রাজনীতির আগুনে কারখানা ছাই, বোবাকান্না কাঁদছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা

3 weeks ago 5

• এক বছর ধরে বেকার কারখানার ১৬০০ শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তা
• আগুনে মিলের প্রায় ক্ষয়ক্ষতি হয় ৩০০ কোটি টাকার
• প্রশাসনের সহযোগিতার অভাবে পুনর্নির্মাণের সাহস পাচ্ছে না মালিকপক্ষ

গোল্ডেশিয়া জুট মিলস লিমিটেড। এক বছর আগেও বিশ্বের প্রায় দশটি দেশে পণ্য রপ্তানি করা প্রতিষ্ঠানটি এখন ভস্মীভূত এক ধ্বংসস্তূপ। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়বে সুনসান নীরবতা। নেই কোনো শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের পদচারণা। অফিস ভবন থেকে শুরু করে মিলের প্রতিটি স্থানে পোড়া চিহ্ন। পুড়ে যাওয়া যন্ত্রগুলো ঠাই দাঁড়িয়ে আছে কঙ্কাল রূপ ধারণ করে।

এক বছরেও চালু হয়নি রাজবাড়ীতে দুর্বৃত্তের দেওয়া আগুনে ভস্মীভূত জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী ইরাদত আলীর মালিকাধীন গোল্ডেশিয়া জুট মিলস লিমিটেড। ক্ষমতার পালাবদলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মিলটিতে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা।

শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তারা মিল চালুর আশায় থাকলেও সরকারি সহযোগিতা ও নিরাপত্তার অভাবে মিলটি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না বলে দাবি মিল কর্তৃপক্ষের। আগুনে মিলের প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হলেও তারা মিলটি পুনরায় চালু করতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন বলেও জানান।

‘মিলে আসি এবং যারা থাকে তাদের জিজ্ঞাসা করি কবে মিল চালু হবে। সবাই শুধু বলে চালু হবে। আমি চাই মিলটি তাড়াতাড়ি চালু হোক। তাহলে আমরা কাজ করে পরিবার-পরিজন নিয়ে একটু ভালো থাকতে পারবো।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশ ত্যাগের পর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী ইরাদত আলীর মালিকানাধীন শতভাগ উৎপাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান গোল্ডেশিয়া জুট মিলস লিমিটেডে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এসময় মিলে ভাঙচুর ও লুটপাট শেষে আগুন ধরিয়ে দেয় তারা। আগুন মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে জুট মিলের ইয়ার্ন ও জুট ব্যাগ উৎপাদনকারী শেড, গোডাউন এবং অফিস ভবনসহ প্রতিটি সেকশনে।

এসময় নিরাপত্তাজনিত কারণে তাৎক্ষণিক ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্মীরা না আসায় পুরো মিলে আগুন ধরে যায়। পুড়তে থাকে বিদেশে রপ্তানির জন্য প্রস্তুতকৃত পণ্য, পণ্য উৎপাদনের কাঁচামাল, মেশিনারিজ যন্ত্রাংশ, পণ্য পরিবহনের জন্য রাখা ৪টি গাড়ি এবং নগদ টাকাসহ অফিসের প্রয়োজনীয় কাগজসহ মূল্যবান সব জিনিসপত্র। ঘটনার দিন শেষ রাত থেকে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করলেও আগুন নির্বাপন করতে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগে রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন কর্মীদের। এ ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও মিলের প্রায় দেড় হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মহীন হয়ে পড়েন।

রাজনীতির আগুনে কারখানা ছাই, বোবাকান্না কাঁদছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা

২০১৫ সালে রাজবাড়ী পৌরসভা সংলগ্ন রামকান্তপুর ইউনিয়নের কাজীবাঁধা গ্রামে রাজবাড়ী টু বালিয়াকান্দি আঞ্চলিক সড়কের পাশে প্রায় ১০ একর জমির ওপর গোল্ডেশিয়া জুট মিলস তৈরির কাজ শুরু করেন কাজী ইরাদত আলী। ২০১৭ সাল থেকে মিলে শুরু হয় জুট ইয়ার্ন ও জুট ব্যাগ উৎপাদন কার্যক্রম। এই দুটি সেকশনে প্রায় ১ হাজার ১০০ এবং পাট প্রক্রিয়াজাতকরণ, নিরাপত্তাকর্মী, মেকানিক্যাল বা যান্ত্রিক বিভাগ, গোডউন ও অফিসে আরও প্রায় ৫০০ জনসহ সব মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ৬০০ জন শ্রমিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত ছিলেন। এই মিলের উৎপাদনকৃত পণ্য আমেরিকা, ইরাক, ইরান, তুরস্ক, আফ্রিকা, জর্দান, সেনেগাল, ঘানাসহ বিশ্বের প্রায় ৮ থেকে ১০টি দেশে রপ্তানি হতো।

সরেজমিনে দেখা যায়, মিলের প্রধান ফটক বন্ধ এবং গেটে বড় করে টাঙানো রয়েছে, ‘এই সম্পত্তি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি ফরিদপুর শাখায় দায়বদ্ধ’ । ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে সুনসান নীরবতা। নেই আগের মতো শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের পদচারণা। অফিস ভবন থেকে শুরু করে মিলের প্রতিটি স্থানে রয়েছে আগুনে পুড়ে ভস্মীভূত হওয়ার চিহ্ন। মূল ফটকের পাশের একটি ভবনের নিচতলায় চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসে অলস সময় পার করছিলেন মিলের উপ মহাব্যবস্থাপক।

‘আমি এই মিলের শুরু থেকে কাজ করতাম। গত বছর মিল পুড়ে যাওয়ার পর থেকে এক বছর বেকার। এখানে কাজের আশায় অন্য জায়গায় যাই না। আমার মতো অনেক শ্রমিক আছে যারা এখানে কাজের আশায় এখনো বসে আছে।’

মিলের গেটে দায়িত্বে থাকা ওসমান গনি বলেন, আমি মিলের সিকিউরিটি ম্যান হিসেবে গেটের দায়িত্ব পালন করতাম এবং এখনও করি। গত বছর ৫ আগস্ট আমার নাইট ডিউটি ছিল। মিলে আসার সময় আগুনের লেলিহান শিখা দেখে ভয়ে ভেতরে ঢুকতে পারিনি। সেদিন অনেকে আমাকে ধাওয়াও করেছে। পরবর্তীতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে মিলে আসি। এসে দেখি সব কিছু পুড়ে গেছে। তখন বুক ফেটে কান্না আসতো। এরপর থেকে এখানে কাজ করা শ্রমিকরা প্রায়ই গেটে এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করে কবে মিল চালু হবে। কিন্তু আমি কিছু বলতে পারি না।

শ্রমিক হাসিনা বেগম বলেন, ৭ বছর এই মিলে কাজ করে সংসার চালিয়েছি। গত বছর মিল পুড়ে যাওয়ার পর থেকে অনেক কষ্টে দিন পার করছি। মাঝেমধ্যেই মিলে আসি এবং যারা থাকে তাদের জিজ্ঞাসা করি কবে মিল চালু হবে। সবাই শুধু বলে চালু হবে। আমি চাই মিলটি তাড়াতাড়ি চালু হোক। তাহলে আমরা কাজ করে পরিবার-পরিজন নিয়ে একটু ভালো থাকতে পারবো।

রাজনীতির আগুনে কারখানা ছাই, বোবাকান্না কাঁদছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা

মিলন নামে আরেক শ্রমিক বলেন, আমি এই মিলের শুরু থেকে কাজ করতাম। গত বছর মিল পুড়ে যাওয়ার পর থেকে এক বছর বেকার। এখানে কাজের আশায় অন্য জায়গায় যাই না। আমার মতো অনেক শ্রমিক আছে যারা এখানে কাজের আশায় এখনো বসে আছে। আমরা মাঝে মাঝে এসে জিজ্ঞেস করি কবে চালু হবে কিন্তু কেউ বলতে পারে না। সবাই বলে চালু হবে চালু হবে। মিলটা দ্রুত চালু হলে আমাদের মতো শ্রমিকদের জন্য ভালো হয়।

‘আমরা এখন পরিবার পরিজন নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি। এখানে প্রায় ১৬০০ লোক কর্মরত ছিল। যাদের বেশিরভাগই এখন বেকার। আমি মনে করি এ প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যক্তির না, এই প্রতিষ্ঠানটি রাজবাড়ীর এবং বাংলাদেশের সমস্ত মানুষের। তাই মিলটি সবার স্বার্থে চালু করা প্রয়োজন।’

সিকিউরিটি ইনচার্জ শান্ত ইসলাম বলেন, গত বছর ৫ আগস্ট আমাদের মিলটি দুর্বৃত্তদের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এখানে আমরা প্রায় দেড় হাজারের বেশি শ্রমিক-কর্মচারী, কর্মকর্তা কাজ করতাম। এখন সবাই বেকার। এখন পর্যন্ত প্রশাসন বা সরকার থেকে মালিক পক্ষকে কোনো সহযোগিতা করেনি। যার কারণে পুনর্নির্মাণ করতে মালিকপক্ষ সাহস পাচ্ছে না। আমরা চাই মিলটি পুনর্নির্মাণ ও চালু করতে প্রশাসন ও সরকার মালিকপক্ষকে সহযোগিতা করুক।

সিনিয়র মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার নিপুন আহমেদ বলেন, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে আমি এই মিলে কর্মরত ছিলাম এবং এখনও আছি। আমার নিজের হাতে সেটিংস করা মেশিনের ভস্মীভূত অবস্থা দেখে চোখে পানি ধরে রাখতে পারি না। মেশিনপত্রের অবস্থা খুবই খারাপ, এখন শুধু লোহাগুলো দাঁড়িয়ে আছে। সরকারসহ সবার সম্মিলিত সহযোগিতায় মিলটি পুনরায় চালু করা সম্ভব। কারণ মালিকপক্ষ মিলটি চালু করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

রাজনীতির আগুনে কারখানা ছাই, বোবাকান্না কাঁদছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা

তিনি আরও বলেন, আগুনে মিলের স্ট্রাকচার, মেশিন, উৎপাদনকৃত পণ্য, কাঁচামালসহ সবকিছু পুড়ে গেছে। প্রায় এক বছর ধরে মিল বন্ধ। আমরা এখন পরিবার পরিজন নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি। এখানে প্রায় ১৬০০ লোক কর্মরত ছিল। যাদের বেশিরভাগই এখন বেকার। আমি মনে করি এ প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যক্তির না, এই প্রতিষ্ঠানটি রাজবাড়ীর এবং বাংলাদেশের সমস্ত মানুষের। তাই মিলটি সবার স্বার্থে চালু করা প্রয়োজন।

রাজবাড়ী গোল্ডেশিয়া জুট মিলস লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক খায়রুল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুষ্কৃতকারীদের আগুনে মিলটি সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। এখন পর্যন্ত মিলটি বন্ধ আছে। আমরা মিলটি চালুর জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। ব্যাংক, প্রশাসন ও সরকারের সহযোগিতা পেলে মিলটি পুনরায় চালু করা সম্ভব বলে মনে করি। মিলটিতে প্রায় ১৬০০ মানুষ কাজ করতো। এরা সবাই এখন কর্মহীন। এছাড়া মিলকে কেন্দ্র করে এই এলাকায় গড়ে ওঠা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ধ হয়ে গেছে। সবাই চায় মিলটি দ্রুত চালু হোক। মালিক পক্ষও মিলটি পুনরায় চালু করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করছে।

এফএ/এএসএম

Read Entire Article