দীর্ঘ ৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন। ফলে রাকসু নির্বাচন ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চলছে উৎসবের আমেজ। এরই মধ্যে মনোনয়নপত্র তুলে প্রচার-প্রচারণা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য হিসেবে ও শহীদ সামসুজ্জোহা হল সংসদের ভিপি পদে স্বতন্ত্রপ্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন তুলেছেন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী সৈয়দ সাকিব। রাকসু ও সিনেটের খুঁটিনাটি নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেন সাকিব। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক মনির হোসেন মাহিন।
জাগো নিউজ: সিনেট সদস্য পদে প্রার্থী হওয়ার পেছনে কোন বিষয় আপনাকে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ জুগিয়েছে?
সৈয়দ সাকিব: ২০১৯ সালে ইংরেজি বিভাগের লিখিত পরীক্ষায় ২য় স্থান অর্জন করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। সেবারও শুনেছিলাম রাকসু নির্বাচন হবে। ডাকসু নির্বাচন হলেও সেসময়ে রাকসু নির্বাচন হয়নি। ক্যাম্পাসে আসার পর থেকেই দেখছি ঢাবি, জাবিতে নিয়মিত সিনেট হলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম সিনেট দীর্ঘদিন ধরে অচল রয়েছে। সংবাদকর্মী হিসেবে এ বিষয়গুলো বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যখনই কোনো মতবিনিময় সভায় আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, ক্যাম্পাসের নানান অসঙ্গতি, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ-হতাশার কথা তুলে ধরেছি। সে জায়গা থেকে মনে করেছি সিনেট অধিবেশনে জোরালোভাবে শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে পারবো। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে চাপ দিতে পারবো। মূলত শিক্ষার্থীদের পক্ষে কথা বলতে পারার যে শক্তি- সেটিই আমাকে প্রার্থী হওয়ার পেছনে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
জাগো নিউজ: সাধারণত দেখা যায় প্রার্থীরা রাকসু এবং সিনেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে থাকেন। আপনি সিনেটের পাশাপাশি আবাসিক হলের ভিপি পদেও মনোনয়নপত্র তুলেছেন। কারণ কী?
আরও পড়ুন
- সিনেট সদস্য-হল ভিপি পদে মনোনয়ন তুললেন রাবি প্রেসক্লাবের সাকিব
- রাকসুর সর্বশেষ নির্বাচনে নেতৃত্বে ছিলেন যারা
- ভোটার তালিকা থেকে ছাত্রলীগের নাম বাতিল দাবিতে ছাত্রদলের বিক্ষোভ
সৈয়দ সাকিব: দেখুন, আমি এমন এক হলের আবাসিক শিক্ষার্থী- যার একটি ঐতিহাসিক মর্যাদা আছে। শামসুজ্জোহা স্যারের নামাঙ্কিত শহীদ শামসুজ্জোহা হল ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক বাঙালিদের নির্যাতনের এক জলজ্যান্ত দলিল। এই হলের যত বয়স, স্বাধীন বাংলাদেশের বয়সও একই। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো- এই হলের শিক্ষার্থীরা এখনো পর্যাপ্ত সুবিধা পাচ্ছেন না। আবাসিক হলের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে বরাবরই সোচ্চার ছিলাম। শামসুজ্জোহা হলে আমি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় পার করেছি। এবার এই হলের জন্য কিছু দিতে চাই। সেজন্যই সিনেটের পাশাপাশি হল সংসদে ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব হলেই খাবার এবং বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে। খাবারের মেন্যুতে কোনো বৈচিত্র্য নেই, শুক্রবার একটু ভালো মানের খাবারেরও ব্যবস্থা থাকে না। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে এ বিষয়গুলো সমাধান করতে চাই।
জাগো নিউজ: সিনেটে যদি বিজয়ী হন, কোন কোন বিষয়গুলো নিয়ে অধিবেশনে কথা বলতে চান?
সৈয়দ সাকিব: সিনেট মূলত পলিসি মেকিংয়ের জায়গা। আমার অন্যতম প্রধান একটি ইশতেহার থাকবে, যেদিন প্রথম সিনেট অধিবেশন হবে সেদিনই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঘোষণা দিতে হবে। আপনি জানেন, সিনেটে সরকারের প্রতিনিধি, স্থানীয় প্রতিনিধি, শিক্ষক প্রতিনিধিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব স্টেকহোল্ডারদের পার্টিসিপেশন থাকে। এছাড়া, শিক্ষার্থীদের খাবার সমস্যা নিরসনে একটি আলাদা ফুড রিলেটেড বোর্ড বা ফোরাম তৈরি করার জন্যও অধিবেশনে দাবি জানাবো।
জাগো নিউজ: আবাসিক হল নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
সৈয়দ সাকিব: আমি নিজে যে হলে থাকি সেটিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব হলেই খাবার এবং বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে। খাবারের মেন্যুতে কোনো বৈচিত্র্য নেই, শুক্রবার একটু ভালো মানের খাবারেরও ব্যবস্থা থাকে না। একটু পুষ্টিকর নাস্তা যেমন, দই-চিড়া, সেদ্ধ ডিম, রুটি, মৌসুমি ফলের ব্যবস্থা নেই। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে এ বিষয়গুলো সমাধান করতে চাই। শিক্ষার্থীদের সহ-শিক্ষামূলক কার্যক্রম, সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হলগুলোতে হয় না বললেই চলে। নির্বাচিত হলে এ বিষয়গুলো সমাধানে অগ্রাধিকার দেবো।
জাগো নিউজ: আপনি স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। অনেকেই ছাত্র সংগঠনের প্যানেল কিংবা কোনো প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সে হিসেবে নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণায় আপনার কৌশল কী থাকবে?
সৈয়দ সাকিব: আমার কৌশল বলতে আলাদা করে কিছু নেই। শিক্ষার্থীরাই আমার শক্তি। রাকসু কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের, ব্যক্তির নয়; বরং রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নির্বাচিত হয়ে স্ব স্ব দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করে থাকেন। কিন্তু সে জায়গায় আমি নির্বাচিত হলে দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে সব পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের হয়ে সিনেটে আওয়াজ তুলতে পারবো। আমার বিশ্বাস, শিক্ষার্থীরা মনে করছেন- নিরপেক্ষভাবে যেসব প্রার্থী তাদের হয়ে কাজ করতে পারবে, কথা বলতে পারবে- ভোটাররা সেসব প্রার্থীকেই ভোট দেবেন।
রাকসু কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের, ব্যক্তির নয়; বরং রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নির্বাচিত হয়ে স্ব স্ব দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করে থাকেন। আমি নির্বাচিত হলে দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে সব পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের হয়ে সিনেটে আওয়াজ তুলতে পারবো।
আরও পড়ুন
- ফের তারিখ পরিবর্তন, রাকসু নির্বাচন ২৫ সেপ্টেম্বর
- রাকসু নির্বাচনে রাবি সায়েন্স ক্লাবের দুই প্রতিনিধি
- রাকসুর প্রথম নারী প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র নিলেন নিশা আক্তার
জাগো নিউজ: আবাসন সংকটের কারণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসের বাইরে থাকতে হচ্ছে। তাদের নিয়ে আপনার কোনো পরিকল্পনা আছে কী?
সৈয়দ সাকিব: অবশ্যই আছে। মৌলিক দাবিতো একটাই- পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় করা। কিন্তু সেটি না হওয়া পর্যন্ত অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় এবং তাদের স্বার্থ সুরক্ষায় ১০ দফা প্রস্তাবনা এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছি। সেখানে আমি উল্লেখ করেছি-
‘অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধা নিশ্চিত না হওয়ার সময় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মাসিক তিন হাজার টাকা আবাসন ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। অনাবাসিক শিক্ষার্থীরা তাদের আবাসস্থলে কোনো সমস্যায় পড়লে, তা সমাধানের জন্য একটি কেয়ার উইং গঠন করতে হবে। অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের আবাসস্থলের ঠিকানা হল প্রশাসন সংরক্ষণ করবে। সব হলের নামে একটি অফিসিয়াল ফেসবুক গ্রুপ থাকবে এবং মেসেঞ্জার কমিউনিটি প্ল্যাটফর্ম থাকবে- যার অ্যাডমিন প্যানেলে থাকবে হল প্রশাসন। সব হলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন হল ডে পালন করতে হবে এবং সেখানে অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের যুক্ত করতে হবে। এছাড়া, সব ধরনের অনুষ্ঠানে অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের আমন্ত্রণ জানাতে হবে।’
জাগো নিউজ: ভোট চাইতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কেমন সাড়া পাচ্ছেন?
সৈয়দ সাকিব: এখনো অফিসিয়ালি প্রচারণা শুরু করিনি। তবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বেশ সাড়া পাচ্ছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কমেন্ট এবং মেসেজের মাধ্যমে অনেকেই শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। তাদের সবাইকে বলেছি- আপনাদের ভালোবাসাটাই আমার শক্তি। আমার চাওয়া, সাধারণ শিক্ষার্থীরাই আমার হয়ে প্রচারণা চালাবে, ভোট চাইবে।
জাগো নিউজ: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে চান?
সৈয়দ সাকিব: শুধু একটা কথাই বলবো, ৩৫ বছর পর আমাদের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এক মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় আছে। রাকসু, হল সংসদ, সিনেট- এই তিন বিভাগে আপনাদের হাতে মোট ৪৩টি ভোট আছে। আইডিওলোজি, চটকদার ইশতেহার দেখে নয়- যেসব প্রার্থী বস্তুতই আপনার হয়ে সিনেটে কথা বলতে পারবে, প্রশাসনকে প্রশ্ন করতে পারবে, চাপ প্রয়োগ করতে পারবে, আপনার অধিকার আদায়ে সর্বদা সোচ্চার থাকবে- আপনার মূল্যবান ভোট তাকেই দেবেন।
মনির হোসেন মাহিন/কেএসআর/এমএস