পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীরের (পিওকে) রাওয়ালকোটে যা ঘটছে, তা শুধু একটি স্থানীয় রাজনৈতিক সংকট নয়। এ ঘটনা পাকিস্তানে গণতন্ত্র, মানুষের মতপ্রকাশের অধিকার এবং রাষ্ট্রের আচরণ নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। পাকিস্তান বহু বছর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দাবি করে আসছে, তারা কাশ্মীরের মানুষের অধিকার ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার পক্ষে। কিন্তু রাওয়ালকোটের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাদের সেই দাবিকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
কয়েক সপ্তাহ ধরে এলাকাটিতে বিক্ষোভ চলছে। আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে যৌথ আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি)। এটি বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন ও অধিকারকর্মীদের একটি জোট। তাদের অভিযোগ, নির্বাচনি ব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।
সংকটের অন্যতম কারণ আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর আইনসভার ১২টি সংরক্ষিত আসন। এসব আসন বহু বছর আগে জম্মু-কাশ্মীর ছেড়ে পাকিস্তানে চলে যাওয়া শরণার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এতে বর্তমান বাসিন্দাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের দাবি, আইনসভায় প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণে ওই অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের মতামত ও অধিকারকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।
কিন্তু সরকার আলোচনার পথ বেছে নেয়নি। বরং জেএএসিকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর শুরু হয় ব্যাপক ধরপাকড়। নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে বহু মানুষ নিহত ও আহত হন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনকে ঘিরে সংঘাতে অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩৪ জন বিক্ষোভকারী এবং ছয়জন পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য। সরকারের দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তারা ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে মানবাধিকারকর্মীরা বলেছেন, রাজনৈতিক মতভেদকে নিরাপত্তা সংকটে পরিণত করা হয়েছে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সুযোগ সংকুচিত করা হয়েছে।
এ ঘটনা নতুন নয়। পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্নমত দমনের অভিযোগ আগে থেকেই রয়েছে। বেলুচিস্তানে বহু বছর ধরে গুম, গ্রেপ্তার এবং দমন-পীড়নের অভিযোগ উঠে আসছে। সম্প্রতি বেলুচ মানবাধিকারকর্মী ডা. মাহরাং বেলুচকে সন্ত্রাসবিরোধী আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, এটিও ভিন্নমত দমনের আরেকটি উদাহরণ।
রাওয়ালকোটের ঘটনায় আরও একটি বিষয় নজরে এসেছে। পাকিস্তানের মূলধারার অনেক গণমাধ্যম এ ঘটনাকে খুব কম গুরুত্ব দিয়েছে। অথচ অন্য দেশের বিক্ষোভ নিয়ে তারা ব্যাপক প্রচার চালায়। এ নিয়ে পাকিস্তানের তরুণদের মধ্যেও প্রশ্ন উঠেছে। তারা জানতে চাইছে, অন্য দেশের বিক্ষোভ দেখানো হলে নিজেদের দেশের মানুষের কণ্ঠ কেন চাপা দেওয়া হবে?
বিতর্ক আরও বাড়িয়েছে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফের একটি বক্তব্য। তিনি বলেছেন, পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীরের বিক্ষোভকারীদের তিনি ভারতের মতোই শত্রু হিসেবে দেখেন। তার এ মন্তব্যে দেশজুড়ে সমালোচনা শুরু হয়। কারণ প্রশ্ন উঠেছে, নিজের দেশের নাগরিক যদি প্রতিবাদ করে, তবে রাষ্ট্র কি তাদেরও শত্রু হিসেবে দেখবে?
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক রাওয়ালকোটের সহিংসতার নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি জেএএসিকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও নাগরিক সংগঠনের কার্যক্রম সীমিত করা মৌলিক অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এদিকে কয়েক সপ্তাহ ধরে এলাকায় মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকার অভিযোগও উঠেছে। পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) নেতা বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারিও এত দীর্ঘ সময় যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে কথা বলেছেন। তার মতে, পুরো জনগোষ্ঠীকে যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন করা কোনো কার্যকর সমাধান নয়।
রাওয়ালকোটের ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, একটি রাষ্ট্র ভিন্নমতকে কীভাবে দেখে। গণতন্ত্রে মতভেদ স্বাভাবিক। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদও নাগরিকের অধিকার। সেই প্রতিবাদকে যদি নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখা হয়, তাহলে রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়।
রাওয়ালকোটের পরিস্থিতি শুধু একটি আঞ্চলিক সংকট নয়। এটি পাকিস্তানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা এবং নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বেলুচিস্তান, খাইবার পাখতুনখোয়া ও পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীর—এই তিন অঞ্চলে বারবার অস্থিরতা দেখা দেওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
রাওয়ালকোট আজ শুধু একটি শহরের নাম নয়। এটি পাকিস্তানের গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রের জবাবদিহির এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার প্রতীক। ভিন্নমতকে দমন করে সংকট সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। তবে দীর্ঘমেয়াদে তা অসন্তোষ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই এ সংকটের সমাধান হবে সংলাপের মাধ্যমে, নাকি আরও কঠোর দমন-পীড়নের পথে—সেদিকেই এখন নজর আন্তর্জাতিক মহলের।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সম্পাদকীয় উপদেষ্টা ও অ্যাঙ্কর, এনডিটিভি ইন্ডিয়া