মৃত্যু থেকে মুমিনের শিক্ষা ও মৃত্যুপ্রস্তুতি

পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণী মরণশীল। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে’ (সুরা: আলে-ইমরান, আয়াত : ১৮৫)। প্রতিদিন মানুষের চোখের সামনে কত মানুষ মারা যাচ্ছে। তাদের মধ্যে যেমন আছে শিশু, কিশোর, যুবক ও বৃদ্ধ; তেমনি আছে নারী ও পুরুষ। কিন্তু মানুষ যেন নির্বিকার। অন্যের মৃত্যু তাকে ভাবায় না, কাঁদায় না, বিচলিত করে না। অথচ মৃত্যু মানুষকে দিয়ে যায় অনেক বার্তা। মৃত্যুতে রয়েছে মুমিনের জন্য বহুমুখী শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, উপদেশদাতা হিসেবে মৃত্যুই যথেষ্ট এবং অমুখাপেক্ষিতার জন্য বিশ্বাসই যথেষ্ট। (জামিউস সগির, হাদিস : ৬২২৭)। এ জন্য ইসলাম মৃত্যুকে স্মরণ করার নির্দেশ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা বেশি করে স্বাদ বিনাশকারী মৃত্যুকে স্মরণ করো। (তিরমিজি, হাদিস : ২৩০৭)। মৃত্যু আমাদের জীবনে কিছু শিক্ষা দিয়ে যায়, যেমন— মৃত্যু অপরিহার্য: প্রতিটি জীবের জন্য মৃত্যু অপরিহার্য। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘জীবমাত্রই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে।’ (সুরা : আলে-ইমরান, আয়াত : ১৮৫) নির্ধারিত সময়েই হবে: প্রত্যেক মানুষ আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সময়েই মৃত্যুবরণ করবে। এ সময় শুধু মহান আ

মৃত্যু থেকে মুমিনের শিক্ষা ও মৃত্যুপ্রস্তুতি

পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণী মরণশীল। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে’ (সুরা: আলে-ইমরান, আয়াত : ১৮৫)। প্রতিদিন মানুষের চোখের সামনে কত মানুষ মারা যাচ্ছে। তাদের মধ্যে যেমন আছে শিশু, কিশোর, যুবক ও বৃদ্ধ; তেমনি আছে নারী ও পুরুষ। কিন্তু মানুষ যেন নির্বিকার। অন্যের মৃত্যু তাকে ভাবায় না, কাঁদায় না, বিচলিত করে না। অথচ মৃত্যু মানুষকে দিয়ে যায় অনেক বার্তা। মৃত্যুতে রয়েছে মুমিনের জন্য বহুমুখী শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, উপদেশদাতা হিসেবে মৃত্যুই যথেষ্ট এবং অমুখাপেক্ষিতার জন্য বিশ্বাসই যথেষ্ট। (জামিউস সগির, হাদিস : ৬২২৭)। এ জন্য ইসলাম মৃত্যুকে স্মরণ করার নির্দেশ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা বেশি করে স্বাদ বিনাশকারী মৃত্যুকে স্মরণ করো। (তিরমিজি, হাদিস : ২৩০৭)।

মৃত্যু আমাদের জীবনে কিছু শিক্ষা দিয়ে যায়, যেমন—

মৃত্যু অপরিহার্য: প্রতিটি জীবের জন্য মৃত্যু অপরিহার্য। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘জীবমাত্রই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে।’ (সুরা : আলে-ইমরান, আয়াত : ১৮৫)

নির্ধারিত সময়েই হবে: প্রত্যেক মানুষ আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সময়েই মৃত্যুবরণ করবে। এ সময় শুধু মহান আল্লাহই জানেন। মৃত্যুর সময় বা জীবনকাল সম্পর্কে অবগত হওয়া মানুষের জন্য অসাধ্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতঃপর যখন তাদের সময় আসে, তখন তারা মুহূর্তকাল বিলম্ব বা ত্বরা করতে পারে না।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৬১)

পালানোর পথ নেই: মানুষ মৃত্যু থেকে পালিয়ে থাকতে চায়। মৃত্যু এড়াতে সম্ভাব্য সব চেষ্টাই করে। কিন্তু মৃত্যু থেকে পালানোর কোনো পথ নেই। ইরশাদ হয়েছে, ‘বলো, তোমরা যে মৃত্যু থেকে পলায়ন করো, সেই মৃত্যু তোমাদের সঙ্গে অবশ্যই সাক্ষাৎ করবে।’ (সুরা জুমা, আয়াত : ৮)

পার্থিব জীবন ক্ষণস্থায়ী: পরকালীন জীবনের তুলনায় পার্থিব জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত ও ক্ষণস্থায়ী। আর এই পার্থিব জীবন কে কত দিন লাভ করবে, সেটাও মানুষের অজানা। এমন বহু শিশু রয়েছে, যাদের ব্যাপারে আশা করা হয়েছিল, তারা বড় হয়ে দেশ ও জাতির নেতৃত্ব দেবে, অথচ তারা তাদের দুগ্ধকালও অতিক্রম করতে পারেনি। এ বিষয়ে সতর্ক করে আল্লাহ বলেন, ‘বরং তোমরা পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দিয়েছ, অথচ পরকাল উত্তম ও স্থায়ী।’ (সুরা: আ‘লা, আয়াত : ১৬-১৭)।

পার্থিব জীবন খেল-তামাশা: মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের সঙ্গে তুলনা করলে পার্থিব জীবন খেল-তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়। মৃত্যুই প্রমাণ করে পার্থিব জীবন কত তুচ্ছ। আল্লাহ বলেন, ‘এই পার্থিব জীবন অস্থায়ী উপভোগের বস্তু এবং আখিরাতই হচ্ছে চিরস্থায়ী আবাস।’ (সুরা মু‘মিন, আয়াত : ৩৯)

অপ্রস্তুত অবস্থায় মৃত্যু নয়: হাদিসের ভাষ্য অনুসারে পার্থিব জীবন পরকালের পাথেয় উপার্জনের ক্ষেত্র। তাই মুমিন পরকালীন জীবনের পাথেয় সংগ্রহের মাধ্যমে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করবে। আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করো এবং তোমরা মুসলমান না হয়ে কোনো অবস্থায় মৃত্যুবরণ কোরো না।’ (সুরা আলে-ইমরান, আয়াত : ১০২)

মৃত্যু বিপদও বটে : যারা ঈমান ও নেক আমলের মাধ্যমে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে না, মৃত্যু তাদের জন্য বিপদও বটে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সফরে থাকলে এবং তোমাদের মৃত্যুর বিপদ উপস্থিত হলে তোমাদের ছাড়া অন্য লোকদের মধ্য থেকে দুজন সাক্ষী মনোনীত করবে।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ১০৬)

মুমিনের প্রস্তুতি মৃত্যু পর্যন্ত: মুমিন জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর ইবাদতের মাধ্যমে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে থাকে। এ ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশ হলো, ‘তোমার মৃত্যু উপস্থিত হওয়া পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করো।’ (সুরা হিজর, আয়াত : ৯৯)

ঘুম মৃত্যুর অর্ধেক: মৃত্যু আল্লাহর রহস্যময় জগতের অন্তর্গত। মানুষ মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি। কিন্তু আল্লাহ পৃথিবীতে ঘুমকে মৃত্যুর নমুনা বানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তিনিই রাত্রিকালে তোমাদের মৃত্যু ঘটান এবং দিনে তোমরা যা করো, তা তিনি জানেন। অতঃপর দিনে তোমাদের তিনি পুনর্জাগরিত করেন, যাতে নির্ধারিত কাল পূর্ণ হয়। অতঃপর তার দিকেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। অনন্তর তোমরা যা করো, সে সম্পর্কে তোমাদেরকে তিনি অবহিত করবেন।’ (সুরা আনআম, আয়াত : ৬০)

মৃত্যু নতুন জীবনের সূচনা : মুমিনের জন্য মৃত্যু জীবনের সমাপ্তি নয়, বরং তা নতুন জীবনের সূচনা। মহানবী (সা.) বলেন, আখিরাতের ঘাঁটিগুলোর মধ্যে কবর হলো প্রথম ঘাঁটি। এখান থেকে কেউ মুক্তি পেলে তার জন্য পরবর্তী ঘাঁটিগুলোতে মুক্তি পাওয়া খুব সহজ হয়ে যাবে। আর সে এখান থেকে মুক্তি না পেলে তার জন্য পরবর্তী ঘাঁটিগুলো আরও বেশি কঠিন হবে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৩০৮)।

মুমিনের জন্য মৃত্যুর সবচেয়ে বড় বার্তা হলো পার্থিব জীবনের ওপর পরকালকে প্রাধান্য দেওয়া এবং নেক আমলের মাধ্যমে পরবর্তী জীবনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তিনটি জিনিস মৃত ব্যক্তির অনুসরণ করে (সঙ্গে যায়)। দাফনের পর দুটি ফিরে আসে আর একটি তার সঙ্গেই থেকে যায়। সে তিনটি হলো তার পরিবারবর্গ, তার সম্পদ ও তার আমল। দাফনের পর তার পরিবারবর্গ ও সম্পদ ফিরে আসে আর তার আমল তার সঙ্গেই থেকে যায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৫১৪)।

তবে ইসলাম মৃত্যু কামনাকে বৈধ মনে করে না। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন কিছুতেই মৃত্যু কামনা না করে এবং মৃত্যু আসার আগে তার জন্য দোয়াও না করে। কেননা যখন তোমাদের কেউ মারা যায়, তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়। আর মুমিনের দীর্ঘ জীবন শুধু তার জন্য কল্যাণই বয়ে আনে।’ (মুসলিম : হাদিস ৬৯৯৫)। মুমিন কখনো মৃত্যুকে ভয় করবে না বরং মৃত্যুকে স্মরণ করবে। ইসলাম মৃত্যুকে ভয় না করে মৃত্যুর স্মরণ ও পরবর্তী জীবনের পরিণতি চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করেছে এবং সেসব মানুষের নিন্দা করেছে যারা মনে করে মৃত্যুর পর আর কোনো জীবন নেই। নবীজি (সা.) বলেন, ‘তোমরা জীবনের স্বাদ ধ্বংসকারীকে (মৃত্যু) বেশি পরিমাণে স্মরণ করো’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩০৬)। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন, ‘মৃত্যু আসার আগেই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও।’ (মুস্তাদরিক আলাস সাহিহাইন : হাদিস : ৮৯৪৯)।

মুমিনের মৃত্যুর প্রস্তুতি: নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা পাঁচ জিনিসকে পাঁচ জিনিসের আগে গনিমত (সম্পদ) মনে করো-১. যৌবনকে বার্ধক্যের আগে। ২. সুস্থতাকে অসুস্থতার আগে। ৩. সচ্ছলতাকে অভাবের আগে। ৪. অবসরকে ব্যস্ততার আগে। ৫. জীবনকে মৃত্যুর আগে’ (মুস্তাদরিকে হাকিম: হাদিস ৭৮৪৬)। তাই একজন মুমিন কীভাবে মৃত্যুর প্রস্তুতি গ্রহণ করবে, তা আলোচনা করা হলো।

ভালো কাজ করা: মৃত্যুর প্রধান প্রস্তুতি হলো নিজেকে ভালো কাজে নিয়োজিত করা এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা। নবীজি (সা.) বলেন, ‘তোমরা নেক আমলের দিকে দ্রুত অগ্রসর হও ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতের অংশসদৃশ ফেতনায় পতিত হওয়ার আগেই।’ (মুসলিম : হাদিস ৩২৮)

পাপকাজ পরিহার: পাপ পরিহারের মাধ্যমে মুমিন মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব ধরনের পাপ নিষিদ্ধ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘বলুন! আমার প্রতিপালক নিষিদ্ধ করেছেন প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা আর পাপ।’ (সুরা আরাফ: আয়াত ৩৩)।

অতীত পাপের তওবা: মুমিন অতীত ভুলত্রুটি ও পাপের জন্য তওবা করার মাধ্যমে ক্ষমা প্রার্থনা করবে। পবিত্র কোরআনে মৃত্যুর আগে তওবা না করাকে ‘জুলুম’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘যারা তওবা করে না, তারা অবিচারকারী।’ (সুরা হুজরাত : আয়াত ১১)।

অসিয়ত করা: আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে মুসলিমের অসিয়তযোগ্য কিছু সম্পদ আছে, তার উচিত নয় সে দুই রাত কাটাবে অথচ তার কাছে তার অসিয়ত লিখিত থাকবে না।’ (বুখারি : হাদিস ২৭৩৮)।

সুন্দর মৃত্যুর জন্য দোয়া: রাসুলুল্লাহ (সা.) চাপা পড়ে, গর্তে পড়ে, পানিতে ডুবে, আগুনে পুড়ে ও বিষাক্ত প্রাণীর দংশনে মারা যাওয়া থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় কামনা করতেন এবং সবসময় ‘খাতেমা বিল খাইর’ অর্থাৎ জীবনের সুন্দর পরিসমাপ্তির দোয়া করতেন (আবু দাউদ : হাদিস ১৫৫২)। আল্লাহ সবাইকে মৃত্যুর পূর্বে প্রস্তুতি গ্রহণের তওফিক দান করুন।

লেখক: ইমাম ও খতিব

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow