মুজতাহিদ ফারুকীর গুচ্ছ গুচ্ছ কবিতা

মেঘের বিকালে  মনে হলো বৃষ্টি হবে না, ছিপছিপ তবু এলো   ভিজে দেখি একশা হয়েছো এই নাও যট্টুকু পারো মুছে বোসো সরি, সরি, চেয়ারটা উল্টে টেবিলে রাতে কিছু বন্ধু এসেছিল, ঢালা শয্যা পড়েছিল ফ্লোরে ছিঃ ছিঃ কী সব বলছি স্টুপিড, বাদ দাও আঁচলটা ঝেড়ে নেবে, চুল? চেঞ্জের এ সময় সমঝে চলা ভালো, নিমোনিয়া  খতরনাক চিজ কী বলো, ব্যস্ত হবো না, তাই হয়! মেঘ মাথা করে রোজ ঝিলিমিলি রোদ আসে নাকি?  দেখা টেখা সেতো ক্লাসে অথবা ক্যাম্পাসে মেসে এই প্রথম এসেছো  হাসছো যে!  সামান্য দু কাপ পানি তুলেছি হিটারে টি ব্যাগ‌‌‌, লবঙ্গ চিনি, ব্যস  ভেবো না, নোট ফোট রেডি আছে, পাবে  সাথে দুটো খটখটে টোস্ট  চলবে না,  মেঘের বিকাল, ধোঁয়া চায়ে ভিজিয়ে টিজিয়ে!   আমার শহরে তুমি আছো   আমার শহরে তুমি আছো যে হাওয়ায় বুক ভরি, সেই বায়ু তুমিও নিচ্ছো টেনে  প্রতি নিঃশ্বাসে,  মধু ফাল্গুনে সে খবর এনেছে গন্ধবহ হাসনা হেনার ঘ্রাণে কোলাহল জেগেছে গার্ডেনে- তোমার আঁচল ছুঁয়ে বাতাসের ঢেউ  কানে কানে বলে যায়, যে মালা গেঁথেছো আনমনে,  আমি নয়, হয়তো তা পাবে আর কেউ-  তোমার গানের বাণী, কবিতার কান্নাভেজা সুর বেদনার চিনচিনে করুণ আবহ স্মৃতির জিয়ল মাছ অকালের হঠাৎ

মুজতাহিদ ফারুকীর গুচ্ছ গুচ্ছ কবিতা

মেঘের বিকালে 

মনে হলো বৃষ্টি হবে না, ছিপছিপ তবু এলো  
ভিজে দেখি একশা হয়েছো
এই নাও যট্টুকু পারো মুছে বোসো
সরি, সরি, চেয়ারটা উল্টে টেবিলে
রাতে কিছু বন্ধু এসেছিল, ঢালা শয্যা পড়েছিল ফ্লোরে
ছিঃ ছিঃ কী সব বলছি স্টুপিড, বাদ দাও
আঁচলটা ঝেড়ে নেবে, চুল?
চেঞ্জের এ সময় সমঝে চলা ভালো, নিমোনিয়া 
খতরনাক চিজ
কী বলো, ব্যস্ত হবো না, তাই হয়!
মেঘ মাথা করে রোজ ঝিলিমিলি রোদ আসে নাকি? 
দেখা টেখা সেতো ক্লাসে অথবা ক্যাম্পাসে
মেসে এই প্রথম এসেছো 
হাসছো যে! 
সামান্য দু কাপ পানি তুলেছি হিটারে
টি ব্যাগ‌‌‌, লবঙ্গ চিনি, ব্যস 
ভেবো না, নোট ফোট রেডি আছে, পাবে 
সাথে দুটো খটখটে টোস্ট 
চলবে না, 
মেঘের বিকাল, ধোঁয়া চায়ে ভিজিয়ে টিজিয়ে!

 

আমার শহরে তুমি আছো

 

আমার শহরে তুমি আছো
যে হাওয়ায় বুক ভরি, সেই বায়ু তুমিও নিচ্ছো টেনে 
প্রতি নিঃশ্বাসে, 
মধু ফাল্গুনে সে খবর এনেছে গন্ধবহ
হাসনা হেনার ঘ্রাণে কোলাহল জেগেছে গার্ডেনে-
তোমার আঁচল ছুঁয়ে বাতাসের ঢেউ 
কানে কানে বলে যায়, যে মালা গেঁথেছো আনমনে, 
আমি নয়, হয়তো তা পাবে আর কেউ- 
তোমার গানের বাণী, কবিতার কান্নাভেজা সুর
বেদনার চিনচিনে করুণ আবহ
স্মৃতির জিয়ল মাছ অকালের হঠাৎ বর্ষণে
খলবল করে শান্ত মনের অতলে
বুকের বোতাম খুলে দেখি, অন্ধকার গলির উজানে
কোনও খোলা জানালায় একা
একটি মোমের শিখা শিথিল বাতাসে 
কেঁপে হেসে তবু জ্বলে নীরবে মিটিমিটি
পুরাতন কুলুঙ্গির পাশে।

