মাগুরার সবুজ গালিচায় আগামীর টাইগারদের পদধ্বনি
দীর্ঘ ক্রিকেট-জীবনে বিদেশে ও দেশের আনাচকানাচে অসংখ্য মাঠ দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি মাগুরা জেলা স্টেডিয়ামে ‘ইয়াং টাইগার্স অনূর্ধ্ব-১৪ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট’-এর নির্বাচকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যে দৃশ্য দেখলাম, তা এককথায় বিস্ময়কর। মাগুরার এই সবুজ গালিচায় দাঁড়িয়ে বারবার মনে হচ্ছিল, ঢাকার বাইরেও যে এত চমৎকার সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন মাঠ থাকতে পারে, তা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। একটি বিভাগীয় স্টেডিয়ামে সাধারণত যেসব আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকা প্রয়োজন, মাগুরা জেলা স্টেডিয়ামের মূল ভবন ও আনুষঙ্গিক পরিকাঠামো তার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। রাজশাহী, খুলনা বা সিলেট বিভাগীয় স্টেডিয়ামের মতো আন্তর্জাতিক মানের ভেন্যুগুলোর সঙ্গে এর কাঠামোগত তফাত নেই বললেই চলে। অভাব কেবল নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের। আমি মনে করি, সামান্য কিছু সংস্কারকাজ আর আধুনিকতার ছোঁয়া পেলে এটি অনায়াসেই দেশের অন্যতম সেরা ভেন্যুতে পরিণত হতে পারে। এখানকার মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য আর যত্নে সাজানো আউটফিল্ড যেকোনো ক্রিকেটারের মন ভালো করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। টুর্নামেন্ট চলাকালে বৃষ্টির বাগড়া সত্ত্বেও আমরা নির্বিঘ্নে খেলা চালিয়ে নিতে পেরে
দীর্ঘ ক্রিকেট-জীবনে বিদেশে ও দেশের আনাচকানাচে অসংখ্য মাঠ দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি মাগুরা জেলা স্টেডিয়ামে ‘ইয়াং টাইগার্স অনূর্ধ্ব-১৪ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট’-এর নির্বাচকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যে দৃশ্য দেখলাম, তা এককথায় বিস্ময়কর। মাগুরার এই সবুজ গালিচায় দাঁড়িয়ে বারবার মনে হচ্ছিল, ঢাকার বাইরেও যে এত চমৎকার সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন মাঠ থাকতে পারে, তা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।
একটি বিভাগীয় স্টেডিয়ামে সাধারণত যেসব আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকা প্রয়োজন, মাগুরা জেলা স্টেডিয়ামের মূল ভবন ও আনুষঙ্গিক পরিকাঠামো তার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। রাজশাহী, খুলনা বা সিলেট বিভাগীয় স্টেডিয়ামের মতো আন্তর্জাতিক মানের ভেন্যুগুলোর সঙ্গে এর কাঠামোগত তফাত নেই বললেই চলে। অভাব কেবল নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের। আমি মনে করি, সামান্য কিছু সংস্কারকাজ আর আধুনিকতার ছোঁয়া পেলে এটি অনায়াসেই দেশের অন্যতম সেরা ভেন্যুতে পরিণত হতে পারে। এখানকার মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য আর যত্নে সাজানো আউটফিল্ড যেকোনো ক্রিকেটারের মন ভালো করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
টুর্নামেন্ট চলাকালে বৃষ্টির বাগড়া সত্ত্বেও আমরা নির্বিঘ্নে খেলা চালিয়ে নিতে পেরেছি। এর পুরো কৃতিত্ব মাগুরার গ্রাউন্ডসম্যানদের একাগ্রতা আর মাঠের চমৎকার নিষ্কাশন বা ড্রেনেজ ব্যবস্থার। তবে পেশাদার ক্রিকেটের মানদণ্ডে কিছু সীমাবদ্ধতাও চোখে পড়েছে, যা দ্রুত সমাধানযোগ্য। বৃষ্টির সময় শুধু উইকেট ঢাকলেই চলে না, পেসারদের রান-আপও শুকনো রাখা জরুরি; তাই এখানে পর্যাপ্ত পিচ কাভার প্রয়োজন। আউটফিল্ডের লেভেল কিছুটা নিচু, যা মাটি ফেলে উঁচু করা দরকার। উইকেটে আরও মাটি ব্যবহার করে এটিকে স্পোর্টিং ও প্রাণবন্ত করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, পেশাদার উইকেট প্রস্তুতির জন্য একটি ১০০০ টনের হ্যান্ডরোলার এখন এই ভেন্যুর সময়ের দাবি। তা সত্ত্বেও মাগুরার উইকেট নিয়ে আমি অত্যন্ত আশাবাদী। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন ভেন্যুতে যত খেলা হচ্ছে, তার মধ্যে মাগুরার উইকেট ও আউটফিল্ডকে আমি নির্দ্বিধায় শীর্ষস্থান দেব। অন্যান্য জেলা থেকে আসা কোচ ও খেলোয়াড়দের প্রতিক্রিয়াও একই—আবাসন থেকে শুরু করে মাঠের সুবিধা, সবকিছু মিলিয়ে মাগুরা এখন উদীয়মান ক্রিকেটারদের কাছে অন্যতম সেরা ভেন্যু।
মাগুরার তরুণ ক্রিকেটারদের মেধা ও প্রতিভা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। তবে তাদের প্রধান অন্তরায় হলো পর্যাপ্ত সুযোগের অভাব। ইনডোর সুবিধা না থাকায় এখানকার খেলোয়াড়েরা বছরে মাত্র তিন-চার মাস অনুশীলনের সুযোগ পান, যেখানে বড় শহরের ছেলেরা সারা বছরই অনুশীলনের মধ্যে থাকেন। তিন মাস পড়াশোনা করে পরীক্ষা দেওয়া আর সারা বছর পড়ে পরীক্ষা দেওয়ার মধ্যে ফলাফলের যে পার্থক্য থাকে, মাগুরার ক্রিকেটেও সেই ব্যবধানটিই ফুটে উঠছে। একটি মানসম্মত ইনডোর গড়ে তোলা গেলে এখানকার তরুণেরা বৃষ্টি বা বৈরী আবহাওয়ার তোয়াক্কা না করে বারো মাসই নিজেদের ঝালিয়ে নিতে পারবেন। জেলা ক্রীড়া সংস্থা যদি জায়গা নির্ধারণ করে দিতে পারে, তবে বিসিবির তরফ থেকে প্রয়োজনীয় সব অবকাঠামো গড়ে দেওয়া সম্ভব বলে আমি বিশ্বাস করি।
সাকিব আল হাসান আমাদের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় আইকন, যার বাঁহাতি ঘূর্ণি আর আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের কারণে বিশ্ব আজ বাংলাদেশকে নতুনভাবে চেনে। মাগুরার এই কৃতী সন্তানের পর এই জেলা থেকে কেন সেভাবে বড় তারকা উঠে আসছে না, তা নিয়ে একটি আক্ষেপ রয়েছে। এর উত্তর লুকিয়ে আছে স্থানীয় একাডেমিগুলোর আধুনিকায়নের মধ্যে। স্থানীয় একাডেমিগুলোকে বিসিবির সঙ্গে সমন্বয় করে কোচদের মানোন্নয়নের জন্য লেভেল-১ ও লেভেল-২ কোর্সের ব্যবস্থা করতে হবে। বিজ্ঞানসম্মত প্রশিক্ষণ, ফিটনেসের সঠিক ধারণা আর আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া বর্তমান যুগে বিশ্বমানের ক্রিকেটার তৈরি করা অসম্ভব। আমি ব্যক্তিগতভাবে এখানকার স্থানীয় কোচদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার পরিকল্পনা করছি, যাতে পারস্পরিক অভিজ্ঞতার বিনিময় ঘটে এবং প্রতিভা অন্বেষণের প্রক্রিয়াটি আরও নিখুঁত হয়।
মাগুরার আতিথেয়তা এবং আয়োজকদের সক্ষমতাকে আমি নিঃসন্দেহে ‘এ প্লাস’ দেব। এখানকার সংগঠকদের মধ্যে যে একতা ও পেশাদারত্ব দেখেছি, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তারা ফেলে রাখার নীতিতে বিশ্বাসী নন, যেকোনো কাজ আজই সম্পন্ন করতে মরিয়া। এই ইতিবাচক মানসিকতাই মাগুরার ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় শক্তি। তবে মনে রাখতে হবে, দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই কেবল টেকসই সাফল্য আসে। মাগুরাকে একটি স্থায়ী ও নির্ভরযোগ্য ক্রিকেট হাব হিসেবে গড়তে হলে এখানে আরও একটি মাঠ বা মিনি স্টেডিয়ামের প্রয়োজন। এতে খেলোয়াড়দের অনুশীলন ও মূল ম্যাচের মধ্যে ভারসাম্য আসবে, ভ্রমণক্লান্তি কমবে এবং খেলার মান বাড়বে।
পরিশেষে অভিভাবকদের প্রতি আমার বিনীত অনুরোধ, আপনাদের সন্তানদের মাঠে আসার সুযোগ দিন, খেলাধুলায় উৎসাহিত করুন। ক্রিকেট এখন নিছক কোনো বিনোদন বা খেলা নয়, এটি একটি সম্মানজনক ও উজ্জ্বল ক্যারিয়ার। ফাহিমা খাতুন, দিশা বিশ্বাস কিংবা সাকিব আল হাসানের মতো তারকাদের জীবন বদলে দিয়েছে এই ক্রিকেট। প্রথাগত পড়াশোনার পাশাপাশি সঠিক খাদ্যাভ্যাস, ফিটনেস ও শৃঙ্খলা মেনে চললে মাগুরার এই সবুজ গালিচা থেকেই আগামী দিনে আরও অনেক সুপারস্টার বেরিয়ে আসবে—এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। সঠিক পরিকল্পনা ও একটু বিশেষ নজর দিলে এই জেলাটি অচিরেই বাংলাদেশের ক্রিকেটের অন্যতম শক্তিকেন্দ্র বা ‘পাওয়ার হাউস’ হয়ে উঠবে।
What's Your Reaction?