রমজানে নারী সাহাবিদের ইবাদত

পবিত্র রমজান মুমিনের জন্য ইবাদতের বসন্ত মৌসুম। পরকালীন পাথেয় অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ। রমজানে নারী সাহাবিদের আমলও ছিল বর্ণনাতীত। মাসজুড়ে ইবাদত-বন্দেগিতে তারাও আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি অর্জনের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতেন। যদিও হাদিসের কিতাবগুলোতে সেসব বিবরণ পূর্ণাঙ্গভাবে পাওয়া যায় না, তবে আংশিক যা বর্ণনা পাওয়া যায়, তাই তাদের পরহেজগারির প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট। নারী সাহাবিদের মধ্যে আমলের দিক দিয়ে সর্বাগ্রে ছিলেন উম্মুল মুমিনীনগণ। নবীজি (সা.) ইবাদতের প্রতি তাদের উৎস জোগাতেন। আম্মাজান হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রমজানের শেষ দশকে নবীজি (সা.) কোমর শক্ত করে বেঁধে নিতেন, রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগি করতেন এবং তার পরিবারকে ডেকে দিতেন।’ (বুখারি: ২০২৪)। আল্লামা আইনি (রহ.) লিখেছেন, নবীজি (সা.) রমজানের রাতে স্ত্রীদের নামাজ ও ইবাদতের জন্য ডেকে দিতেন। (উমদাতুল কারি: ১১/১৪০) রমজানে উম্মাহাতুল মুমিনীনগণ তারাবি ও তাহাজ্জুদের নামাজে মনোযোগী হতেন। তারা নারী সাহাবিদের নামাজ শেখাতেন। নামাজ শেখানোর জন্য কখনো কখনো রমজানের রাতে জামাতে নামাজ আদায় করতেন। আল্লামা ইবরাহিম নাখই (রহ.) বলেন, ‘উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়েশা (রা.) ম

রমজানে নারী সাহাবিদের ইবাদত

পবিত্র রমজান মুমিনের জন্য ইবাদতের বসন্ত মৌসুম। পরকালীন পাথেয় অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ। রমজানে নারী সাহাবিদের আমলও ছিল বর্ণনাতীত। মাসজুড়ে ইবাদত-বন্দেগিতে তারাও আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি অর্জনের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতেন। যদিও হাদিসের কিতাবগুলোতে সেসব বিবরণ পূর্ণাঙ্গভাবে পাওয়া যায় না, তবে আংশিক যা বর্ণনা পাওয়া যায়, তাই তাদের পরহেজগারির প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট। নারী সাহাবিদের মধ্যে আমলের দিক দিয়ে সর্বাগ্রে ছিলেন উম্মুল মুমিনীনগণ। নবীজি (সা.) ইবাদতের প্রতি তাদের উৎস জোগাতেন। আম্মাজান হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রমজানের শেষ দশকে নবীজি (সা.) কোমর শক্ত করে বেঁধে নিতেন, রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগি করতেন এবং তার পরিবারকে ডেকে দিতেন।’ (বুখারি: ২০২৪)। আল্লামা আইনি (রহ.) লিখেছেন, নবীজি (সা.) রমজানের রাতে স্ত্রীদের নামাজ ও ইবাদতের জন্য ডেকে দিতেন। (উমদাতুল কারি: ১১/১৪০)

রমজানে উম্মাহাতুল মুমিনীনগণ তারাবি ও তাহাজ্জুদের নামাজে মনোযোগী হতেন। তারা নারী সাহাবিদের নামাজ শেখাতেন। নামাজ শেখানোর জন্য কখনো কখনো রমজানের রাতে জামাতে নামাজ আদায় করতেন। আল্লামা ইবরাহিম নাখই (রহ.) বলেন, ‘উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়েশা (রা.) মাঝেমধ্যে নারী সাহাবিদের ইমামতি করতেন এবং তিনি তাদের মাঝে দাঁড়াতেন।’ (কিতাবুল আসার লি আবি হানিফা, হাদিস: ২১৭)। প্রখ্যাত হাদিসবিশারদ আল্লামা জাফর আহমদ উসমানি (রহ.) ওই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘হজরত আয়েশা (রা.)-এর নামাজের ইমামতি নারী সাহাবিদের নামাজ শিক্ষা দেওয়ার জন্য ছিল।’ (ইলাউস সুনান: ৩/১৩০১)

কোরআন তেলাওয়াত সব ইমানদারের সবসময়ের আমল। তবে রমজান মাসে এর গুরুত্ব আরও বেশি। সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন ও বুজুর্গ আলেমেদ্বীন রমজান মাসে তেলাওয়াতের বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাদের অনেকেই রমজানের বেশিরভাগ সময় কোরআন তেলাওয়াতে কাটাতেন। দিনে দেখে তেলাওয়াত করতেন। আর রাতে তারাবি ও নফলের তেলাওয়াতে মশগুল থাকতেন। এভাবে কোরআন তেলাওয়াতের মধ্যেই কাটত তাদের রমজানের দিন-রাত। নারীদের অনেকে ছিলেন, যারা দৈনিক এক খতম কোরআন তেলাওয়াত করতেন। কোরআন তেলাওয়াতের ব্যাপারে তাদের মধ্যে ছিল প্রতিযোগিতা।

তারাবি নামাজ

নারীদের জন্য তারাবির নামাজ ও অন্য সব নামাজ ঘরে একাকী পড়াই শরিয়তের বিধান। এর বিপরীত করা ইসলামের মূল চেতনাপরিপন্থি। (আল বাহরুর রায়েক ১/৬২৭, রদ্দুল মুহতার ২/৪৬)। বিশুদ্ধ হাদিসে রয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন নারীদের মসজিদে না এসে ঘরে নামাজ আদায় করার নির্দেশ দেন, তখন একজন নারী সাহাবি রাসুল (সা.)-এর খেদমতে এসে বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমার মন চায় আপনার পেছনে নামাজ পড়তে, আমাকে অনুমতি দিন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তদুত্তরে যা বললেন তার মর্ম হলো, আমি তোমার আগ্রহের মূল্যায়ন করি, তা সত্ত্বেও মসজিদে নববীতে এসে ৫০ হাজার রাকাতের সাওয়াব পাওয়া এবং আমার পেছনে নামাজ পড়া থেকে তোমার ঘরে একা নামাজ পড়াই উত্তম। তাই রাসুল (সা.)-এর অবর্তমানে তার প্রিয় সাহাবিরা বিশেষ করে হজরত ওমর ও আয়েশা (রা.) মহিলাদের মসজিদে যেতে নিষেধ করেছেন। যার অনুসরণে দেড় হাজার বছর পর্যন্ত কোনো আলেম নারীদের মসজিদে এসে নামাজ পড়ার জন্য উৎসাহিত করেননি এবং এর জন্য কোনো ব্যবস্থাও করেননি। (বুখারি: ৮৬৯)

রমজানের এতেকাফ

হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত নবী কারিম (সা.) তার ওফাত পর্যন্ত রমজানের শেষ দশকে এতেকাফ করতেন। তার ওফাতের পর তার স্ত্রীরা ইতিকাফ করেছেন। (বুখারি: ২০২৬)। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রমজানের শেষ দশকে নবী কারিম (সা.) এতেকাফ করতেন। আমি তার তাঁবু তৈরি করে দিতাম। তিনি ফজরের সালাত আদায় করে তাতে প্রবেশ করতেন। (নবী-সহধর্মিণী) হাফসা (রা.) তাঁবু খাটানোর জন্য আয়েশা (রা.)-এর কাছে অনুমতি চাইলেন। তিনি তাকে অনুমতি দিলে হাফসা (রা.) তাঁবু খাটালেন। (নবী-সহধর্মিণী) জায়নাব বিনতে জাহশ (রা.) তা দেখে আরেকটি তাঁবু তৈরি করলেন। সকালে নবী কারিম (সা.) তাঁবুগুলো দেখলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন—এগুলো কী? তাকে জানানো হলে তিনি বললেন, তোমরা কি মনে করো এগুলো দিয়ে নেকি হাসিল হবে? এ মাসে তিনি এতেকাফ ত্যাগ করলেন ও পরে শাওয়াল মাসে ১০ দিন (কাজাস্বরূপ) এতেকাফ করেন। (বুখারি: ২০৩৩)

রমজানে ওমরাহ আদায়

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী কারিম (সা.) এক আনসারি নারীকে বললেন, আমাদের সঙ্গে হজ করতে তোমার বাধা কীসের? ইবনে আব্বাস (রা.) মহিলার নাম বলেছিলেন, কিন্তু আমি ভুলে গিয়েছি। মহিলা বললেন, আমাদের একটি পানি বহনকারী উট ছিল। কিন্তু তাতে অমুকের পিতা ও তার পুত্র (অর্থাৎ মহিলার স্বামী ও ছেলে) আরোহণ করে চলে গেছেন। আর আমাদের জন্য রেখে গেছেন পানি বহনকারী আরেকটি উট, যার দ্বারা আমরা পানি বহন করে থাকি। নবী কারিম (সা.) বললেন, আচ্ছা, রমজান এলে তখন ওমরাহ করে নিও। কেননা রমজানের একটি ‘ওমরাহ’ একটি হজের সমতুল্য। অথবা এরূপ কোনো কথা তিনি বলেছিলেন। (বুখারি: ১৭৮২)।

মহান আল্লাহ সবাইকে বোঝার ও আমল করার তওফিক দিন।

লেখক: মুহাদ্দিস ও প্রাবন্ধিক

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow