মুহাম্মাদ কাসেম নানুতবি
মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানুতবি রহ. (১৮৩৩-১৮৮০ খ্রি.) ছিলেন উপমহাদেশের ইসলামী চিন্তা ও শিক্ষা-আন্দোলনের এক অনন্য পুরোধা ব্যক্তিত্ব এবং দারুল উলুম দেওবন্দের প্রধান প্রতিষ্ঠাতা। উনিশ শতকের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রেক্ষাপটে তিনি মুসলিম সমাজকে পুনর্গঠনের যে ইলমভিত্তিক দিকনির্দেশনা দেন, তা পরবর্তীকালে একটি শক্তিশালী ধারায় রূপ নেয়, যা আজ দেওবন্দি আন্দোলন নামে পরিচিত। তিনি ১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দে (১২৪৮ হিজরি) ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলার নানুতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার ছিল দ্বিনদার ও ইলমপ্রীতিতে সমৃদ্ধ। পিতা শেখ আসাদ আলি ছিলেন পরহেজগার ব্যক্তি, যিনি ছেলেকে শৈশব থেকেই কোরআন ও প্রাথমিক ইসলামি শিক্ষায় মনোনিবেশ করান। অল্প বয়সেই তার মেধা ও গভীর চিন্তাশক্তির পরিচয় প্রকাশ পায়। উচ্চতর শিক্ষার জন্য তিনি দিল্লিতে গমন করেন, যা তখন ইসলামি জ্ঞানচর্চার অন্যতম কেন্দ্র ছিল। সেখানে তিনি মাওলানা মমলুক আলি নানুতবি রহ.-এর কাছে যুক্তিবিদ্যা, দর্শন ও উসুলে ফিকহ অধ্যয়ন করেন। হাদিস শাস্ত্রে তার প্রধান শিক্ষক ছিলেন শাহ আবদুল গনি মুজাদ্দিদি রহ., যিনি শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি রহ.-এর বং
মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানুতবি রহ. (১৮৩৩-১৮৮০ খ্রি.) ছিলেন উপমহাদেশের ইসলামী চিন্তা ও শিক্ষা-আন্দোলনের এক অনন্য পুরোধা ব্যক্তিত্ব এবং দারুল উলুম দেওবন্দের প্রধান প্রতিষ্ঠাতা। উনিশ শতকের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রেক্ষাপটে তিনি মুসলিম সমাজকে পুনর্গঠনের যে ইলমভিত্তিক দিকনির্দেশনা দেন, তা পরবর্তীকালে একটি শক্তিশালী ধারায় রূপ নেয়, যা আজ দেওবন্দি আন্দোলন নামে পরিচিত।
তিনি ১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দে (১২৪৮ হিজরি) ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলার নানুতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার ছিল দ্বিনদার ও ইলমপ্রীতিতে সমৃদ্ধ। পিতা শেখ আসাদ আলি ছিলেন পরহেজগার ব্যক্তি, যিনি ছেলেকে শৈশব থেকেই কোরআন ও প্রাথমিক ইসলামি শিক্ষায় মনোনিবেশ করান। অল্প বয়সেই তার মেধা ও গভীর চিন্তাশক্তির পরিচয় প্রকাশ পায়। উচ্চতর শিক্ষার জন্য তিনি দিল্লিতে গমন করেন, যা তখন ইসলামি জ্ঞানচর্চার অন্যতম কেন্দ্র ছিল। সেখানে তিনি মাওলানা মমলুক আলি নানুতবি রহ.-এর কাছে যুক্তিবিদ্যা, দর্শন ও উসুলে ফিকহ অধ্যয়ন করেন। হাদিস শাস্ত্রে তার প্রধান শিক্ষক ছিলেন শাহ আবদুল গনি মুজাদ্দিদি রহ., যিনি শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি রহ.-এর বংশধর। এসব শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে তিনি কোরআন, হাদিস, ফিকহ ও আকিদায় গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহে তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং হাজি ইমদাদুল্লাহ মুহাজির মাক্কি রহ.-এর নেতৃত্বে থানা ভবনের যুদ্ধে যুক্ত ছিলেন। ব্রিটিশদের কঠোর দমন-পীড়নের পর তিনি উপলব্ধি করেন যে মুসলমানদের পুনর্জাগরণের জন্য সামরিক প্রতিরোধের চেয়ে অধিক জরুরি হলো সুশিক্ষিত, ইমানদার ও চিন্তাশীল আলেম তৈরির উদ্যোগ। এ উপলব্ধির ফলস্বরূপ ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দে সাহারানপুর জেলার দেওবন্দে প্রতিষ্ঠিত হয় দারুল উলুম দেওবন্দ। একটি সাধারণ মসজিদের চত্বরে, সীমিত সম্পদ নিয়ে শুরু হওয়া এ প্রতিষ্ঠান দ্রুতই উপমহাদেশের ইসলামি শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। মাওলানা কাসেম নানুতবি রহ.-এর শিক্ষাদর্শনের মূলভিত্তি ছিল কোরআন ও সুন্নাহর প্রতি অঙ্গীকার, হানাফি ফিকহের অনুসরণ এবং তাসাউফ ও শরিয়তের সমন্বিত চর্চা। তিনি অন্ধ অনুকরণের বিরোধিতা করলেও প্রামাণ্য দলিল ও ইজতিহাদি পরিমিতিবোধকে গুরুত্ব দিতেন।
তিনি ছিলেন একজন প্রাঞ্জল বক্তা ও শক্তিশালী লেখক। তার রচনাবলির মধ্যে তাহযিরুন নাস, তাসফিয়াতুল আকাইদ এবং ইন্তিসারুল ইসলাম উল্লেখযোগ্য। এসব গ্রন্থে তিনি আকিদা, বিদআত ও সমসাময়িক ধর্মীয় বিতর্ক বিষয়ে যুক্তিনির্ভর আলোচনা করেন। খ্রিষ্টান মিশনারি ও অন্যান্য মতবাদের সঙ্গে বৌদ্ধিক মোকাবিলায়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, ইবাদতগুজার ও আত্মসংযমী। খ্যাতি ও নেতৃত্ব সত্ত্বেও তার জীবনযাপন ছিল সরল। তিনি ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে (১২৯৭ হিজরি) ইন্তেকাল করেন। তবে তার প্রতিষ্ঠিত দারুল উলুম দেওবন্দ এবং তার চিন্তাধারা আজও দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্বের বহু অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। মুসলিম সমাজের ইলমি পুনর্জাগরণে তার অবদান ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
What's Your Reaction?