মাঠে হাল ধরে সুন্দর করে..
মাঠে হাল ধরে যে মানুষটি রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে আমাদের খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করে—তার শ্রমই সভ্যতার প্রথম ভিত্তি। অথচ সেই ভিত্তির মানুষটি আজও কি তার ন্যায্য মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সচ্ছলতা নিশ্চিত করতে পেরেছেন? মে দিবস তাই শুধু অতীত ইতিহাস নয়; এটি বর্তমান সময়ের এক গভীর আত্মজিজ্ঞাসা, এক অনিবার্য সামাজিক প্রশ্ন। ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ১৮৮৬ সালের শিকাগো শহরের হে মার্কেট আন্দোলন, যেখানে শ্রমিকরা দৈনিক আট ঘণ্টা শ্রমের ন্যায্য দাবিতে রক্ত দিয়েছিলেন। সেই রক্তাক্ত ইতিহাস শুধু একটি দিনকে স্মরণ করানোর জন্য নয়; বরং শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার চিরন্তন অঙ্গীকার হিসেবে আজও প্রাসঙ্গিক। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—সময় এগিয়েছে, প্রযুক্তি বদলেছে, উৎপাদন ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে; কিন্তু শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান, নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকার অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে কৃষক, শ্রমিক এবং প্রবাসী শ্রমিকদের জীবনে এই বৈষম্য আরও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। আজকের কৃষক শুধু মাঠে হাল ধরেন না; তিনি আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয়ের চাপ, সার-বীজের মূল্যবৃদ্ধি এবং বাজার ব্যবস্থার অস
মাঠে হাল ধরে যে মানুষটি রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে আমাদের খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করে—তার শ্রমই সভ্যতার প্রথম ভিত্তি। অথচ সেই ভিত্তির মানুষটি আজও কি তার ন্যায্য মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সচ্ছলতা নিশ্চিত করতে পেরেছেন? মে দিবস তাই শুধু অতীত ইতিহাস নয়; এটি বর্তমান সময়ের এক গভীর আত্মজিজ্ঞাসা, এক অনিবার্য সামাজিক প্রশ্ন।
১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ১৮৮৬ সালের শিকাগো শহরের হে মার্কেট আন্দোলন, যেখানে শ্রমিকরা দৈনিক আট ঘণ্টা শ্রমের ন্যায্য দাবিতে রক্ত দিয়েছিলেন। সেই রক্তাক্ত ইতিহাস শুধু একটি দিনকে স্মরণ করানোর জন্য নয়; বরং শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার চিরন্তন অঙ্গীকার হিসেবে আজও প্রাসঙ্গিক।
কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—সময় এগিয়েছে, প্রযুক্তি বদলেছে, উৎপাদন ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে; কিন্তু শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান, নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকার অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে কৃষক, শ্রমিক এবং প্রবাসী শ্রমিকদের জীবনে এই বৈষম্য আরও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
আজকের কৃষক শুধু মাঠে হাল ধরেন না; তিনি আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয়ের চাপ, সার-বীজের মূল্যবৃদ্ধি এবং বাজার ব্যবস্থার অসংগতি—সবকিছুর সঙ্গে এক অসম লড়াইয়ে নিয়োজিত। কখনো বন্যা, কখনো খরা, আবার কখনো ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়া—সব মিলিয়ে কৃষকের জীবন আজও এক অনিশ্চিত সংগ্রামের নাম।
একইভাবে শহরের শ্রমিকেরা নির্মাণ সাইট, পোশাক কারখানা, পরিবহন খাত কিংবা গৃহশ্রমে কঠোর পরিশ্রম করলেও তাদের জীবনমান অনেক ক্ষেত্রেই ন্যূনতম মানবিক মানদণ্ডে পৌঁছায়নি। শ্রমের মূল্য বাড়লেও শ্রমিকের জীবন নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষা এখনও প্রশ্নবিদ্ধ।
এখন এই বাস্তবতার সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে প্রবাসী শ্রমিকদের সংকট ও অবদান। বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো প্রবাসী শ্রমিকরা। মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের নানা দেশে তারা ঘাম ঝরিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স জাতীয় উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
কিন্তু সেই প্রবাসী শ্রমিকদের জীবন কি সহজ? অনেকেই দালাল চক্রের প্রতারণা, উচ্চ অভিবাসন ব্যয়, অনিশ্চিত কর্মচুক্তি এবং কর্মক্ষেত্রে শোষণের শিকার হন। কেউ বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় কাজ করেন, কেউ আবার দুর্ঘটনা বা অসুস্থতায় দেশে ফিরতে বাধ্য হন নিঃস্ব অবস্থায়। তাদের পরিবারের স্বপ্নগুলোও অনেক সময় ভেঙে পড়ে এক অপ্রকাশিত কষ্টের ভেতর।
আজকের কৃষক শুধু মাঠে হাল ধরেন না; তিনি আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয়ের চাপ, সার-বীজের মূল্যবৃদ্ধি এবং বাজার ব্যবস্থার অসংগতি—সবকিছুর সঙ্গে এক অসম লড়াইয়ে নিয়োজিত। কখনো বন্যা, কখনো খরা, আবার কখনো ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়া—সব মিলিয়ে কৃষকের জীবন আজও এক অনিশ্চিত সংগ্রামের নাম। এখন এই বাস্তবতার সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে প্রবাসী শ্রমিকদের সংকট ও অবদান। বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো প্রবাসী শ্রমিকরা। মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের নানা দেশে তারা ঘাম ঝরিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স জাতীয় উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। কিন্তু সেই প্রবাসী শ্রমিকদের জীবন কি সহজ?
প্রবাসী শ্রমিকরা দেশের অর্থনীতির “নীরব নায়ক”, কিন্তু সামাজিকভাবে তারা কতটা সম্মান ও সুরক্ষা পাচ্ছেন—এ প্রশ্ন এখনও অমীমাংসিত। অনেক ক্ষেত্রে তারা শুধু অর্থ পাঠানোর মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হন, মানুষ হিসেবে তাদের জীবন-সংগ্রাম উপেক্ষিত থেকে যায়।
মে দিবস তাই কেবল কৃষক বা স্থানীয় শ্রমিকের কথা নয়; এটি বৈশ্বিক শ্রমিক শ্রেণির অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্ন। স্থানীয় শ্রমিক থেকে শুরু করে প্রবাসে কর্মরত মানুষ—সবাই একই সূত্রে গাঁথা: তাদের ঘামেই গড়ে ওঠে অর্থনীতির ভিত্তি।
আজকের যুগে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো “নতুন শ্রম অর্থনীতি” বা গিগ ইকোনমি। রাইড শেয়ারিং, ডেলিভারি সার্ভিস, অনলাইন কাজের সঙ্গে যুক্ত লাখো শ্রমিক এখন নতুন কর্মশক্তি তৈরি করেছে। কিন্তু তাদের অনেকেই এখনও আইনি সুরক্ষা, বীমা সুবিধা ও স্থিতিশীল আয়ের নিশ্চয়তা থেকে বঞ্চিত।
এই পুরো চিত্র আমাদের একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়—শ্রম বাড়ছে, কিন্তু মর্যাদা ও নিরাপত্তা সেই অনুপাতে বাড়ছে না। শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্য স্বীকৃত হলেও সামাজিক মর্যাদা অনেক ক্ষেত্রে এখনও অনিশ্চিত।
মে দিবস আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—শ্রম কখনো ছোট নয়। কৃষকের মাঠে কাজ, শ্রমিকের ঘামে ভেজা পোশাক, প্রবাসীর প্রবাসজীবনের কষ্ট—সবই জাতির অগ্রগতির অপরিহার্য অংশ। এই শ্রমকে অবমূল্যায়ন করলে উন্নয়নের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে।
তাই আজকের দিনে সবচেয়ে জরুরি হলো শ্রমের ন্যায্য মূল্যায়ন ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা। শুধু আইন প্রণয়ন নয়, তার কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন। শ্রমিকের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যসেবা রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে আনতে হবে।
একই সঙ্গে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও পরিবর্তন জরুরি। শ্রমিক, কৃষক বা প্রবাসী—তাদের প্রতি অবজ্ঞা নয়, বরং শ্রদ্ধা ও স্বীকৃতির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। কারণ সভ্যতা তখনই মানবিক হয়, যখন শ্রমকে সম্মান করা হয়।
মে দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে- “একটি সুস্থ মানস-সামাজিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ” (Ensuring a Healthy Psychosocial Working Environment)। এই বছরের প্রতিপাদ্যটিতে মূলত আধুনিক কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের মানসিক স্বাস্থ্য, মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনা এবং একটি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর কাজের পরিবেশ তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মে দিবস তাই কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি একটি অঙ্গীকারের দিন—ন্যায়ভিত্তিক সমাজ, শোষণমুক্ত কর্মব্যবস্থা এবং মানবিক অর্থনীতি গড়ে তোলার অঙ্গীকার।
কথা এই যে—মাঠে হাল ধরা কৃষক, শহরের শ্রমিক এবং প্রবাসে ঘাম ঝরানো মানুষ—এই তিন শ্রেণির শ্রমেই দাঁড়িয়ে আছে আমাদের অর্থনীতি। তাদের ঘামের মর্যাদা নিশ্চিত করা মানেই জাতির মর্যাদা নিশ্চিত করা।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]
এইচআর/জেআইএম
What's Your Reaction?