 

জাদু নয়

 

একটি পাখিকে কেটে চারভাগ করেন ধীমান 
ফেলে দেন পাহাড়ের চার ভিন্ন কোণে
আবার ওঠেন ডেকে, হে পাখি, আছে কি প্রাণ
এসো তবে, উড়ে যাও প্রসন্ন পবনে।
এ শুধু প্রভুর শান, মৃত জাগে পুত ছু’মন্তরে  
জীবন্ত পাখিটি উড়ে বসে তার দৃঢ় স্কন্ধ’পরে।

 

ম্যাজিক

 

সাদাকালো রঙ পাশাপাশি লেপে বললে 
দেখ, গুলিয়েছি আলো অন্ধকার!
আমি তো কলম্বাস নই, নিরেট কলমবাজ
সমুদ্র ঢুঁড়িনি, ভালোমন্দ এক গ্লাসে গুলতে পারি না।
সাদা পটে লিখলাম মিশকালো ‘সুখ’
কালো পটে বাঁকা ছাঁদে ধবধবে ‘দুখ’
বললাম, এটি ভোতা রিয়েলিটি, চোখের ম্যাজিক।
যদি এসো কোয়ান্টাম ধাঁধাঁর শহরে
অবিকল আমাকেই পাবে, হাবাগোবা, বিব্রত, ভীত
সময়ের উল্টা পরিসরে।
তুমি স্যাঁত করে নেই হয়ে গেলে, বিস্মিত হাত তুলে দেখি
ঢুকেছো বুকের ভেতরে।

 

করতালির আওয়াজ 

 

মুহুর্মুহু করতালি মানেই মহানন্দ, লড়াকু বুলবুলির নাচ
তুমি এভাবেই দেখে অভ্যস্ত 
আমি জানি হাততালির ভিন্ন কিছু অবস্তুক মানে
রাত্রি তৃতীয় প্রহরে গড়ালে পদার্থের অবিনাশিতাবাদ 
নিয়ে যখন হিমশিম 
তখন আব্বার কুঁড়েঘর থেকে তিনবার করতালি বাজে
তাহাজ্জুদ পড়া শেষে আম্মা তবে ঘুমাতে গেলেন,
তার আগে তুললেন অদৃশ্য দেয়াল;
যতোদূর তালির আওয়াজ ততদূরে থাকবে ইবলিশ।
সে আওয়াজ জাদুকাঠি, স্বস্তির অবিনাশী শাল
তা দেওয়া মুরগির বুকের নিচে আমি চুপ করে 
ওম খাই আর পদার্থের পৃষ্ঠা ওল্টাই 
হ্যারিকেনে ফের তেল ভরি, আরও কিছুক্ষণ 
আমাকে নিশ্চিত আলো পেতে হবে।

 

আচ্ছা আসি, বাই

 

মনে হয় ব্যস্ত খুব, চোখ তুলবারও
অবকাশ নেই; ও.কে, বেশ বেশ, থাকো
কাজ করো ব্যস্ত স্মার্টফোনে-
প্রশ্ন কোরো না বোকা খোকা
বৃষ্টিভেজা চোখের চিৎকার শুনতে না পেলে,
জেনে নেয়া যায় কি সওয়ালে! এ তো খুনোখুনি নয়।
আচ্ছা আসি, ভালো থেকো, বাই
ডোর লক চেপো মনে করে। 
সময় ভালো না সোনা, কখন কী হয়!
বাই।

 

দখিনা বাতাস 

 

কতদিন দেখি না খোলা নীল
নামেই জানালা শুধু, ওপাশে দেওয়াল 
তবু ভালো, কিছু হাওয়া আসে 
সুখ সুখ দখিনা বাতাস, রাতে হাস্নাহেনা খুব হাসে। 
বেশিক্ষণ থাকে না সে– 
চা-টা খেয়ে নীরবে হাত নাড়ে, টা টা।

এইসব ঘরদোর শান্ত করিডোর, চিলতে উঠোন ছেড়ে 
রোদ চলে গেছে
আজ নাকি খুব একা কাটাবে সময়– 
ধুমায়িত কাপ হাতে মেলাবে দিনের ক্ষয়
হবে তার রোমান্টিক বিরহ যাপন, কোনও দূর দ্বীপে 
চা জুড়িয়ে জল হতে হতে অচেনা নির্জনে-
যেখানে আকাশ দেখা যায়। 

রোদ নেই, দেওয়ালের আয়নাগুলো ছোঁয় না কিরণ
তবু দেখ বারান্দার টবে গাছ কতটা সবুজ!
সতেজ পাতার গায়ে মায়া ঢালে রোদের ঝিলিক।

 

সত্যের ব্যত্যয়ে 

 

সত্যবাদী স্বয়ং সত্যের গায়ে সংশয়ের দোপাট্টা মুড়িয়ে 
প্রাণঘাতী মারণাস্ত্রের  ওয়ারহেড বানালে
ফলশ্রুতি কী হয় তা জানে মহাভারত ঈশ্বর, 
শুধু জানে না 
সত্যের অন্তরাত্মা মৃত্যুভয়ে কাঁপতে কাঁপতে 
আজন্মের স্বপ্নসুখ স্বস্তিময় বাস্তু ছেড়ে নির্বাসনে যায়।

সম্মানিত নবীকে যখন খোদা শূল থেকে 
ঊর্ধ্বে তুলে নেন 
মিথ্যার বিস্ফোরণে বিশ্বজুড়ে পরমাণু শৈত্য নেমে আসে

যখন আকাশ ধোঁয়াচ্ছন্ন হলো 
তোমাকে জিজ্ঞাসা করি, সত্যটা কী? 
তুমি ম্লান মুখ ঘুরিয়ে অসত্যের ঘুঁটি ঠেলে সত্য লুকালে 
ঠিক তখন আমার দৃষ্টি থেকে মুছে গেল তোমার ছায়া  
এভাবেই নিভে যায় কারো কারো মানবীয় সত্ত্বার ছাপ
মনুষ্যত্ব গিলে খায় ডায়নোসরেরা। 
এই মুহূর্ত থেকে আমার কাছে বিতাড়িত ইবলিসের প্রচ্ছায়ার চেয়ে
তুমি আর কণামাত্র বেশি কিছু নও।
 


জোড়-বেজোড়বিষয়ক 

শালিক বলেছে তাকে, জোড়া মিলে গেলে হয় 
সুখের বসতি
তাই সে মেলায় জোড়া, জোড়া জোড়া গাঁথে ফুলগুলি
তবু তার কেন ভাঙে বুক, কেন চোখে সমুদ্র নিনাদ
জোড়া ভাঙে কোন অভিশাপে

কাপ ভেঙে পড়ে থাকে একাকী পিরিচ
বোঝে না সে
আয়োজন শেষ হলে সব কেন দাঁড়ায় বেজোড়!
বিরহ মধুর বলে কবি যত করেছে বন্দনা, 
সব মিছে সান্ত্বনার ফাঁদ, 
শিরির চোখের ভাষা, নিবেদন একটুও বোঝেনি ফরহাদ।

 

ঘর-গেরস্তালির গল্প 

 

হেঁটে হেঁটে যেখানে পৌঁছেছি সেখানে মহা সমুদ্রের 
স্রোত থেমে আছে। 
কেন ঘুরে দাঁড়িয়েছি এখনও জানি না, 
স্তিমিত চাঁদের আলোয় প্রেতিনীরা নাচে
পেত্নীর খোনা গানে এখানে আকাশ কাঁপে, মাটি ফেটে
বহমান গ্রাম ধসে যায়
ইতিহাস ভয়ে মুখ ঢাকে
এখানে কি শোনা যায় আবাসিক পাখির কাকলি?  
সে তো এক অবাক বিভ্রাট
দেখ, আমি যতটুকু উঁচু 
তার চেয়ে কী ভীষণ খর্বকায় পৃথিবীর ছাদ!
যেন দুষ্ট উট ঢুকে গেছে ক্লান্ত বেদুইনের তাবুতে 
যেন হাতি অকস্মাৎ দেহাতির শান্ত কুঁড়েঘরে।
পরিযায়ী পাখিরাও ফিরে গেছে যার যার সোনালী স্বদেশে।
দূর গাঁর জলের হার্মাদ লগি বৈঠা, রাম দা'র তুমুল ঝিলিকে
ঘোমটা খোলার আগে কেড়ে নিয়ে গেছে নববধূ
যূথবদ্ধ ধর্ষণে বিক্ষত আমার দুলহান ফিরে পেতে
আমি তো নাচার, খুব দ্রুত শিখে নিই আপোষের রাশি ও নামতা
পৈত্রিক ভিটামাটি ঠেক দিয়ে কিনে নিই দুঃস্বপ্ন-তাড়িত
কাঁচা ঘুম
বিফল বাসর রাত দোজখের তপ্ত ওমে ভাসে।
একটু একটু করে মুঠো ভরে যত রোদ গত গ্রীষ্মে জমিয়েছিলাম
সব খোয়া গেছে এই শীতে
বিড়ালটা আরামে শুয়েছে ইষদুষ্ণ উনুনের পাশে
পোষা ইঁদুরেরা বড়ো আনন্দে মেতেছে
গেরস্তের উন্মুক্ত ভাঁড়ারে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow