‘মুক্ত’ শব্দের আড়ালে বন্দি গণমাধ্যম
আবু রায়হান ৩ মে, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস এলেই চারদিকে এক ধরনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। স্বাধীনতা, মত প্রকাশ, সাংবাদিকের নিরাপত্তা— শব্দগুলো উচ্চারিত হয় জোর গলায়। কিন্তু বাস্তবতা? সেটি বরাবরের মতোই অস্বস্তিকর। ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ দিবসটি ঘোষণা করেছিল যে প্রত্যাশা নিয়ে, তিন দশক পেরিয়ে আজ তা কতটা পূরণ হয়েছে? এই প্রশ্নের জবাব দিতে গেলেই সামনে আসে কঠিন সত্য। ‘মুক্ত গণমাধ্যম’ শব্দটি এখন যতটা ব্যবহৃত হয়, তার চেয়ে অনেক কম অনুভূত হয়। কারণ, বাস্তবে গণমাধ্যম যতটা না স্বাধীন, তার চেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রিত। নিয়ন্ত্রণ কখনো সরাসরি, কখনো অদৃশ্য, কখনো রাষ্ট্রীয়, কখনো কর্পোরেট, আবার অনেক সময় তা স্ব-আরোপিত। ফলাফল একটাই, সত্যের জায়গা সংকুচিত, প্রশ্নের জায়গা সীমিত। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই সংকোচন আরও প্রকট। নব্বইয়ের দশকে যে গণমাধ্যম স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল, আজ সেই গণমাধ্যমের বড় অংশই নীরবতা আর আপোষে বন্দি। একসময় যে কলম অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীক্ষ্ণ ছিল, এখন তা অনেক ক্ষেত্রেই ভোঁতা। প্রশ্ন ওঠে, এ পরিবর্তন কেবল সময়ের নাকি চাপে পড়ে দিক হারানোর ফল? গত এক দশকে গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণের পরিধি বেড়েছে, এটা অ
আবু রায়হান
৩ মে, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস এলেই চারদিকে এক ধরনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। স্বাধীনতা, মত প্রকাশ, সাংবাদিকের নিরাপত্তা— শব্দগুলো উচ্চারিত হয় জোর গলায়। কিন্তু বাস্তবতা? সেটি বরাবরের মতোই অস্বস্তিকর।
১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ দিবসটি ঘোষণা করেছিল যে প্রত্যাশা নিয়ে, তিন দশক পেরিয়ে আজ তা কতটা পূরণ হয়েছে? এই প্রশ্নের জবাব দিতে গেলেই সামনে আসে কঠিন সত্য।
‘মুক্ত গণমাধ্যম’ শব্দটি এখন যতটা ব্যবহৃত হয়, তার চেয়ে অনেক কম অনুভূত হয়। কারণ, বাস্তবে গণমাধ্যম যতটা না স্বাধীন, তার চেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রিত। নিয়ন্ত্রণ কখনো সরাসরি, কখনো অদৃশ্য, কখনো রাষ্ট্রীয়, কখনো কর্পোরেট, আবার অনেক সময় তা স্ব-আরোপিত। ফলাফল একটাই, সত্যের জায়গা সংকুচিত, প্রশ্নের জায়গা সীমিত।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই সংকোচন আরও প্রকট। নব্বইয়ের দশকে যে গণমাধ্যম স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল, আজ সেই গণমাধ্যমের বড় অংশই নীরবতা আর আপোষে বন্দি। একসময় যে কলম অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীক্ষ্ণ ছিল, এখন তা অনেক ক্ষেত্রেই ভোঁতা। প্রশ্ন ওঠে, এ পরিবর্তন কেবল সময়ের নাকি চাপে পড়ে দিক হারানোর ফল?
গত এক দশকে গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণের পরিধি বেড়েছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। আইন, নীতিমালা, মালিকানার প্রভাব মিলিয়ে এক ধরনের ‘অদৃশ্য খাঁচা’ তৈরি হয়েছে। এই খাঁচার ভেতর থেকেই সংবাদ তৈরি হয়, মতামত লেখা হয়। ফলে স্বাধীনতার দাবিটি থেকে যায় কাগজেই।
তবে দায় একতরফা নয়। গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যেও প্রশ্ন আছে। সবাই কি সত্যিই স্বাধীনতা চান? নাকি নিরাপদ অবস্থান, ব্যক্তিগত সুবিধা আর টিকে থাকার জন্যই আপোষকে বেছে নেওয়া হয়? এই প্রশ্ন এড়িয়ে গেলে বাস্তবতা বোঝা যাবে না।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো ‘স্ব-নিয়ন্ত্রণ’, যা এখন এক অঘোষিত সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কোনো নির্দেশের প্রয়োজন হয় না; সাংবাদিক নিজেই বুঝে নেন কোনটা লেখা যাবে, কোনটা যাবে না। এ এক নীরব আত্মসমর্পণ, যা গণমাধ্যমের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ। তাহলে কি ‘মুক্ত গণমাধ্যম’ কেবলই এক কেতাবি ধারণা হয়ে থাকবে? বাস্তবতা বলছে ঝুঁকি আছে, কিন্তু সম্ভাবনাও আছে। প্রযুক্তির বিস্তার নতুন পথ খুলছে, বিকল্প প্ল্যাটফর্ম তৈরি হচ্ছে। তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে দরকার সাহসী অবস্থান, স্পষ্ট নৈতিকতা এবং আপোষহীন পেশাদারিত্ব।
মুক্ত গণমাধ্যমকে যদি সত্যিই বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনতে হয়, তবে মুখোশ খুলে সত্যের পাশে দাঁড়াতে হবে রাষ্ট্রকে, প্রতিষ্ঠানকে এবং সবচেয়ে বেশি গণমাধ্যমকর্মীকেই। কারণ স্বাধীনতা কেউ দেয় না, তা আদায় করতে হয়। আর যেদিন সংবাদপত্রের প্রতিটি শব্দ নির্ভয়ে সত্য উচ্চারণ করবে, সেদিনই এই দিবস ক্যালেন্ডারের তারিখ ছাড়িয়ে বাস্তবতার শক্তিতে রূপ নেবে।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী
- আরও পড়ুন
সদরঘাট: যেখানে প্রতিদিন গড়ে ওঠে হাজারো জীবিকার গল্প
চাকরির পাশাপাশি সাইক্লিং-ম্যারাথনে অনন্য সাফল্য মামুনের
কেএসকে
What's Your Reaction?