রমজান সহমর্মিতার মাস
আহমাদ সাব্বির রমজান শুধু সিয়াম সাধনার মাস নয়; এটি হৃদয়ের পরিশুদ্ধি, মানবিকতার বিকাশ এবং সহমর্মিতার উজ্জ্বল অনুশীলনের এক মহিমান্বিত মাস। হজরত সালমান ফারসির (রা.) সূত্রে বর্ণিত হাদিসে রমজানকে ‘সহমর্মিতার মাস’ বলা হয়েছে। এই সংজ্ঞাটি রমজানের আত্মাকে অত্যন্ত গভীরভাবে ধারণ করে। কারণ রোজা মানুষকে ক্ষুধা ও তৃষ্ণার অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অন্যের কষ্ট অনুধাবন করতে শেখায়। যে ব্যক্তি নিজের ক্ষুধা দমিয়ে রাখে, সে স্বভাবতই ক্ষুধার্তের আর্তনাদ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। তাই রমজান কেবল ইবাদতের আনুষ্ঠানিক সময় নয়; এটি অনুভবের, উপলব্ধির এবং মানবিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য বিদ্যালয়। সহমর্মিতা মানে শুধু দান করা নয়; বরং অন্যের অবস্থান উপলব্ধি করে তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। ইসলামের ভাষায় একে বলা হয় ‘ইসার’—নিজের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অন্যকে প্রাধান্য দেওয়া। কোরআনে আনসারদের প্রশংসা করে বলা হয়েছে, তারা নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রাধিকার দিতেন, যদিও তারা নিজেরাই অভাবগ্রস্ত ছিলেন। রমজান এই ইসারের চেতনা জাগ্রত করার শ্রেষ্ঠ সময়। যে ব্যক্তি ইসারের উচ্চতম স্তরে পৌঁছাতে না পারে, তার অন্তত সহমর্মিতার স্তরে পৌঁছানো সম্ভব। অর্থাৎ, অন্তরের কঠোরত
আহমাদ সাব্বির
রমজান শুধু সিয়াম সাধনার মাস নয়; এটি হৃদয়ের পরিশুদ্ধি, মানবিকতার বিকাশ এবং সহমর্মিতার উজ্জ্বল অনুশীলনের এক মহিমান্বিত মাস। হজরত সালমান ফারসির (রা.) সূত্রে বর্ণিত হাদিসে রমজানকে ‘সহমর্মিতার মাস’ বলা হয়েছে। এই সংজ্ঞাটি রমজানের আত্মাকে অত্যন্ত গভীরভাবে ধারণ করে। কারণ রোজা মানুষকে ক্ষুধা ও তৃষ্ণার অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অন্যের কষ্ট অনুধাবন করতে শেখায়। যে ব্যক্তি নিজের ক্ষুধা দমিয়ে রাখে, সে স্বভাবতই ক্ষুধার্তের আর্তনাদ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। তাই রমজান কেবল ইবাদতের আনুষ্ঠানিক সময় নয়; এটি অনুভবের, উপলব্ধির এবং মানবিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য বিদ্যালয়।
সহমর্মিতা মানে শুধু দান করা নয়; বরং অন্যের অবস্থান উপলব্ধি করে তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। ইসলামের ভাষায় একে বলা হয় ‘ইসার’—নিজের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অন্যকে প্রাধান্য দেওয়া। কোরআনে আনসারদের প্রশংসা করে বলা হয়েছে, তারা নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রাধিকার দিতেন, যদিও তারা নিজেরাই অভাবগ্রস্ত ছিলেন। রমজান এই ইসারের চেতনা জাগ্রত করার শ্রেষ্ঠ সময়। যে ব্যক্তি ইসারের উচ্চতম স্তরে পৌঁছাতে না পারে, তার অন্তত সহমর্মিতার স্তরে পৌঁছানো সম্ভব। অর্থাৎ, অন্তরের কঠোরতা ভেঙে কোমলতা সৃষ্টি করাই রমজানের অন্যতম লক্ষ্য।
আমাদের সালাফে সালেহিনের জীবনে এই সহমর্মিতা ছিল বাস্তব ও জীবন্ত। তাদের ইফতার ছিল দান ও ভাগাভাগির অনন্য উদাহরণ। উদাহরণস্বরূপ, ইবনে ওমর (রা.) রোজা রাখার পর কোনো মিসকিন ছাড়া ইফতার করতেন না। তিনি মনে করতেন, একা ইফতার করার মধ্যে পূর্ণতা নেই; বরং দরিদ্রের সঙ্গে ভাগাভাগি করাই প্রকৃত তৃপ্তি। যদি পরিবারের কেউ তাকে বাধা দিত, তাহলে তিনি সেদিন আর খাদ্য গ্রহণ করতেন না। এমনকি ইফতারের মুহূর্তে কোনো যাচক এলে নিজের খাদ্য দিয়ে দিতেন এবং নিজে অনাহারে রাত কাটাতেন। এটি কেবল উদারতা ছিল না; এটি ছিল আত্মার প্রশিক্ষণ—নিজেকে সংযত রেখে অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মহৎ অনুশীলন।
একজন রোজাদার সালাফের ঘটনা বিশেষভাবে হৃদয়স্পর্শী। তিনি সারাদিনের ক্ষুধার পর ইফতারের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। খাবার সামনে আসতেই শুনলেন, এক ভিক্ষুক আহ্বান করছে—‘কে আছে, যে ধনী সত্তাকে ঋণ দেবে?’ এই আহ্বান ছিল আল্লাহর পথে দান করার প্রতি ইঙ্গিত। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘এই নেকিশূন্য বান্দা প্রস্তুত!’ তারপর নিজের ইফতারের খাবার ভিক্ষুককে দিয়ে নিজে অনাহারে রাতযাপন করলেন। এই ঘটনা আমাদের শেখায়, দান শুধু উদ্বৃত্ত থেকে নয়; বরং কখনো কখনো প্রয়োজন থেকেও দিতে হয়। তখনই তা আত্মার উন্নতিতে প্রকৃত ভূমিকা রাখে।
একবার ইমাম আহমাদের (রহ.) কাছে এক ভিক্ষুক এলো। সেদিন ইফতারের জন্য তার কাছে মাত্র দুটি রুটি ছিল। তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে দুটিই দান করে দিলেন এবং নিজে অনাহারে রাত কাটালেন। পরদিন আবার রোজা শুরু করলেন। এ ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইবাদতের সৌন্দর্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা মানবসেবার সঙ্গে যুক্ত হয়। রোজা যদি কেবল ব্যক্তিগত সাধনা হয়, তবে তা একমাত্রিক হয়ে পড়ে; কিন্তু রোজা যখন অন্যের কল্যাণে নিবেদিত হয়, তখন তা বহুমাত্রিক ও পরিপূর্ণ হয়।
হাসান বসরি (রহ.) নফল রোজা রেখে নিজে না খেয়ে ভাই-বন্ধুদের আহার করাতেন। শুধু তাই নয়, তিনি পাশে বসে তাদের বাতাস করতেন, যেন তারা স্বাচ্ছন্দ্যে আহার করতে পারেন। এতে বোঝা যায়, তার কাছে সেবাই ছিল ইবাদত। অপরদিকে ইবনে মুবারক (রহ.) সফরে সঙ্গীদের নানা প্রকার সুস্বাদু খাবার খাওয়াতেন, অথচ নিজে রোজা রাখতেন। এই আত্মত্যাগ ও উদারতার দৃষ্টান্ত আজও মুসলিম সমাজের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ।
এসব ঘটনা কেবল অতীতের স্মৃতি নয়; এগুলো আমাদের জন্য নৈতিক মানদণ্ড। তাদের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করলে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তারা নিজেদের ওপর অন্যকে প্রাধান্য দিতেন, আর আমরা অনেক সময় নিজের ন্যায্য দায়িত্ব পালন করতেও কুণ্ঠাবোধ করি। আমরা যদি তাদের মতো হতে না-ও পারি, অন্তত তাদের পথ অনুসরণের চেষ্টা করতে পারি।
রমজানে দান-সদকার ফজিলত বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। এ মাসে প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। তাই এ সময় উদারতা প্রদর্শন বিশেষভাবে প্রশংসনীয়। ইমাম শাফেঈ (রহ.) বলেছেন, রমজানে অধিক বদান্যতা প্রদর্শন মুস্তাহাব। কারণ এতে রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অনুসরণ করা হয়। হাদিসে বর্ণিত আছে, নবীজির দানশীলতা ছিল প্রবাহমান বাতাসের মতো; আর রমজানে তা আরও বৃদ্ধি পেত। ইমাম শাফেঈ (রহ.) আরও বলেন, এ সময় মানুষের প্রয়োজনও বেশি থাকে। অধিক ইবাদতের কারণে অনেকের রোজগারে ভাটা পড়ে, ফলে দরিদ্রদের কষ্ট বৃদ্ধি পায়। তাই রমজান হলো সমাজের আর্থসামাজিক ভারসাম্য রক্ষার এক সুবর্ণ সুযোগ।
এ বিষয়ে কাজি ইয়াজ (রহ.) এবং আবু ইয়ালা (রহ.)-সহ বহু মনীষী একমত হয়েছেন। তারা বলেছেন, রমজানে দান করা শুধু ব্যক্তিগত সওয়াবের বিষয় নয়; এটি সামাজিক কল্যাণেরও এক কার্যকর মাধ্যম। কারণ এ সময় দান মানুষের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সংহতি বৃদ্ধি করে। ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান কমিয়ে আনে এবং সমাজে ন্যায়বিচার ও সহাবস্থানের পরিবেশ সৃষ্টি করে।
সহমর্মিতার এই চেতনা ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে জাতির পরিসরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। একটি সমাজ তখনই উন্নত হয়, যখন তার সদস্যরা একে অপরের দুঃখে পাশে দাঁড়ায়। রমজান সেই সামাজিক সংহতির বীজ বপন করে। ইফতার মাহফিল, জাকাত, ফিতরা, সদকা—সবকিছু মিলিয়ে রমজান হয়ে ওঠে ভাগাভাগির উৎসব। কিন্তু এর মূলকথা হলো অন্তরের পরিবর্তন। বাহ্যিক দান যদি অন্তরের উদারতায় রূপ না নেয়, তবে তা কেবল আনুষ্ঠানিকতা হয়ে থাকে।
ওএফএফ
What's Your Reaction?