যুক্তরাষ্ট্র কি এবার তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করতে চায়?
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদের গন্ধে ভারী। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সরাসরি সংঘাত চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। এক পক্ষ হামলা করছে, অন্য পক্ষ পাল্টা আঘাত হানছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ‘ভেঙে গেছে’ ঘোষণা করার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। এরপর থেকে টানা সাতদিন ধরে ইরানের ওপর হামলা চালাচ্ছে মার্কিন বাহিনী। জবাবে ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ছে। এই যুদ্ধ এখন আর কেবল ইরানেই সীমাবদ্ধ নেই। এতে আশপাশের বহু দেশ প্রভাবিত হয়েছে, যেমন- সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব, ওমান, কাতার, লেবানন, ফিলিস্তিন ইত্যাদি। রক্তক্ষয়ী এমন সংঘাতের বিস্তার দেখে অনেকেই এখন প্রশ্ন তুলছেন—যুক্তরাষ্ট্র কি এবার তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করতে চায়? আরও পড়ুন ইরানে তীব্র হচ্ছে হামলা, ময়দানে ৫০ হাজার মার্কিন সেনা আঞ্চলিক যুদ্ধ মহাযুদ্ধের পথে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতাসহ শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুর পর এই যুদ্ধ শুরু হয়। জুনে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও তা বেশিদিন টেকেনি। বর্তমানে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদের গন্ধে ভারী। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সরাসরি সংঘাত চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। এক পক্ষ হামলা করছে, অন্য পক্ষ পাল্টা আঘাত হানছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ‘ভেঙে গেছে’ ঘোষণা করার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। এরপর থেকে টানা সাতদিন ধরে ইরানের ওপর হামলা চালাচ্ছে মার্কিন বাহিনী। জবাবে ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ছে।
এই যুদ্ধ এখন আর কেবল ইরানেই সীমাবদ্ধ নেই। এতে আশপাশের বহু দেশ প্রভাবিত হয়েছে, যেমন- সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব, ওমান, কাতার, লেবানন, ফিলিস্তিন ইত্যাদি।
রক্তক্ষয়ী এমন সংঘাতের বিস্তার দেখে অনেকেই এখন প্রশ্ন তুলছেন—যুক্তরাষ্ট্র কি এবার তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করতে চায়?
আঞ্চলিক যুদ্ধ মহাযুদ্ধের পথে
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতাসহ শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুর পর এই যুদ্ধ শুরু হয়। জুনে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও তা বেশিদিন টেকেনি। বর্তমানে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানের অভ্যন্তরে অনবরত বোমাবর্ষণ করে যাচ্ছে।
অন্যদিকে ইরানও বাহরাইন, কাতার, কুয়েত এবং জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে।
এর মধ্যেই ইসরায়েল গাজা ও লেবাননে তাদের বর্বরোচিত সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে। ফলে ক্ষুব্ধ ইরান তার আঞ্চলিক প্রক্সি যেমন- লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুথিদের পুরো মাত্রায় সক্রিয় করার প্রস্ততি নিচ্ছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটি আর কেবল দুই দেশের সংঘাত নয়। এটি এখন এক বহুমাত্রিক আঞ্চলিক মহাযুদ্ধে রূপ নিয়েছে।
পরাশক্তিগুলোর চাল ও বিশ্বযুদ্ধের সমীকরণ
একাধিক দেশ এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ায় বৈশ্বিক যুদ্ধের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে একে এখনই সরাসরি ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ বলা যাবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। বিশ্বযুদ্ধ হতে হলে রাশিয়া এবং চীনের মতো পরাশক্তিগুলোকে ইরানের পক্ষে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে নামতে হবে।
মার্কিন যুদ্ধবিমান/ ফাইল ছবি: ইউএসএএফ
রাশিয়া ও চীন ইরানকে ড্রোনের যন্ত্রাংশ, কূটনৈতিক সমর্থন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা দিচ্ছে। কিন্তু তারা নিজেরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো পারমাণবিক বা সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়াতে চাইছে না। তাদের কৌশল হলো পরোক্ষভাবে মার্কিন শক্তিকে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যস্ত রাখা।
পরাশক্তিগুলোর এই সাবধানি অবস্থানের কারণে সংঘাতটি এখনই বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিচ্ছে না। তবে একটি ভুল পদক্ষেপ বা পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত পুরো হিসাব বদলে দিতে পারে।
সৌদি আরব ও পাকিস্তানের জড়ানোর ঝুঁকি
এই যুদ্ধের আরেকটি বিপজ্জনক মোড় হলো সৌদি আরব ও পাকিস্তানের জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা।
সম্প্রতি ইয়েমেনে সৌদি আরবের বিমান হামলায় ইরানের সঙ্গে টানাপড়েন আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এখন ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা যদি তেহরানের ইশারায় সৌদি আরবের তেলক্ষেত্র বা বেসামরিক স্থাপনায় বড় ধরনের হামলা চালায়, তবে রিয়াদ যুদ্ধে নামতে বাধ্য হবে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান/ ফাইল ছবি:সৌদি গ্যাজেট
আবার, সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের গভীর সামরিক চুক্তি রয়েছে। ইসলামাবাদ এরই মধ্যে জানিয়েছে, সৌদির পবিত্র ভূমি রক্ষায় তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
কিন্তু পাকিস্তানের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাদের সীমান্তে ইরান অবস্থিত এবং দেশের ভেতরে বড় শিয়া জনসংখ্যা রয়েছে। ফলে পাকিস্তান হয়তো সরাসরি ইরানের মূল ভূখণ্ডে আক্রমণ করবে না। তারা বড়জোর সৌদি আরবের আকাশসীমা রক্ষা এবং প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সহায়তা দেবে। কিন্তু তাতেও যুদ্ধের পরিধি অনেকটা বেড়ে যাবে।
বেসামরিক স্থাপনায় হামলার ঝুঁকি
যুক্তরাষ্ট্র এর আগে প্রধানত ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করলেও এখন বেসামরিক স্থাপনাতেও হামলা চালাচ্ছে। তাদের হামলায় ইরানের বিমানবন্দর, রেল স্টেশন এবং সেতুর মতো বেসামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এখন ইরান যদি মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্রদের (যেমন বাহরাইন, কাতার, কুয়েত বা জর্ডান) বেসামরিক স্থাপনাগুলোতে পাল্টা হামলা চালায়, তবে ওই দেশগুলো সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে চলে আসবে।
আবার, বেসামরিক স্থাপনায় ক্রমাগত হামলায় ইরান যদি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়, তবে তাদের কৌশলগত মিত্র চীন-রাশিয়া হয়তো আর নীরব দর্শক হয়ে থাকতে পারবে না। নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থেই তারা ইরানকে আরও অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অ্যান্টি-শিপ মিসাইল এবং গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সাহায্য বাড়াবে।
মার্কিন বাহিনীর ওপর ইরানি হামলায় রাশিয়ার প্রযুক্তির ব্যবহার প্রকাশ্য হলে, তা যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সরাসরি সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে মহা বিপর্যয়ের শঙ্কা
বিশ্বযুদ্ধ সরাসরি না হলেও বিশ্ববাসী এরই মধ্যে এর অর্থনৈতিক প্রভাব টের পাচ্ছে। ইরান হুংকার দিয়েছে, এ অঞ্চলে মার্কিন হামলা না থামলে পারস্য উপসাগর দিয়ে এক ফোঁটা তেল-গ্যাসও রপ্তানি হতে দেবে না। দেশটি এরই মধ্যে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ‘হরমুজ প্রণালি’র নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, যেখান দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়।
হরমুজ প্রণালিতে দাঁড়ানো ট্যাংকার/ ফাইল ছবি: আনাদোলু এজেন্সি
বিশ্বের বড় বড় উড়োজাহাজ সংস্থাগুলো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে তাদের ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করেছে। কাতার এনার্জি এবং কুয়েত পেট্রোলিয়াম তাদের তেল-গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের জটিলতার সম্মুখীন হচ্ছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা প্রতিটি দেশে তীব্র মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক ধস নামাতে পারে।
ভুল হিসাবের চরম মাশুল
বিশ্লেষকদের মতে, কেউ হয়তো ইচ্ছা করে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করবে না। কিন্তু চলমান হামলা-পাল্টা হামলার মাঝে যে কোনো একটি ‘ভুল হিসাব’ (Miscalculation) পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ক্ষেপণাস্ত্র যদি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত হানে, কিংবা ইরানের কোনো ড্রোন যদি মার্কিন কোনো বড় রণতরী ডুবিয়ে দেয়, তবে আর ফিরে আসার পথ থাকবে না।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ইতিহাসের ইমেরিটাস অধ্যাপক মার্গারেট ম্যাকমিলান বিবিসির ‘গ্লোবাল স্টোরি’ পডকাস্টে বলেন, মানুষ সাধারণত মনে করে যুদ্ধ খুব পরিকল্পনা করে শুরু করা হয়, আর যারা যুদ্ধে যায় তারা জানে তারা কী করতে যাচ্ছে। কিন্তু অতীতের যুদ্ধগুলো দেখলে বোঝা যায়… প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষেত্রেও… শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ শুরু হওয়ার পেছনে কারণ হিসেবে অনেকটাই ছিল দুর্ঘটনা আর প্রতিপক্ষের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি।
ম্যাকমিলান বলেন, ১৯১৪ সালে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সম্রাট ফ্রানৎস যোসেফের ভাতিজা আর্চডিউক ফ্রানৎস ফার্দিনান্দকে হত্যার ঘটনাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করে।
এরপর খুব দ্রুত জোটবদ্ধ দেশগুলো একে অপরের পক্ষে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। অস্ট্রিয়া ও হাঙ্গেরি একসঙ্গে সার্বিয়ার বিরুদ্ধে অভিযান চালায়, জার্মানি অস্ট্রিয়াকে সমর্থন দেয়, আর রাশিয়া সার্বিয়ার পক্ষে সেনা মোতায়েন করে, ফ্রান্স রাশিয়াকে সমর্থন করে, আর ব্রিটেন সম্মান ও কৌশলগত কারণে যুদ্ধে যোগ দেয়।
এরপর যা ঘটে, তা এক ভয়াবহ বৈশ্বিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাত কেবল ওই অঞ্চলের নয়, বরং পুরো বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য এক মহাবিপদ সংকেত। বিশ্ববাসী এখন গভীর উদ্বেগে তাকিয়ে আছে এই যুদ্ধের শেষ কোথায়, তা দেখার জন্য।
সূত্র: আল-জাজিরা, বিবিসি বাংলা, আটলান্টিক কাউন্সিল
কেএএ/
What's Your Reaction?





