মালয়েশিয়ায় রিজোলি নিউ ইয়র্ক (Rizzoli New York) থেকে প্রকাশিত স্মারকগ্রন্থ ‘রফিক আজম: ওল্ড ঢাকা – নিউ স্টোরি: আর্কিটেকচার ইন বাংলাদেশ’-এর মালয়েশিয়া সংস্করণের উন্মোচন এবং প্রফেসর স্থপতি রফিক আজমের পঞ্চম একক স্থাপত্য প্রদর্শনী ‘ওল্ড ঢাকা – নিউ স্টোরি: আ জার্নি বাই বোট’-অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। প্রজেক্ট রুম, দ্য টফি, কুয়ালালামপুরের ‘দি আরবান মিউজিয়াম’ ও ‘সাতত্য আর্কিটেকচার ফর গ্রিন লিভিং’ -এর যৌথ পরিবেশনায় এ আয়োজন করা হবে।
উদ্বোধনী পর্বটি আগামী ২৮ আগস্ট মালয়েশিয়ায় কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত হবে। উদ্বোধনের পর প্রদর্শনীটি এক মাসব্যাপী সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে, যেখানে দর্শনার্থীরা অঙ্কনচিত্র, নকশা, স্কেল মডেল, ইনস্টলেশন, চলচ্চিত্র এবং মাল্টিমিডিয়া পরিবেশনার মাধ্যমে স্থপতি রফিক আজমের স্থাপত্যদর্শন, সৃজনশীল প্রক্রিয়া এবং পুরান ঢাকার সাংস্কৃতিক রূপকল্পকে নিবিড়ভাবে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পাবেন।
সিডনি অপেরা হাউস (অস্ট্রেলিয়া), ইন্টারন্যাশনাল হাউস অব জাপান (টোকিও), বেয়ারফুট গ্যালারি (কলম্বো), কলকাতা, বেঙ্গালুরু, পুনে, ইয়োগয়াকার্তাসহ বিশ্বের বহু খ্যাতনামা নগরীতে প্রশংসিত আন্তর্জাতিক পর্বগুলোর পর, কুয়ালালামপুর সংস্করণটি গ্রন্থটির বিশ্বযাত্রার ধারাবাহিকতা বজায় রাখছে। একইসঙ্গে এটি স্থাপত্যকে স্মৃতি, ভূদৃশ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক নিমগ্ন অভিজ্ঞতা (immersive exhibition experience) হিসেবে উপস্থাপন করছে।
রিজোলি নিউ ইয়র্ক থেকে প্রকাশিত এবং রোজা মারিয়া ফালভো সম্পাদিত ‘ওল্ড ঢাকা – নিউ স্টোরি: আর্কিটেকচার ইন বাংলাদেশ’ গ্রন্থে প্রখ্যাত স্থপতি রফিক আজমের অনন্য স্থাপত্যযাত্রার আলেখ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে—পুরান ঢাকার নিবিড় গলিঘুঁজিতে বেড়ে ওঠা এক তরুণ শিল্পী থেকে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অন্যতম স্বীকৃত স্থপতি হয়ে ওঠার গল্প।
জলরং চিত্রকলা, বাংলার সুফি-মর্মীবাদ, আলো, জল, প্রকৃতি এবং মানবিক অভিজ্ঞতায় সিক্ত এই স্মারকগ্রন্থে স্থাপত্যকে কেবল 'নির্মাণকাঠামো' হিসেবে নয়, বরং সংস্কৃতি, পরিবেশ ও দৈনন্দিন জীবনের এক অমলিন অভিব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্থাপত্যকে সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার মূলধারায় উন্নীত করতে বইটিতে কেনেথ ফ্র্যাম্পটন, প্রফেসর শামসুল ওয়ারেস, ফিলিপ গোড, জর্জ কুনিহিরো এবং প্রফেসর ফুয়াদ এইচ মল্লিকের মতো বিশ্বখ্যাত স্থাপত্যচিন্তকদের গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ৭০টিরও বেশি দেশে রিজোলি কর্তৃক পরিবেশিত এই গ্রন্থটি নিউ ইয়র্কের ‘MoMA’, লন্ডনের ‘টেট মডার্ন’, প্যারিসের ‘সেন্টার পম্পিদু’সহ ওয়ার্ল্ডস্টোনস, বার্নস অ্যান্ড নোবেল ও কিনোকুনিয়ার মতো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বইয়ের দোকানে প্রদর্শিত ও সংরক্ষিত হচ্ছে।
প্রথাগত কোনো স্থাপত্য প্রদর্শনীর বদলে ‘ওল্ড ঢাকা – নিউ স্টোরি: আ জার্নি বাই বোট’ গ্যালারিটিকে এক গল্পময় ও জীবন্ত অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত করেছে। বুড়িগঙ্গা নদীর বুকে কাটানো স্থপতি রফিক আজমের শৈশবের স্মৃতিময় নৌকাভ্রমণ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আয়োজিত এই প্রদর্শনী দর্শনার্থীদের পুরান ঢাকাকে কেবল একটি ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে নয়, বরং স্মৃতি, কল্পনা ও স্থাপত্য-অনুপ্রেরণার এক প্রাণবন্ত উৎস হিসেবে নতুন করে আবিষ্কার করতে আহ্বান জানায়।
দর্শনার্থীরা একটি প্রতীকী কাঠের নৌকায় ‘আরোহণ’ করার মাধ্যমে তাদের যাত্রা শুরু করবেন। এরপর পুরান ঢাকার আবহ পুনর্নির্মাণকারী সুবিন্যস্ত স্পেশাল ইনস্টলেশনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাবেন। বিশাল আকারের মানচিত্র সেটে দেওয়া হয়েছে মেঝেতে। সাদাকালো সেসব চিত্রের ভেতর থেকে স্থপতি আজমের সবুজ স্থাপত্যগুলো রঙ্গিন হয়ে ফুটে উঠেছে। স্থাপত্যের নকশা, মডেল, চলচ্চিত্র, আলোকচিত্র, পারিপার্শ্বিক শব্দমালা (soundscapes) এবং প্রজেকশনের মাধ্যমে নদী, শহর, সমাজ ও স্থাপত্যের মধ্যকার নিবিড় সম্পর্ককে এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
প্রদর্শনীটির আবেগঘন চূড়া হিসেবে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে ‘পুরান ঢাকার একটি গলি’। এই নিবিড় স্পেসের ভেতর একটি সিনেমাটিক প্রজেকশনের মাধ্যমে পুরান ঢাকা জুড়ে স্থপতি আজমের রূপান্তরকারী কাজের প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে—যেখানে দেখা যায় কীভাবে অবহেলিত নগর-স্পেসগুলো আলো, মর্যাদা, খেলাধুলা, শিক্ষা, আধ্যাত্মিকতা এবং মেলবন্ধনের নতুন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রজেকশনটি স্থপতি আজমের চিরন্তন অনুভূতির মাধ্যমে শেষ হয়: ‘আমাদের শহর তখনই সুন্দর হয়ে উঠবে, যখন শহরের প্রধান শব্দ হবে শিশুদের খিলখিল হাসি।’
এই কথাগুলো বই এবং প্রদর্শনী উভয় সত্তার মূল দর্শনকে ধারণ করে: স্থাপত্যের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো মানুষের জীবনকে আরও সুন্দর ও সার্থক করে তোলা।
প্রদর্শনীটিতে পুরান ঢাকায় স্থপতি আজমের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কাজগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা দেখায় কীভাবে স্থাপত্য কেবল ভবন নির্মাণ না করে একটি পুরো সমাজ ও সম্প্রদায়কে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। প্রদর্শিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—মেয়র হানিফ জামে মসজিদ, রসুলবাগ শিশু পার্ক, ওসমানী উদ্যান, আঙ্গুরী বাড়ি, পাড়া-মহল্লা পুনরুজ্জীবন উদ্যোগ এবং নানাবিধ উন্মুক্ত সামাজিক স্পেস, যা জল, বৃক্ষ, উঠান ও সম্মিলিত সামাজিক জীবনের মাধ্যমে মানুষকে পুনরায় প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত করে।
পুরান ঢাকার ৩১টি অবহেলিত পার্ক ও খেলার মাঠ পুনরুজ্জীবনে স্থপতি আজমের বিশেষ ভূমিকা প্রদর্শনীতে অনন্যভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এটি এমন একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ, যা পরিত্যক্ত ও বিপজ্জনক নগর-স্পেসগুলোকে শিশু ও সাধারণ মানুষের জন্য প্রাণবন্ত পাবলিক স্পেসে রূপান্তরিত করেছে। এই কর্মপ্রয়াস শহরকে কেন্দ্র করে শিশুদের স্বপ্ন দেখা, খেলাধুলা করা এবং প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রতি তার অবিচল বিশ্বাসের প্রতিফলন।
পুরো প্রদর্শনী জুড়ে স্থাপত্যকে কোনো বিচ্ছিন্ন বস্তু হিসেবে নয়; বরং শহর ও নদী, স্মৃতি ও ভবিষ্যৎ, শিল্প ও স্থাপত্য, এবং ঘনত্ব ও উন্মুক্ততার এক অপূর্ব সংশ্লেষ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে—যা বইটির মূল সুরের সঙ্গে হুবহু প্রতিধ্বনিত হয়।