার অনেক টাকা হবে, অনেক সাফল্য আসবে, কিন্তু সেই সাফল্য ভাগ করে নেওয়ার জন্য মা’র সেই গর্বিত মুখটা আর পাশে পাবেন না। মা থাকা মানে মাথার ওপর এক নির্ভরতার আকাশ; আর সেই আকাশ হারিয়ে গেলে জীবনের সব তপ্ত রোদ্দুর এসে সজোরে ধাক্কা দেয় অস্তিত্বের গভীরে।
আমার মা আসলে হয়তো হারিয়ে যাননি। মা বেঁচে আছেন আমার প্রতিটি লেখায়, আমার প্রতিটি সংগ্রামে। আমি যখন আয়নার সামনে দাঁড়াই, তখন মা’র সেই আদল নিজের মাঝে খুঁজি। আমার বাঁপাশের উপরের পাটির গজ দাঁতটাও মা’র থেকে পাওয়া—মায়েরও এরকম একটা উঁচু দাঁত ছিল, যা মা’র হাসিটাকে আরও স্নিগ্ধ করে তুলত।
আমার প্রতিটি হাসি মা’কে মনে করিয়ে দেয়। আমার রান্নায় যখন নুন কম হয়, তখন মনে হয় মা থাকলে ঠিকই বলে দিতেন। মা বেঁচে আছেন আমার সাহসে, আমার সমস্ত ভালো লাগায়। মা মনে থাকুক আমাদের প্রতিটি নিঃশ্বাসে। মা দিবসে আমি শুধু একটাই প্রার্থনা করি—মা, তুমি যেখানেই থাকো, ওখান থেকে আমাদের আগলে রেখো। আমাদের সব ভুল, সব অবহেলা তুমি ক্ষমা করে দিও।
মা, তোমার সেই সাদা-কালো ছবির হাসিটাই আমার জীবনের ধ্রুবতারা। তুমি আছ, তুমি চিরকাল থাকবে আমার সত্তায়। এই পৃথিবীতে আমার পরিচয় একটাই—আমি তোমার সন্তান। মা মনে থাকুক। আমাদের সমস্ত সাহসে, আমাদের সমস্ত ভালো লাগায় মা বেঁচে থাকুক চিরকাল। শুভ মা দিবস, মা। ওপারে ভালো থেকো।
লেখক : সিইও, ইটিসি ইভেন্টস লিমিটেড।
এইচআর/জেআইএম
What's Your Reaction?