রাষ্ট্রপতি ফখরুলের সামনে যে গণতান্ত্রিক পরীক্ষা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু মুহূর্ত আসে, যখন একটি পদে কে বসছেন—তার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে প্রশ্নটি: সেই পদটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্রকে কতটা বদলাতে পারবে? বঙ্গভবনের দিকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সম্ভাব্য যাত্রা এমনই একটি মুহূর্ত। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে বিএনপির মহাসচিব এখন রাষ্ট্রপতি পদে দলের মনোনীত প্রার্থী। তবে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে রাষ্ট্রপতি বলা ঠিক হবে না; আপাতত তিনি ক্ষমতাসীন বিএনপির মনোনীত রাষ্ট্রপতি প্রার্থী। কিন্তু ব্যক্তির পদোন্নতির গল্পের আড়ালে যে বড় প্রশ্নটি রয়েছে, তা হলো—বাংলাদেশ কি সত্যিই গণতন্ত্রের পথে এগোচ্ছে, নাকি কেবল ক্ষমতার পালাবদল ঘটছে? এই প্রশ্নটি এ মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি। কারণ ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল কেবল একটি সরকারের পরিবর্তন নয়; ছিল রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তন। কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা, নির্বাচনি অনিয়ম, বিরোধী মত দমন, প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনৈতিকীকরণ এবং ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণের অবসান ঘটিয়ে একটি জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাই ছিল

রাষ্ট্রপতি ফখরুলের সামনে যে গণতান্ত্রিক পরীক্ষা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু মুহূর্ত আসে, যখন একটি পদে কে বসছেন—তার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে প্রশ্নটি: সেই পদটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্রকে কতটা বদলাতে পারবে? বঙ্গভবনের দিকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সম্ভাব্য যাত্রা এমনই একটি মুহূর্ত। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে বিএনপির মহাসচিব এখন রাষ্ট্রপতি পদে দলের মনোনীত প্রার্থী। তবে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে রাষ্ট্রপতি বলা ঠিক হবে না; আপাতত তিনি ক্ষমতাসীন বিএনপির মনোনীত রাষ্ট্রপতি প্রার্থী। কিন্তু ব্যক্তির পদোন্নতির গল্পের আড়ালে যে বড় প্রশ্নটি রয়েছে, তা হলো—বাংলাদেশ কি সত্যিই গণতন্ত্রের পথে এগোচ্ছে, নাকি কেবল ক্ষমতার পালাবদল ঘটছে?

এই প্রশ্নটি এ মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি। কারণ ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল কেবল একটি সরকারের পরিবর্তন নয়; ছিল রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তন। কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা, নির্বাচনি অনিয়ম, বিরোধী মত দমন, প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনৈতিকীকরণ এবং ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণের অবসান ঘটিয়ে একটি জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাই ছিল সেই আন্দোলনের গভীরতম রাজনৈতিক অর্থ।

২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন সেই প্রত্যাশার প্রথম বড় পরীক্ষা। ১০ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৯টি আসন পেয়ে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। নির্বাচনটি ছিল ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচন। একই সঙ্গে সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়।

অর্থাৎ জনগণ একটি দলকে ক্ষমতা দিয়েছে। কিন্তু গণতন্ত্রের অর্থ কেবল জনগণের ভোটে একটি দলকে ক্ষমতায় বসানো নয়। বরং ক্ষমতায় গিয়ে সেই দল কীভাবে বিরোধী মতকে জায়গা দেয়, প্রতিষ্ঠানগুলোকে কতটা স্বাধীন রাখে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কতটা নিশ্চিত করে, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখে এবং পরবর্তী নির্বাচনকে কতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তোলে—গণতন্ত্রের আসল পরীক্ষা সেখানে। এই জায়গায়ই মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনাটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

জাগো নিউজের প্রতিবেদনে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার যে চিত্র উঠে এসেছে, তা নিছক একজন দলীয় নেতার জীবনকাহিনি নয়। ১৯৪৮ সালে ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম নেওয়া ফখরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়েছেন, ছাত্রজীবনে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন এবং ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃত্বে ছিলেন। শিক্ষকতা করেছেন ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি কলেজে। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান হন। ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিএনপি সরকারের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে দলের মুখপাত্র, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হন।

এই অভিজ্ঞতার একটি বিশেষ দিক হলো—তিনি কেবল ক্ষমতার ভেতরের রাজনীতি দেখেননি; বিরোধী রাজনীতির দীর্ঘ সময়ও পার করেছেন। রাজপথে আন্দোলন, মামলা-গ্রেফতার, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, গণমাধ্যমের সামনে দলীয় বক্তব্য তুলে ধরা—এসব তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অংশ।

এ কারণে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর সামনে একটি বড় সুযোগ রয়েছে। তিনি চাইলে রাষ্ট্রপতির পদকে কেবল সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনদাতা হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা পুনর্গঠনের একটি নৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। তবে এখানেই সবচেয়ে বড় বিপদও আছে।

ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশের প্রয়োজন আরেকজন শক্তিশালী শাসক নয়; প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। প্রয়োজন এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে ক্ষমতায় থাকা মানে সবকিছু নিয়ন্ত্রণের অধিকার নয় এবং বিরোধী দলে থাকা মানে সবকিছুর বিরোধিতা করা নয়। প্রয়োজন এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে রাষ্ট্রপতি হবেন সংবিধানের কাছে দায়বদ্ধ, সরকার থাকবে জনগণের কাছে জবাবদিহির মধ্যে এবং বিরোধী দল থাকবে বিকল্প রাষ্ট্রচিন্তার ধারক হিসেবে।

যে দল তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দিয়েছে, সেই দলই বর্তমানে রাষ্ট্রক্ষমতায়। রাষ্ট্রপতি যদি দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠতে না পারেন, তাহলে জনগণের চোখে বঙ্গভবনও ক্ষমতাসীন দলের আরেকটি সম্প্রসারিত রাজনৈতিক কার্যালয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বাংলাদেশের অতীত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এ বিষয়ে সুখকর নয়। বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো যখন ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে যুক্ত হয়েছে, তখন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রাষ্ট্রপতির পদটি তাই আনুষ্ঠানিক হলেও এর নৈতিক গুরুত্ব কম নয়। বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান হলেও নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্র নন। রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হন এবং অধিকাংশ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়। ফলে রাষ্ট্রপতির হাতে সরকার পরিচালনার সরাসরি ক্ষমতা নেই। কিন্তু তিনি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা, মর্যাদা ও নিরপেক্ষতার একটি প্রতীকী কেন্দ্র।

এ কারণেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাম্প্রতিক আরেকটি ঘটনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুলের বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী করেছে।

বাস্তবতার বিচারে অলি আহমদের জয়ের সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। সংসদে বিএনপির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফল অনেকটাই পূর্বনির্ধারিত। তবু বিরোধী জোটের প্রার্থী দেওয়ার রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। কারণ নির্বাচন তখন আর একক প্রার্থীর আনুষ্ঠানিক অনুমোদনে সীমাবদ্ধ থাকছে না; সংসদে অন্তত একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হচ্ছে।

জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জুলাই সনদ ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে বিএনপি প্রত্যাশিত উদ্যোগ নেয়নি। তাদের বক্তব্য, সংস্কারের বিষয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হলে রাষ্ট্রপতি পদে একক প্রার্থীও দেওয়া যেত। কিন্তু সেই সমঝোতা না হওয়ায় তারা আলাদা প্রার্থী দিয়েছে।

এখানে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—গণতন্ত্র কি শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার শাসন, নাকি সংখ্যাগরিষ্ঠতার সঙ্গে ঐকমত্য, সংখ্যালঘুর অধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যেরও সমন্বয়?

একটি নির্বাচনে কোনো দল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতেই পারে। জনগণের রায় অবশ্যই সম্মান করতে হবে। কিন্তু সেই রায় ক্ষমতাসীন দলকে বিরোধী দলের কণ্ঠস্বর উপেক্ষা করার লাইসেন্স দেয় না। সংসদে বিরোধী দলের আসন কম হলেও তাদের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা কমে যায় না।

অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থিতা নিয়ে অতিরিক্ত রোমান্টিক হওয়ারও সুযোগ নেই। জামায়াত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা বিতর্ক থেকে মুক্ত নয়। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ভূমিকা, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি এবং রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে দলটির অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের বিষয়। ফলে গণতন্ত্রের প্রশ্নে তাদের বর্তমান অবস্থান মূল্যায়নের সময় অতীত ও বর্তমান—দুটিকেই বিবেচনায় নিতে হবে। তবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাংবিধানিক ও শান্তিপূর্ণ পদ্ধতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকারকে স্বীকার করতেই হবে। যে দলই হোক, তারা যদি নির্বাচনি প্রক্রিয়ার ভেতরে থেকে নিজেদের মত ও বিকল্প তুলে ধরে, সেটি গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। বরং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিএনপির জন্যও একটি পরীক্ষা।

বিএনপি যদি সত্যিই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির কথা বলে, তাহলে তাদের উচিত হবে বিরোধী প্রার্থীকে শত্রু হিসেবে না দেখা। অলি আহমদের প্রার্থিতাকে ষড়যন্ত্র বা অযৌক্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে না দেখে সংসদীয় গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করা দরকার। ক্ষমতাসীন দলের গণতান্ত্রিক পরিপক্বতা বোঝা যাবে তারা কতটা সহজভাবে বিরোধী দলের এই অধিকারকে মেনে নেয় তার মধ্য দিয়ে। কারণ ক্ষমতার প্রকৃত পরীক্ষা বিরোধীদের দমন করা নয়; বিরোধীদের কথা বলার অধিকার নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র এখনো সেই জায়গায় পৌঁছায়নি, যেখানে শুধু একটি নির্বাচন হলেই গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত বলা যায়। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণেও এ বাস্তবতা স্পষ্ট। ফ্রিডম হাউজের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে ‘Partly Free’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে এবং ১০০’র মধ্যে ৪৪ স্কোর দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার পাশাপাশি সহিংসতা, প্রতিশোধমূলক রাজনীতি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতার মতো সমস্যাগুলোর কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

অবশ্য ২০২৬ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পরিবর্তন। দীর্ঘ সময় পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে। বিএনপির বড় বিজয়ও দেখিয়েছে, ভোটাররা রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় নন। তাঁরা পরিবর্তন চান, আবার প্রয়োজন হলে ক্ষমতাসীনদের জবাবও দিতে পারেন। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব নির্ভর করে ক্ষমতাসীন দল কতটা শক্তিশালী তার ওপর নয়; বরং ক্ষমতাসীন দল কতটা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান তৈরি করে তার ওপর। এখানেই রাষ্ট্রপতি ফখরুলের সম্ভাব্য ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

রাষ্ট্রপতি যদি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদা, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে নৈতিক অবস্থান নেন, তাহলে সীমিত সাংবিধানিক ক্ষমতার মধ্যেও তিনি একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা দিতে পারেন। তিনি যদি ক্ষমতাসীন দলের কোনো অন্যায় সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিকভাবে সমর্থন না করে সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেন, সেটিও হবে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

আরও বড় বিষয় হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরাজয়কে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি এখনো দুর্বল। আমরা ক্ষমতায় থাকলে নির্বাচন গণতন্ত্রের উৎসব, আর বিরোধী দলে থাকলে নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ—এই দ্বৈত মানসিকতা থেকে বের হতে পারিনি। অথচ গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো ক্ষমতা স্থায়ী নয়। আজ যে সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠ, কাল সে বিরোধী দলও হতে পারে। আজ যে দল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করছে, কাল সেই প্রতিষ্ঠানই তার জবাবদিহির ক্ষেত্র হতে পারে। এই উপলব্ধি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে না এলে কোনো সাংবিধানিক সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

মির্জা ফখরুলের সামনে তাই একটি ঐতিহাসিক সুযোগ আছে। তিনি চাইলে নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। তাঁর বক্তব্য ও আচরণে যদি প্রতিপক্ষের প্রতি সহনশীলতা, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতার প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার দেখা যায়, তাহলে তাঁর রাষ্ট্রপতিত্ব কেবল একটি রাজনৈতিক নিয়োগ হয়ে থাকবে না; বরং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের একটি প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।

তবে এই দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রপতির নয়। প্রধানমন্ত্রী, সংসদ, বিরোধী দল, নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ—সবাইকে একই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। বিশেষ করে বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—দীর্ঘদিন বিরোধী দলে থেকে যে গণতন্ত্রের কথা তারা বলেছে, ক্ষমতায় গিয়ে সেই গণতন্ত্রকেই কতটা সহ্য করতে পারে।

ক্ষমতায় থাকার সময় গণতন্ত্রের যে মানদণ্ড নিজের জন্য দাবি করা হয়, বিরোধী দলে গেলে সেই একই মানদণ্ড অন্যের জন্য মেনে নেওয়া—এটাই রাজনৈতিক পরিপক্বতা।

আর বিরোধী দলের জন্য পরীক্ষাটিও কম নয়। জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্তকে যদি গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে দেখা হয়, তাহলে তাদেরও প্রমাণ করতে হবে যে তারা কেবল ক্ষমতার পালাবদল চায় না; তারা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার ও বহুত্ববাদী সমাজের প্রতিও দায়বদ্ধ। কারণ গণতন্ত্রে বিরোধী দল মানেই সরকারকে হারানোর অপেক্ষায় থাকা দল নয়; বিরোধী দল হলো সরকারের বিকল্প হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত রাখা একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অলি আহমদের জয় হবে না—এ কথা হয়তো নির্বাচনের আগেই বলা যায়। কিন্তু একটি গণতন্ত্রে সব নির্বাচন শুধু জয়ের জন্য হয় না। কোনো কোনো নির্বাচন হয় নিজের অবস্থান জানানোর জন্য, জনগণের সামনে বিকল্প তুলে ধরার জন্য, ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির মধ্যে রাখার জন্য এবং প্রতিষ্ঠানকে জীবন্ত রাখার জন্য।

এই জায়গা থেকেই জামায়াতের প্রার্থী দেওয়ার ঘটনাটি দেখতে হবে। তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনই গণতন্ত্রের চূড়ান্ত পরীক্ষা নয়। বরং এটি বৃহত্তর একটি যাত্রার ছোট্ট অধ্যায়। আসল পরীক্ষা হবে আগামী দিনগুলোতে। সংসদ কতটা কার্যকর হয়, বিরোধী দল কতটা স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারে, গণমাধ্যম কতটা মুক্ত থাকে, প্রশাসন কতটা দলনিরপেক্ষ হয়, বিচার বিভাগ কতটা স্বাধীন থাকে এবং পরবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল নিজের জন্য কী ধরনের প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করে—এসব প্রশ্নের উত্তরই বলে দেবে বাংলাদেশ আসলে কতদূর এগোল।

বাংলাদেশের মানুষ আর শুধু সরকার বদল দেখতে চায় না; তারা রাষ্ট্রের আচরণ বদল দেখতে চায়। তারা এমন একটি রাষ্ট্র চায়, যেখানে ক্ষমতাসীনকে প্রশ্ন করা অপরাধ নয়, যেখানে বিরোধী মত দেশদ্রোহিতা নয়, যেখানে সাংবাদিক সত্য প্রকাশের জন্য আতঙ্কিত হবেন না, যেখানে প্রশাসন দলীয় পরিচয়ে নয়—যোগ্যতায় পরিচালিত হবে, যেখানে নির্বাচন মানে শুধু ভোটের দিন নয়, বরং পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা।

মির্জা ফখরুলের জীবনের দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা তাঁকে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে এনে দাঁড় করিয়েছে। শিক্ষকতা থেকে পৌর রাজনীতি, সংসদ ও মন্ত্রিত্ব পেরিয়ে দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতি—সবশেষে যদি বঙ্গভবনে তাঁর যাত্রা সম্পন্ন হয়, তাহলে এটি নিঃসন্দেহে ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প হবে। কিন্তু ইতিহাস তাঁকে কেবল সেই সাফল্যের জন্য মনে রাখবে না। ইতিহাস জানতে চাইবে—তিনি কি দলীয় রাজনীতির সীমা অতিক্রম করে রাষ্ট্রের অভিভাবক হতে পেরেছিলেন?

আর অলি আহমদের প্রার্থিতাও ইতিহাসে কেবল একটি পরাজিত প্রার্থিতার ঘটনা হিসেবে থেকে যাবে না, যদি তা সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভিন্নমত ও রাজনৈতিক বহুত্ববাদের জায়গা আরও শক্তিশালী করে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি মির্জা ফখরুল বনাম অলি আহমদ নয়। প্রশ্নটি বিএনপি বনাম জামায়াতও নয়। প্রশ্নটি আরও বড়—বাংলাদেশের রাষ্ট্র কি আবারও কোনো একটি দলের রাষ্ট্র হয়ে উঠবে, নাকি সব দলের ঊর্ধ্বে উঠে নাগরিকের রাষ্ট্র হয়ে উঠবে?

রাষ্ট্রপতির চেয়ার যতটা উঁচু, তার চেয়েও উঁচু হওয়া উচিত সেই চেয়ারে বসা মানুষের সাংবিধানিক বিবেক। আর ক্ষমতাসীন দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা যত বড়ই হোক, তার চেয়েও বড় হওয়া উচিত গণতন্ত্রের প্রতি তার দায়বদ্ধতা।

বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে তখনই, যখন ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে ক্ষমতার সংস্কৃতিও বদলাবে। যদি মির্জা ফখরুল দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সব নাগরিকের রাষ্ট্রপতি হতে পারেন, যদি বিএনপি বিরোধী মতকে প্রতিপক্ষ নয়—গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করে, আর বিরোধী দলগুলোও দায়িত্বশীল বিকল্প শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে, তাহলে বাংলাদেশের গণতন্ত্র সত্যিই সামনে এগোবে। নইলে রাষ্ট্রপতির মুখ বদলাবে, সরকার বদলাবে, সংসদের আসনবিন্যাস বদলাবে—কিন্তু রাষ্ট্রের পুরোনো চরিত্র বদলাবে না।

ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশের প্রয়োজন আরেকজন শক্তিশালী শাসক নয়; প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। প্রয়োজন এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে ক্ষমতায় থাকা মানে সবকিছু নিয়ন্ত্রণের অধিকার নয় এবং বিরোধী দলে থাকা মানে সবকিছুর বিরোধিতা করা নয়। প্রয়োজন এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে রাষ্ট্রপতি হবেন সংবিধানের কাছে দায়বদ্ধ, সরকার থাকবে জনগণের কাছে জবাবদিহির মধ্যে এবং বিরোধী দল থাকবে বিকল্প রাষ্ট্রচিন্তার ধারক হিসেবে।

মির্জা ফখরুলের সামনে তাই পদ নয়, একটি পরীক্ষা। জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের সামনে প্রার্থী দেওয়া নয়, একটি পরীক্ষার শুরু। আর বাংলাদেশের সামনে—ক্ষমতার পুরোনো বৃত্ত ভেঙে সত্যিকারের গণতন্ত্রে প্রবেশের পরীক্ষা।

এই পরীক্ষায় কে কত ভোট পেল, সেটি ইতিহাসের একটি ছোট তথ্য হয়ে থাকবে। কিন্তু কে কতটা গণতন্ত্রকে সহ্য করতে পারল, কতটা প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন থাকতে দিল এবং ক্ষমতা হারানোর সম্ভাবনাকেও কতটা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারলো—সেটিই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ

[email protected]

এইচআর/এমএফএ/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow