যুদ্ধ-বাড়তি খরচ- কোনো কিছুই থামাতে পারেনি এশীয় মুসলিমদের হজযাত্রা
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, আকাশপথে অনিশ্চয়তা, বিমান ভাড়ার ঊর্ধ্বগতি ও ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি- সবকিছুর পরও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলিমরা এবারও হজ পালনের জন্য সৌদি আরবে ছুটেছেন। বিশেষ করে, এশিয়ার মুসলিমদের মধ্যে হজ নিয়ে আগ্রহ এতটাই প্রবল যে যুদ্ধের ঝুঁকিও তাদের সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেনি। মালয়েশিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় সেলাঙ্গর রাজ্যের ৫৭ বছর বয়সী জাহির জুনিদ তাদেরই একজন। তিনি বলেন, হজের মতো ‘জীবনে একবার পাওয়া সুযোগের’ জন্য মানুষকে ‘সারা জীবন প্রস্তুতি নিতে হয়’। দশকের পর দশক ধরে অর্থ সঞ্চয় করেছেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে দৌড়ানো ও পিকলবল খেলার মাধ্যমে শারীরিক সক্ষমতা বাড়িয়েছেন, পাশাপাশি মসজিদে বিভিন্ন আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে মানসিক প্রস্তুতিও নিয়েছেন। কয়েক মাস আগে অবশেষে হজের অনুমতি পাওয়ার পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন- কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারবে না, এমনকি যুদ্ধও নয়। যুদ্ধের মধ্যেও ১৭ লাখের বেশি হজযাত্রী সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে সৌদি আরবও রয়েছে। এর ফলে ওই অঞ্চলে ভ্রমণ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে জেট জ্বালানির দাম বেড়ে য
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, আকাশপথে অনিশ্চয়তা, বিমান ভাড়ার ঊর্ধ্বগতি ও ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি- সবকিছুর পরও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলিমরা এবারও হজ পালনের জন্য সৌদি আরবে ছুটেছেন। বিশেষ করে, এশিয়ার মুসলিমদের মধ্যে হজ নিয়ে আগ্রহ এতটাই প্রবল যে যুদ্ধের ঝুঁকিও তাদের সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেনি।
মালয়েশিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় সেলাঙ্গর রাজ্যের ৫৭ বছর বয়সী জাহির জুনিদ তাদেরই একজন। তিনি বলেন, হজের মতো ‘জীবনে একবার পাওয়া সুযোগের’ জন্য মানুষকে ‘সারা জীবন প্রস্তুতি নিতে হয়’।
দশকের পর দশক ধরে অর্থ সঞ্চয় করেছেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে দৌড়ানো ও পিকলবল খেলার মাধ্যমে শারীরিক সক্ষমতা বাড়িয়েছেন, পাশাপাশি মসজিদে বিভিন্ন আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে মানসিক প্রস্তুতিও নিয়েছেন। কয়েক মাস আগে অবশেষে হজের অনুমতি পাওয়ার পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন- কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারবে না, এমনকি যুদ্ধও নয়।
যুদ্ধের মধ্যেও ১৭ লাখের বেশি হজযাত্রী
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে সৌদি আরবও রয়েছে। এর ফলে ওই অঞ্চলে ভ্রমণ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে জেট জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় বিমান ভাড়াও বৃদ্ধি পেয়েছে।
তারপরও চলতি বছরের হজে প্রায় ১৭ লাখ মুসল্লি অংশ নেন, যাদের বড় অংশই যান এশিয়া থেকে।
২৫ মে থেকে শুরু হওয়া পাঁচ দিনের হজ আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে ছিল তাওয়াফ- মক্কার গ্র্যান্ড মসজিদের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত কাবা শরীফকে ঘিরে সাতবার ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে প্রদক্ষিণ করা। এছাড়া রয়েছে সাঈ, যেখানে হাজিরা দুই পাহাড়ের মধ্যে সাতবার হাঁটা বা দৌড়ান।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর আসে হজের সুযোগ
হজ ইসলামের পাঁচটি মৌলিক স্তম্ভের একটি। পবিত্র কোরআনে সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলমানকে জীবনে অন্তত একবার হজ পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে সৌদি আরব যে বার্ষিক হজ কোটা দেয়, তা প্রায় সবসময় পূর্ণ হয়ে যায়।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ৫৭ লাখ মানুষ হজের অপেক্ষমাণ তালিকায় ছিলেন। অথচ দেশটি বছরে মাত্র ২ লাখ ২০ হাজার হজ ভিসা পায়।
ফলে অনেককে ৪০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। আর দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সুযোগ এলে, জীবিত থাকলে সেটি প্রত্যাখ্যান করার সম্ভাবনা খুবই কম।
যুদ্ধের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ
খবরে বলা হয়েছে, সৌদি আরব নাকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো সামরিক হামলা বিলম্বিত করার অনুরোধ জানিয়েছে।
এ বছর কিছু হজযাত্রীকে বিকল্প রুট ব্যবহার করে সৌদি আরবে যেতে হয়। নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে ও আকাশপথ বন্ধ হয়ে গেলে অনেক হজযাত্রী সৌদি আরবে আটকা পড়তে পারেন- এমন উদ্বেগের কথাও উল্লেখ করা হয়।
তবে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কাছে বিষয়টি ভিন্নভাবে ধরা দেয়। বাংলাদেশের একটি ইসলামিক ট্যুর কোম্পানির পরিচালক হোসেন আহমেদ বলেন, অনেকেই বিশ্বাস করেন, হজের সময় মৃত্যু হলে আল্লাহ তাদের পুরস্কার হিসেবে জান্নাত দান করবেন।
মক্কায় নিরাপত্তা জোরদার, কিন্তু পরিবেশ ছিল স্বাভাবিক
মক্কায় অবস্থানরত এক ট্যুর গাইড জানান, শহরে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর উপস্থিতি আগের তুলনায় এবার বেশি দেখা যায়। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক।
তিনি বলেন, যুদ্ধ নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হচ্ছে না। সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক স্লোগান নিষিদ্ধ করেছে ও হজকে কেবল ইবাদতের জন্য নিবেদিত একটি আয়োজন হিসেবে তুলে ধরেছে।
চলতি বছর সৌদি আরব প্রায় ৩০ হাজার ইরানি হাজিকে স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুত ছিল।
বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও হজযাত্রী আবসার উদ্দিন বলেন, হজে এসে হাজার হাজার মানুষ একই ধরনের সাদা পোশাক পরে একসঙ্গে নামাজ পড়েন। কে ইরানি আর কে অন্য দেশের, তা বোঝাই কঠিন।
যুদ্ধের কারণে বাড়তি খরচ
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে এ বছর ভ্রমণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কিছু দেশ হজযাত্রীদের আর্থিক সহায়তা দেয়। ইন্দোনেশিয়া সরকার হজযাত্রীদের অতিরিক্ত খরচ মেটাতে রাষ্ট্রীয় বাজেট থেকে প্রায় ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন রুপিয়া বা প্রায় ১০ কোটি ডলার বরাদ্দ দেয় বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, ভারতে হজ ব্যবস্থাপনা করা সরকারি সংস্থা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে অতিরিক্ত ১০ হাজার রুপি (প্রায় ১০৫ ডলার) আদায় করেছে। যদিও ভারতীয় বিমান সংস্থাগুলোর দাবি করা বাড়তি অর্থের তুলনায় এটি কম ছিল, তবুও অনেক পরিবারের জন্য এই অর্থ বড় বোঝা।
হজ এখন কি ধনীদের জন্য?
যুদ্ধ শুরুর আগেই হজের খরচ দ্রুত বাড়ছিল। হোসেন আহমেদ জানান, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ থেকে একটি হজ প্যাকেজের মূল্য ছিল প্রায় ৩ লাখ টাকা। ২০২৬ সালে এসে সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ টাকায়। কিন্তু এই সময়ে অধিকাংশ মানুষের আয় দ্বিগুণ হয়নি।
করোনা মহামারির পর উড়োজাহাজের ভাড়া বেড়েছে, অনেক এশীয় দেশে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছে ও স্থানীয় মুদ্রার মান কমেছে। একই সঙ্গে সৌদি আরব মক্কার পুরোনো ও অপেক্ষাকৃত সস্তা আবাসন ভেঙে আধুনিক ও বিলাসবহুল হোটেল নির্মাণ করেছে।
হোসেন আহমেদের ভাষায়, হাজিরা এখন ভালো সুবিধা পান, কিন্তু হজ ধীরে ধীরে শুধু ধনীদের নাগালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।
মালয়েশিয়ার জাহির জুনিদও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বলেন। তার মতে, কয়েক বছর আগে যে মধ্যবিত্ত পরিবার সহজেই হজে যেতে পারত, এখন তাদের অনেকেই খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
বাংলাদেশে কোটা পূরণ হয়নি
বাড়তি খরচের কারণে বাংলাদেশ ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে একবারও পুরো হজ কোটা পূরণ করতে পারেনি, যদিও করোনা মহামারির আগে প্রায় প্রতি বছরই কোটা পূরণ হতো।
এ বছর বাংলাদেশ সরকার সৌদি আরবের সঙ্গে আলোচনা করে হজ কোটা ১ লাখ ২৭ হাজার থেকে কমিয়ে ৭৮ হাজার ৫০০ নির্ধারণ করে। ভবিষ্যতে ব্যয় কমানোর জন্য সরকার সমুদ্রপথে হজযাত্রী পাঠানোর সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে। ১৯৮০-এর দশকের পর বাংলাদেশ আর সমুদ্রপথে হজযাত্রী পাঠায়নি।
ওমরাহর দিকেও ঝুঁকছেন অনেকে
বাড়তি খরচের কারণে অনেক বাংলাদেশি এখন হজের পরিবর্তে ওমরাহ পালনের দিকে ঝুঁকছেন। সারা বছরই ওমরাহ করা যায় ও এটি তুলনামূলক সস্তা।
আগামী ১ জুন থেকে নতুন মৌসুমের ওমরাহ কার্যক্রম আবার শুরু হওয়ার কথা।
তবে ওমরাহও ধীরে ধীরে ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। সেখানেও ধনী ও সাধারণ মুসল্লিদের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হচ্ছে।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট
এসএএইচ
What's Your Reaction?