রং ফর্সা করতে ইনজেকশন? আগে জেনে নিন ঝুঁকি

উজ্জ্বল ও দাগহীন ত্বকের আকাঙ্ক্ষা নতুন নয়। তবে সোশ্যাল মিডিয়ার আগে-পরের ছবি, বিউটি ক্লিনিকের লোভনীয় অফার আর সেলিব্রিটিদের নিখুঁত ত্বক-সব মিলিয়ে ‘রং ফর্সাকারী ইনজেকশন’ এখন অনেকের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ করে গ্লুটাথায়ন ইনজেকশনকে ঘিরে নানা দাবি শোনা যায়। কেউ বলেন, কয়েক সপ্তাহেই ত্বক হবে একাধিক শেড ফর্সা। আবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তাহলে সত্যটা আসলে কী? আরও পড়ুন ওজন বাড়লো, ঝরে গেল চুল তবু হার মানেননি হেনা রং ফর্সাকারী ইনজেকশন আসলে কী? বর্তমানে ত্বক ফর্সা করার নামে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় গ্লুটাথায়ন ইনজেকশন। গ্লুটাথায়ন শরীরে স্বাভাবিকভাবে উৎপন্ন একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে কিছু নির্দিষ্ট রোগের ক্ষেত্রে গ্লুটাথায়নের ব্যবহার থাকলেও শুধু ত্বক ফর্সা করার জন্য শিরায় গ্লুটাথায়ন দেওয়া কোনো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত চিকিৎসা নয়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) বা ইউরোপের বড় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোও এই উদ্দেশ্যে গ্লুটাথায়ন ইনজেকশনের অনুম

রং ফর্সা করতে ইনজেকশন? আগে জেনে নিন ঝুঁকি

উজ্জ্বল ও দাগহীন ত্বকের আকাঙ্ক্ষা নতুন নয়। তবে সোশ্যাল মিডিয়ার আগে-পরের ছবি, বিউটি ক্লিনিকের লোভনীয় অফার আর সেলিব্রিটিদের নিখুঁত ত্বক-সব মিলিয়ে ‘রং ফর্সাকারী ইনজেকশন’ এখন অনেকের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু।

বিশেষ করে গ্লুটাথায়ন ইনজেকশনকে ঘিরে নানা দাবি শোনা যায়। কেউ বলেন, কয়েক সপ্তাহেই ত্বক হবে একাধিক শেড ফর্সা। আবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তাহলে সত্যটা আসলে কী?

রং ফর্সাকারী ইনজেকশন আসলে কী?

বর্তমানে ত্বক ফর্সা করার নামে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় গ্লুটাথায়ন ইনজেকশন। গ্লুটাথায়ন শরীরে স্বাভাবিকভাবে উৎপন্ন একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে রক্ষা করে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে কিছু নির্দিষ্ট রোগের ক্ষেত্রে গ্লুটাথায়নের ব্যবহার থাকলেও শুধু ত্বক ফর্সা করার জন্য শিরায় গ্লুটাথায়ন দেওয়া কোনো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত চিকিৎসা নয়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) বা ইউরোপের বড় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোও এই উদ্দেশ্যে গ্লুটাথায়ন ইনজেকশনের অনুমোদন দেয়নি।

প্রতীকী ছবি, এআই

কীভাবে ত্বকের রঙে প্রভাব ফেলতে পারে?

গবেষণায় দেখা গেছে, গ্লুটাথায়ন ত্বকের রঙ নির্ধারণকারী মেলানিন তৈরির প্রক্রিয়ায় কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে। এটি টাইরোসিনেজ এনজাইমের কার্যকারিতা কমিয়ে গাঢ় রঙের ইউমেলানিন উৎপাদন কমাতে এবং অপেক্ষাকৃত হালকা ফিওমেলানিন উৎপাদনে সহায়তা করতে পারে। তবে এই পরিবর্তন কতটা দৃশ্যমান হবে, কতদিন স্থায়ী থাকবে কিংবা সবার ক্ষেত্রে একইভাবে কাজ করবে-এ নিয়ে এখনো নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত নেই।

গবেষণা যা বলছে

২০১৬ সালে সাউথ আফ্রিকান মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত এক পর্যালোচনা গবেষণায় বলা হয়, ত্বক ফর্সা করার জন্য শিরায় গ্লুটাথায়ন ব্যবহারের কার্যকারিতা ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।

অন্যদিকে ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ ডার্মাটোলজি, ভেনেরিওলজি অ্যান্ড লেপ্রোলজি-এ প্রকাশিত একটি রিভিউতে গবেষকরা উল্লেখ করেন, গ্লুটাথায়ন নিয়ে প্রচুর বাণিজ্যিক প্রচারণা থাকলেও অধিকাংশ গবেষণা ছোট পরিসরের এবং স্বল্পমেয়াদি। তাই এটিকে নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা হিসেবে ঘোষণা করার মতো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

বিশেষজ্ঞরা কেন সতর্ক করছেন?

ভারতের প্রখ্যাত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রশ্মি সরকার, যিনি গ্লুটাথায়ন নিয়ে প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ রিভিউ গবেষণার অন্যতম লেখক তিনি বলেন, ‌ত্বক ফর্সা করার জন্য গ্লুটাথায়নের ব্যবহার নিয়ে মানুষের আগ্রহ অনেক বেড়েছে। কিন্তু বর্তমানে এর কার্যকারিতা ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সম্পর্কে পর্যাপ্ত উচ্চমানের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

ত্বক ফর্সা করার জন্য গ্লুটাথায়নের ব্যবহার নিয়ে মানুষের আগ্রহ অনেক বেড়েছে। কিন্তু বর্তমানে এর কার্যকারিতা ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সম্পর্কে পর্যাপ্ত উচ্চমানের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল লীগ অব ডার্মাটোলজিক্যাল সোসাইটিজ। সংস্থাটি জানায়, শুধুমাত্র সৌন্দর্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে গ্লুটাথায়ন ইনজেকশন ব্যবহার করার আগে ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।

রং ফর্সাকারী ইনজেকশনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী কী?

অনেকেই মনে করেন, গ্লুটাথায়ন শরীরে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয় বলে এটি শতভাগ নিরাপদ। বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন। সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে-

  • অ্যালার্জি
  • ত্বকে র‍্যাশ
  • মাথাব্যথা
  • বমি বমি ভাব
  • ইনজেকশনের স্থানে ব্যথা বা সংক্রমণ
  • জ্বর ও কাঁপুনি
  • শ্বাসকষ্ট
  • বিরল ক্ষেত্রে তীব্র অ্যালার্জিক শক

মার্কিন এফডিএ এক সতর্কবার্তায় জানায়, দূষিত গ্লুটাথায়ন ইনজেকশন ব্যবহারের পর একাধিক রোগীর গুরুতর অসুস্থতা দেখা দিয়েছিল। তদন্তে ইনজেকশনে ব্যাকটেরিয়াল এন্ডোটক্সিনের উপস্থিতি শনাক্ত হয়।

অননুমোদিত বিউটি ক্লিনিকে ঝুঁকি আরও বেশি

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ওষুধ নয়; কে, কোথায় এবং কীভাবে ইনজেকশন দিচ্ছেন, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অননুমোদিত ক্লিনিক বা অপ্রশিক্ষিত ব্যক্তির মাধ্যমে ইনজেকশন নিলে সংক্রমণ, ভুল ডোজ, দূষিত ওষুধ ব্যবহার কিংবা গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

কারা এই ইনজেকশন এড়িয়ে চলবেন?

  • গর্ভবতী নারী
  • স্তন্যদানকারী মা
  • কিডনি বা লিভারের রোগী
  • যাদের তীব্র অ্যালার্জির ইতিহাস রয়েছে
  • দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি

ত্বক উজ্জ্বল করার নিরাপদ উপায় কী?

চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যকর ত্বকের জন্য শর্টকাটের চেয়ে নিয়মিত পরিচর্যাই বেশি কার্যকর। নিরাপদ উপায়গুলো হলো-

  • প্রতিদিন এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি সানস্ক্রিন ব্যবহার
  • ভিটামিনসমৃদ্ধ সুষম খাদ্য গ্রহণ
  • পর্যাপ্ত পানি পান
  • ধূমপান থেকে বিরত থাকা
  • পর্যাপ্ত ঘুম
  • ব্রণ, মেছতা বা পিগমেন্টেশনের ক্ষেত্রে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত চিকিৎসা গ্রহণ

ত্বকের স্বাভাবিক রঙ আমাদের জিনগত বৈশিষ্ট্যের অংশ। তাই কয়েকটি ইনজেকশন নিয়ে স্থায়ীভাবে ফর্সা হয়ে যাওয়ার দাবি বাস্তবসম্মত নয়। বর্তমান বৈজ্ঞানিক তথ্য বলছে, রং ফর্সাকারী গ্লুটাথায়ন ইনজেকশনের কার্যকারিতা ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা এখনো নিশ্চিত নয়। তাই বিজ্ঞাপনের চটকদার প্রতিশ্রুতির বদলে চিকিৎসকের পরামর্শ এবং প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসাকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

তথ্যসূত্র: এফডিএ, ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ ডার্মাটোলজি, ভেনেরিওলজি অ্যান্ড লেপ্রোলজি, ইন্টারন্যাশনাল লীগ অব ডার্মাটোলজিক্যাল সোসাইটিজ, ভারতের প্রখ্যাত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রশ্মি সরকার

জেএস/

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow