মৃতপ্রায় নদীকে যেভাবে বাঁচিয়ে তুলছে চীন

তিব্বতের মালভূমি থেকে সাংহাই পর্যন্ত ছুটে চলা ৬ হাজার ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইয়াংসি নদীকে বলা হয় চীনের ‘মাদার রিভার’। একসময় এই নদীতে অবাধে ফেলা হতো মানুষের বর্জ্য ও কলকারখানার রাসায়নিক। লাখ লাখ টন মাছ তুলে নেওয়া হতো এর বুক থেকে। তৈরি করা হয়েছিল একের পর এক বিশাল বাঁধ। এর ফলে চিরতরে হারিয়ে গেছে নদীর কিছু অদ্ভুত ও সুন্দর প্রাণী। সাদা পেটের বেইজি ডলফিন আজ প্রায় বিলুপ্ত। তলোয়ারের মতো নাকের দানবীয় প্যাডেলফিশও আর নেই। তবে এ ক্ষতি পুরোপুরি অপরিবর্তনীয় নয়। এশিয়ার দীর্ঘতম এই নদীটি এখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছে এক অবিশ্বাস্য উপায়ে। প্রাণ ফিরছে নদীতে ২০২১ সাল থেকে শুরু হওয়া ব্যাপক সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা নদীর এই পুনরুজ্জীবনে সাহায্য করছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে চীন, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের গবেষকদের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সাত দশক ধরে পতনের পর নদীতে মাছের মোট ওজন বা বায়োমাস বেড়েছে ২০০ শতাংশের বেশি। আরও পড়ুন বন্যায় খামার থেকে পালিয়েছে ৯০০ সাপ, এলাকায় চরম আতঙ্ক এপ্রিল মাসে বিজ্ঞানীরা দুই দশকে প্রথমবারের মতো বন্য পরিবেশে এক বিরল স্টারজিয়ন মাছের প্রজনন দেখতে পেয়েছেন। জুলাই মাসে প্র

মৃতপ্রায় নদীকে যেভাবে বাঁচিয়ে তুলছে চীন

তিব্বতের মালভূমি থেকে সাংহাই পর্যন্ত ছুটে চলা ৬ হাজার ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইয়াংসি নদীকে বলা হয় চীনের ‘মাদার রিভার’। একসময় এই নদীতে অবাধে ফেলা হতো মানুষের বর্জ্য ও কলকারখানার রাসায়নিক। লাখ লাখ টন মাছ তুলে নেওয়া হতো এর বুক থেকে। তৈরি করা হয়েছিল একের পর এক বিশাল বাঁধ। এর ফলে চিরতরে হারিয়ে গেছে নদীর কিছু অদ্ভুত ও সুন্দর প্রাণী। সাদা পেটের বেইজি ডলফিন আজ প্রায় বিলুপ্ত। তলোয়ারের মতো নাকের দানবীয় প্যাডেলফিশও আর নেই। তবে এ ক্ষতি পুরোপুরি অপরিবর্তনীয় নয়। এশিয়ার দীর্ঘতম এই নদীটি এখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছে এক অবিশ্বাস্য উপায়ে।

প্রাণ ফিরছে নদীতে

২০২১ সাল থেকে শুরু হওয়া ব্যাপক সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা নদীর এই পুনরুজ্জীবনে সাহায্য করছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে চীন, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের গবেষকদের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সাত দশক ধরে পতনের পর নদীতে মাছের মোট ওজন বা বায়োমাস বেড়েছে ২০০ শতাংশের বেশি।

এপ্রিল মাসে বিজ্ঞানীরা দুই দশকে প্রথমবারের মতো বন্য পরিবেশে এক বিরল স্টারজিয়ন মাছের প্রজনন দেখতে পেয়েছেন। জুলাই মাসে প্রকাশিত অন্য এক গবেষণায় দেখা গেছে, নদীর অনেক বেশি মাছ এখন প্রজননক্ষম হয়ে উঠছে।

সরকারি হিসাব বলছে, নদী অববাহিকায় এখন অন্তত ১ হাজার ৪০০ ফিনল্যাস পোর্পোইস বা স্থানীয়দের বলা ‘নদী শূকর’ বাস করছে। ২০১৭ সালে এই সংখ্যা ছিল মাত্র এক হাজার।

কঠোর নজরদারি ও সবুজায়ন

ইয়াংসি নদী বাঁচানোর মূল চাবিকাঠি ছিল ১০ বছরের বাণিজ্যিক মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা। নদী, এর প্রধান শাখা এবং আশপাশের হ্রদগুলোতে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। কঠোরভাবে তা বাস্তবায়নে ব্যবহার করা হচ্ছে নদী টহল, ড্রোন ও নজরদারি ক্যামেরা।

একই সঙ্গে, পরিষ্কার করা হয়েছে ইয়াংসি নদীর পানি। নদীর তীরের হাজার হাজার রাসায়নিক কারখানা বন্ধ বা স্থানান্তরিত করা হয়েছে। ওপরের অংশে গাছ লাগিয়ে মাটি শক্ত করা হয়েছে, যাতে তা নদীতে না ধসে পড়ে। কৃত্রিম জলাভূমি ও সবুজায়নের মাধ্যমে শহরগুলোকে করা হয়েছে স্পঞ্জসদৃশ।

সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব

তবে এই পরিবেশগত সাফল্যের পেছনে সাধারণ মানুষের চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার জেলে কাজ হারিয়েছেন। যদিও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি, তাদের ক্ষতিপূরণ ও নতুন কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু বাস্তবের চিত্র ভিন্ন। জিনসিয়ান কাউন্টির জেলেরা বলছেন, মাত্র প্রতি পাঁচজনে একজন ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। জীবিকা হারিয়ে কাউকে কাউকে বড় শহরে দিনমজুরের কাজ খুঁজতে হয়েছে।

এক সাবেক নারী জেলে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, সরকার একাই সব সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সাধারণ মানুষের কথা শোনার কেউ নেই।

বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বাঁধ প্রকল্প

চীনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এখনো কিছু বড় ত্রুটি রয়ে গেছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ১৯৫০-এর দশক থেকেই বাঁধের প্রতি দেশটির বিশেষ ঝোঁক রয়েছে। ইয়াংসি নদীতে তৈরি হয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম থ্রি গর্জেসসহ ডজনখানেক বিশাল বাঁধ।

এই বাঁধগুলো মাছের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে প্রাণীসম্পদের ক্ষতি এখনো পুরোপুরি থামেনি। নতুন করে পোয়াং হ্রদের কাছে আরেকটি বিশাল বাঁধ নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পরিবেশবাদীদের আশঙ্কা, এটি নদীর পূর্ণ পুনরুজ্জীবনের পথে নতুন বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট
কেএএ/

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow