রংপুরে ৫ বছরে কৃষি জমি কমেছে দেড় হাজার হেক্টর

2 days ago 6

শিল্পায়ন, নগরায়ন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধিসহ নানা কারণে রংপুরে দিনদিন কমছে কৃষিজমির পরিমাণ। গত পাঁচ বছরে অকৃষি খাতে যুক্ত হয়েছে অন্তত দেড় হাজার হেক্টর জমি। এরমধ্যে তিন ও চার ফসলি জমিও রয়েছে।

একসময় রংপুরের উদ্বৃত্ত ফসল দিয়ে দেশের অন্যান্য জেলার চাহিদা মেটানো হত। বর্তমানে যে ফসল উৎপাদন হয় সেটি দিয়ে জেলার ৩২ লাখ মানুষের চাহিদা মিটলেও প্রতিবছর আবাদি জমির পরিমাণ কমছে। অকৃষি খাতে চলে যাওয়া জমিতে গড়ে উঠছে আবাসন, শিল্প কলকারখানা, বিভিন্ন নামিদামি প্রতিষ্ঠান।

রংপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, পাঁচ বছর আগে জেলায় আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৯১ হাজার ১০০ হেক্টর। বর্তমান জমির পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৫১৪ হেক্টরে। পুরোপুরি পতিত না থাকলেও সাময়িক পতিত জমির পরিমাণ ২৮০ হেক্টর।

জেলার মোট আয়তন ২ লাখ ৪০ হাজার ৬০ হেক্টর। ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যা ৩১ লাখ ৬৯ হাজার ৬১৫ জন। ৫ বছর আগে জেলার জনসংখ্যা ছিল ৩০ লাখ ৭২ হাজার ১০৬ জন।

কৃষি বিভাগ বলছে, জেলায় মোট কৃষকের পাঁচ ভাগের এক ভাগ ভূমিহীন। জেলায় সামর্থ্যবান বা বিত্তশালী কৃষকের সংখ্যা নগণ্য। জেলায় মাত্র ছয় হাজার বিত্তবান (বড়) কৃষক রয়েছেন।

জনসংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি কৃষিজমি কমলেও খাদ্যশস্যের বহুমুখী উৎপাদন বেড়েছে। তবে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে কৃষি নির্ভর অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রংপুর সিটি করপোরেশনের ১৩ নং ওয়ার্ডের কৃষক মমিনুল ইসলাম বলেন, ১৫-২০ বছর আগেও এ এলাকায় কৃষিজমির পরিমাণ ছিল চোখে পড়ার মতো। সেই সময় দিগন্তজোড়া কৃষিজমি চোখে পড়ত। এখন সে অবস্থা নেই। রাস্তাঘাট, আবাসন, বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে প্রতিনিয়ত।

মিঠাপুকুর উপজেলার কাফ্রিখাল ইউনিয়নের বাসিন্দা বাবলুর রহমান বলেন, আগে মহাসড়কের দুদিকে শুধু কৃষিজমি দেখা যেত। জমি অধিগ্রহণ করে রাস্তা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এছাড়া সড়কের পাশে গড়ে উঠেছে সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ছোট ছোট শিল্প প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি। এরমধ্যে তিন-চার ফসলি জমিও রয়েছে।

যে হারে কৃষিজমিতে একের পর এক স্থাপনা গড়ে উঠছে তাতে আগামীতে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে এ অঞ্চলের কৃষি নির্ভর অর্থনীতি।

রংপুরের বসতভিটা ও আবাদি জমি রক্ষা সংগ্রাম কমিটির উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ জাগো নিউজকে বলেন, শিল্পায়ন ও নগরায়নের নামে যে হারে কৃষিজমি ধ্বংস হচ্ছে সেটি আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য অশনিসংকেত। রংপুর অঞ্চল কৃষি নির্ভর। এখানকার কৃষকের জীবনে প্রতি মুহূর্তে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা থাকলেও তারা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে দিন-রাত পরিশ্রম করে। অথচ কৃষিজমি নষ্ট করে একের পর এক স্থাপনা গড়ে উঠছে। এতে করে অচিরে রংপুর অঞ্চলে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। ব্যাহত হবে কৃষকদের জীবনযাত্রা। আবাসন ও শিল্পায়নের ক্ষেত্রে কী ধরনের ভূমি ব্যবহার করা দরকার সে বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এখন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দাবি, কৃষিজমি কমলেও উৎপাদনে ঘাটতি সৃষ্টি হয়নি। বরং মানুষ বেঁচে থাকার তাগিদে প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদে উৎপাদন বাড়িয়ে আবাদি জমির ঘাটতি পূরণ করতে পারছে। এক্ষেত্রে কৃষি বিভাগ উচ্চফলনশীল এবং স্বল্পকালীন ফসল আবাদে গুরুত্ব দেওয়ায় কৃষিজমি কমা সত্ত্বেও জেলায় উৎপাদন বৃদ্ধি অব্যাহত আছে।

রংপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক সিরাজুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘রংপুরে একেবারেই পতিত জমি নেই। বছরের কোনো না কোনো সময়ে আবাদ হয়।

আধুনিক চাষাবাদ সম্পর্কে কৃষকদের দক্ষতা বৃদ্ধিসহ নানা কারণে রংপুরে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে না, বরং উদ্বৃত্ত থাকছে। তবে অবশ্যই ফসলি জমি যাতে অকৃষি খাতে ব্যবহার না হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। সেজন্য উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কৃষকদের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে আমরা সার্বক্ষণিক কাজ করছি। গ্রুপ ভিত্তিক কৃষকসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করা হয়।

কৃষির জমির ঘাটতি পূরণে করণীয় প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। তাই শস্য উৎপাদনে রংপুরের কৃষিজমি রক্ষায় অগ্রাধিকার দিতে হবে। একসময় কৃষিজমি পড়ে ছিল। এখন কিন্তু তা হচ্ছে না। বরং একই জমিতে দুই থেকে তিনবার করে চাষাবাদ হচ্ছে। আমাদের অল্প জমিতে বেশি ফলন ও উৎপাদনের ধারাবাহিকতা প্রযুক্তি নির্ভর চাষাবাদ করতে হবে। তবেই কৃষিজমির ঘাটতি মোকাবিলা সম্ভব।

আরএইচ/এমএস

Read Entire Article