রাইফেলের বাট দিয়ে ক্ষতস্থানে খুঁচিয়েছে পুলিশ

5 days ago 7

জুলাই-আগস্টে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ তিনজনের বিরুদ্ধে অষ্টম দিনে ২২তম সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

গ্রামে লেখাপড়া করতেন মারুফ হোসেন। তাকে নিয়ে ফুচকাওয়ালা বাবার স্বপ্ন ছিল আকাশসম। আর ছেলেও ছুটি পেলে বাবার কাজে সহায়তায় ছুটে আসতেন ঢাকায়। কিন্তু জুলাই আন্দোলনে তাকে বাঁচতে দিলো না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিজিবির গুলিতে শহীদ হন সংসারের এই বড় ছেলে। গুলিবিদ্ধ মারুফকে হাসপাতালেও নিতে দেয়নি পুলিশ-বিজিবি। এমনকি ঢাকা মেডিকেলে যাওয়ার সময় রামপুরায় অ্যাম্বুলেন্স আটকে গুলিবিদ্ধ মারুফের ক্ষতস্থানে গুলি লেগে কেমন হয়েছে, গুলি ভিতরে আছে কি না এসব বলে রাইফেলের বাট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দেখেন এক পুলিশ সদস্য।

জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে সারাদেশে চালানো হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় এসব কথা বলেন শহীদ মারুফের বাবা।

জুলাই আন্দোলনে ২৯ জুলাই পৌনে ৬টায় গুলিবিদ্ধ হয়ে পরে শহীদ মারুফ হোসেনের বাবা ফুচকা ও চটপটি বিক্রেতা মো. ইদ্রিস জানান, তার ছেলে দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়তো। কলেজ বন্ধ থাকলে, সময় পেলেই গ্রাম থেকে ঢাকায় এসে তাকে সহযোগিতা করতো।

ট্রাইব্যুনাল–১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্যানেলে এই সাক্ষ্যগ্রহণ হয়।

শেখ হাসিনা ছাড়া এই মামলার অপর দুই আসামি হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন।

এই মামলায় শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল পলাতক। আর পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন এই মামলায় রাজসাক্ষী হয়েছেন।

শুনানির সময় উপস্থিত ছিলেন চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে সাক্ষীদের জেরা করেন পলাতক আসামি শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন।

জুলাই আন্দোলনে শহীদ মারুফ হোসেনের বাবা ফুচকা ও চটপটি বিক্রেতা মো. ইদ্রিস বলেন, আমার ছেলে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়তো। ১৯ জুলাই সকাল সাড়ে ৯টায় আমার ছেলে মারুফ আন্দোলনের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। তার সঙ্গে ছিল তার মামা ফয়সাল। জুমার নামাজের পর তারা বাসায় ফিরে আসলে একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করি। একথা বলেই তিনি কাঁদতে থাকেন।

এরপরে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, সাড়ে ৩টায় আবার বের হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর তার মামা আমাকে ফোন করে জানায় যে, রামপুরা ব্রিজের ওপর থেকে পুলিশ, বিজিবি ও ছাত্রলীগ আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি করছে। পৌনে ৬টার দিকে ফোন করে জানায় মারুফ গুলিবিদ্ধ হয়েছে বাড্ডা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে। প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য প্রথমে তাকে এমজেড হাসপাতালে নিয়ে যায়।

ইদ্রিস বলেন, মারুফের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় ওই হাসপাতাল থেকে ঢাকা মেডিকেলে নিতে বলে সেখানকার ডাক্তাররা। পথে রামপুরা ব্রিজের ওপর আওয়ামী লীগ, পুলিশ, বিজিবি মিলে আমার ছেলেকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটি আটকায়। তখন মারুফের শরীরে অক্সিজেন লাগানো ছিল, সে বেঁচে ছিল। ১৫-২০ মিনিট ধরে সেখানে অ্যাম্বুলেন্স আটকে রেখে পুলিশ, বিজিবি ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা জানায় সে মারা গেছে, তাকে হাসপাতালে নেওয়ার দরকার নেই।

তিনি বলেন, এমজেড হাসপাতালে বেন্ডেজ না থাকায় আমার ছেলের গুলিবিদ্ধ স্থানটি তখন গামছা দিয়ে প্যাঁচানো ছিল। পুলিশ রাইফেলের বাট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দেখে। গুলি ভিতরে আছে কি না, কোথায় লেগেছে দেখি বলে, রাইফেলের বাট দিয়ে ক্ষতস্থানে খোঁচা দিচ্ছিল আর আমার ছেলে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল।

তিনি বলেন, সেখান থেকে সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয় ছেলেকে। এরপর ৭টা ২০ মিনিটের দিকে সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এসময় কাঁদতে থাকেন তিনি।

ইদ্রিস আরও বলেন, ছেলের লাশ নিয়ে যেতে চাইলে হাসপাতাল কতৃপক্ষ পোস্টমর্টেম ছাড়া দিতে চায়নি। দুইদিন পর ২১ জুলাই পোস্টমর্টেম করে আমার ছেলে লাশ হস্তান্তর করে। পুলিশি বাধার কারণে ছেলের লাশের পোস্টমর্টেম করতে দেরি হয়েছে। বাড্ডা থানার ওসি তার এলাকায় এমন ঘটনা ঘটেনি বলে অস্বীকার করেন। পূর্ব বাড্ডার কবরস্থানে ছেলের লাশ দাফন করা হয়।

তিনি বলেন, ছেলের হত্যাকাণ্ডের জন্য নির্দেশদাতা হিসেবে শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান কামাল, চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, স্থানীয় এম পি ওয়াকিল উদ্দিন এবং মাঠে থাকা কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলম ও বিজিবির রেদোয়ানের বিচার চান।

এফএইচ/এসএনআর/জেআইএম

Read Entire Article