‘রাতে ঘুম হয় না, নদী আস্তে আস্তে ঘরের সামনে আইতেছে’

সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজের জমিতে সবুজ ফসলের সমারোহ দেখতেন কৃষক আব্দুল মজিদ। সেই জমির ধান, পাট ও নানা ফসলের আয়েই চলত ১১ সদস্যের সংসার। কিন্তু আজ সেই জমি নেই, নেই ফসলও। আছে শুধু ব্রহ্মপুত্রের তীব্র স্রোত আর বুকভরা দীর্ঘশ্বাস। গত দুই মাসে জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার গাইবান্ধা ইউনিয়নের বেলকুচি এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের ভয়াবহ ভাঙনে আব্দুল মজিদের ৯০ শতাংশ আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। একসময় যেখানে সোনালি ফসল দুলত, সেখানে এখন শুধু নদীর উত্তাল স্রোত। সর্বস্ব হারিয়ে হতাশায় দিন কাটছে তার। আব্দুল মজিদ বলেন, ‘এই জমিই ছিল আমার সব। এই জমির ফসল দিয়েই সংসার চলত। এখন কিছুই নাই। জমি নদীতে গেছে, আয়-রোজগারও শেষ। পরিবার নিয়ে কেমনে চলমু বুঝতেছি না। নদী আমার সবকিছু কাইড়া নিছে।’ নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে সড়ক/ ছবি: জাগো নিউজ শুধু আব্দুল মজিদ নন, একই গল্প বেলকুচি, পোড়ারচর ও লক্ষ্মীপুর এলাকার শত শত পরিবারের। ব্রহ্মপুত্রের অব্যাহত ভাঙনে প্রতিদিনই একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের সহায়-সম্বল। কেউ হারিয়েছেন বসতভিটা, কেউ ফসলি জমি, আবার কেউ হারিয়েছেন ভবিষ্যতের শেষ আশ্রয়টুকু। সরেজমিনে দেখা যায়, বেলকুচি এলাকায় নদীতীরজুড়ে আত

‘রাতে ঘুম হয় না, নদী আস্তে আস্তে ঘরের সামনে আইতেছে’

সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজের জমিতে সবুজ ফসলের সমারোহ দেখতেন কৃষক আব্দুল মজিদ। সেই জমির ধান, পাট ও নানা ফসলের আয়েই চলত ১১ সদস্যের সংসার। কিন্তু আজ সেই জমি নেই, নেই ফসলও। আছে শুধু ব্রহ্মপুত্রের তীব্র স্রোত আর বুকভরা দীর্ঘশ্বাস।

গত দুই মাসে জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার গাইবান্ধা ইউনিয়নের বেলকুচি এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের ভয়াবহ ভাঙনে আব্দুল মজিদের ৯০ শতাংশ আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। একসময় যেখানে সোনালি ফসল দুলত, সেখানে এখন শুধু নদীর উত্তাল স্রোত। সর্বস্ব হারিয়ে হতাশায় দিন কাটছে তার।

আব্দুল মজিদ বলেন, ‘এই জমিই ছিল আমার সব। এই জমির ফসল দিয়েই সংসার চলত। এখন কিছুই নাই। জমি নদীতে গেছে, আয়-রোজগারও শেষ। পরিবার নিয়ে কেমনে চলমু বুঝতেছি না। নদী আমার সবকিছু কাইড়া নিছে।’

‘রাতে ঘুম হয় না, নদী আস্তে আস্তে ঘরের সামনে আইতেছে’
নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে সড়ক/ ছবি: জাগো নিউজ

শুধু আব্দুল মজিদ নন, একই গল্প বেলকুচি, পোড়ারচর ও লক্ষ্মীপুর এলাকার শত শত পরিবারের। ব্রহ্মপুত্রের অব্যাহত ভাঙনে প্রতিদিনই একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের সহায়-সম্বল। কেউ হারিয়েছেন বসতভিটা, কেউ ফসলি জমি, আবার কেউ হারিয়েছেন ভবিষ্যতের শেষ আশ্রয়টুকু।

সরেজমিনে দেখা যায়, বেলকুচি এলাকায় নদীতীরজুড়ে আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার ছাপ। নদীর তীরঘেঁষা অনেক ঘরের মেঝেতে ফাটল ধরেছে। কোথাও বাড়ির আঙিনা নদীতে তলিয়ে গেছে, কোথাও বসতঘরের একাংশ ঝুলে আছে নদীর কিনারে। ভাঙনের শব্দ শুনলেই মানুষ ছুটে যাচ্ছেন নদীর ধারে। কখন যে নিজের ঘরবাড়িও নদীতে বিলীন হয়ে যায়, সেই ভয় যেন তাদের নিত্যসঙ্গী।

স্থানীয়রা জানান, নতুন করে গত দুই মাস ধরে বেলকুচি ও লক্ষ্মীপুর এলাকায় নদীভাঙন শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে অন্তত ৩০টি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে আরও বহু ঘরবাড়ি।

নদীপাড়ের বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলেন, ‘রাতে ঘুম হয় না। নদী আস্তে আস্তে ঘরের সামনে আইতেছে। কখন ঘরটা ভেঙে নদীতে পড়ে যায় সেই ভয়েই থাকি। অনেকেই ঘর খুলে অন্য জায়গায় নেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু সবাই তো আর জায়গা পায় না।’

স্থানীয় গৃহবধূ নুরজাহান বেগম বলেন, ‘সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়া একটা ঘর বানাইছি। এখন সেই ঘরও নদীর ধারে। প্রতিদিন মনে হয় আজ না কাল নদীতে যাইবো। ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে কোথায় যামু?’

ভাঙনের থাবা শুধু বসত ভিটাতেই সীমাবদ্ধ নেই। বিলীন হচ্ছে কৃষকদের জীবিকার প্রধান উৎস ফসলি জমিও। যেসব জমিতে কয়েক সপ্তাহ আগেও ধান, পাট ও শাকসবজির আবাদ ছিল, সেসব জমির অনেকটাই এখন নদীর তলদেশে।

‘রাতে ঘুম হয় না, নদী আস্তে আস্তে ঘরের সামনে আইতেছে’
নদীর ভাঙনে বিলীন হচ্ছে কৃষিজমি/ ছবি: জাগো নিউজ

কৃষক আবুল কালাম বলেন, ‘একটা জমি তৈরি করতে কত কষ্ট হয়, সেটা কৃষক ছাড়া কেউ বুঝবে না। কয়েক মাসের মধ্যে নদী সব শেষ করে দিল।’

শাহাদাত হোসেন নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমার বাবা একজন কৃষক। ছোটোবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার সঙ্গে কৃষিকাজে সাহায্য করে আসছি। কিন্তু কিছুদিন আগে আমাদের ফসলি জমিটা নদীগর্ভে চলে গেছে। জমি হারানোর পর আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি। এখন খুব দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটছে। সরকারের কাছে একটাই দাবি, অন্তত জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে নদীভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তা না হলে শুধু আমাদের পরিবার নয়, পুরো গ্রামের মানুষই বড় ক্ষতির মুখে পড়বে।’

ভাঙনের কারণে ঝুঁকিতে পড়েছে এলাকার যোগাযোগব্যবস্থাও। পোড়ারচর থেকে বেলকুচিপাড়া পর্যন্ত প্রায় ৩০০ মিটার পাকা সড়ক এখন নদীর সরাসরি হুমকির মুখে। সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, যেকোনো সময় সড়কটির বড় অংশ নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে। এতে কয়েকটি গ্রামের সঙ্গে উপজেলা সদরের যোগাযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষা এলেই একইভাবে ভাঙন শুরু হয়। কিন্তু স্থায়ীভাবে নদীশাসন বা তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয় না। বর্ষা শেষে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও বিষয়টি ভুলে যায়। ফলে পরের বছর আবারও একই দুর্ভোগের মুখে পড়তে হয়।

এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, দুই বছর আগে সরকারি ড্রেজার দিয়ে নদী খননের পর থেকে ভাঙনের মাত্রা আরও বেড়েছে। তাদের দাবি, নদীর প্রবাহ পরিবর্তিত হওয়ায় স্রোতের চাপ এখন সরাসরি জনবসতির দিকে পড়ছে।

স্থানীয় শাহীন মিয়া বলেন, ‘আগেও ভাঙন ছিল, কিন্তু এত ভয়াবহ ছিল না। ড্রেজিংয়ের পর নদীর ধারা বদলাইছে এখন স্রোত সরাসরি এই পাড়ে আঘাত করে।’

তবে ড্রেজিংয়ের কারণে ভাঙন বেড়েছে কি না, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড।

এদিকে লক্ষ্মীপুর এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে অস্থায়ী সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয়দের মতে, এসব ব্যবস্থা সাময়িক স্বস্তি দিলেও স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে না। তারা দ্রুত নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয়রা বলছেন, ভাঙন এভাবে চলতে থাকলে শুধু ঘরবাড়ি বা জমিই নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা, কবরস্থান ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কও হুমকির মুখে পড়বে। এতে পুরো এলাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারে।

ইসলামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ মো. জুবায়ের বলেন, ‘ভাঙনকবলিত এলাকা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। লক্ষ্মীপুর এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে অস্থায়ী সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বেলকুচি এলাকার পরিস্থিতিও পর্যবেক্ষণে রয়েছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।’

জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নকিবুজ্জামান খান বলেন, ‘ভাঙন পরিস্থিতি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

হৃদয় আহম্মেদ/এসজেডএইচ/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow