রাষ্ট্রের দায় ও নাগরিকের অধিকার : সামাজিক সুরক্ষার পথে বাংলাদেশ

একটি রাষ্ট্র কতটা সভ্য, তা বোঝা যায় সে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকটির সঙ্গে কেমন আচরণ করে। যে মানুষটি কাজ হারিয়ে পথে দাঁড়িয়েছে, যে বৃদ্ধ অবসরের পর রোজগার নেই, যে মা সন্তান নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন— তাদের পাশে রাষ্ট্র আছে কি নেই, সেটাই একটি দেশের মানবিক পরিচয় নির্ধারণ করে।  এই মানবিক দায়বদ্ধতাকে কাঠামোগত রূপ দেওয়ার নামই হলো সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা বলতে বোঝায় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নাগরিকদের জন্য সেসব কর্মসূচি ও নীতি, যেগুলো মানুষকে দারিদ্র্য, রোগ, বেকারত্ব, বার্ধক্য ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে একটি মৌলিক নিরাপত্তার জাল দেয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞা অনুযায়ী, সামাজিক সুরক্ষা হলো এমন একটি অধিকার যা প্রতিটি  মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা দেয়। এটি কোনো দান বা অনুগ্রহ নয়, এটি নাগরিকের ন্যায্য পাওনা। রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের দিক থেকে দেখলে, সামাজিক সুরক্ষা হলো একটি সামাজিক চুক্তির ভিত্তি। নাগরিক কর দেন, শ্রম দেন, রাষ্ট্রের আইন মেনে চলেন — বিনিময়ে রাষ্ট্র তাদের ন্যূনতম জীবনমান নিশ্চিত করার দায়িত্ব নেয়। এই

রাষ্ট্রের দায় ও নাগরিকের অধিকার : সামাজিক সুরক্ষার পথে বাংলাদেশ

একটি রাষ্ট্র কতটা সভ্য, তা বোঝা যায় সে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকটির সঙ্গে কেমন আচরণ করে। যে মানুষটি কাজ হারিয়ে পথে দাঁড়িয়েছে, যে বৃদ্ধ অবসরের পর রোজগার নেই, যে মা সন্তান নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন— তাদের পাশে রাষ্ট্র আছে কি নেই, সেটাই একটি দেশের মানবিক পরিচয় নির্ধারণ করে। 

এই মানবিক দায়বদ্ধতাকে কাঠামোগত রূপ দেওয়ার নামই হলো সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা।

সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা বলতে বোঝায় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নাগরিকদের জন্য সেসব কর্মসূচি ও নীতি, যেগুলো মানুষকে দারিদ্র্য, রোগ, বেকারত্ব, বার্ধক্য ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে একটি মৌলিক নিরাপত্তার জাল দেয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞা অনুযায়ী, সামাজিক সুরক্ষা হলো এমন একটি অধিকার যা প্রতিটি 

মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা দেয়। এটি কোনো দান বা অনুগ্রহ নয়, এটি নাগরিকের ন্যায্য পাওনা।

রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের দিক থেকে দেখলে, সামাজিক সুরক্ষা হলো একটি সামাজিক চুক্তির ভিত্তি। নাগরিক কর দেন, শ্রম দেন, রাষ্ট্রের আইন মেনে চলেন — বিনিময়ে রাষ্ট্র তাদের ন্যূনতম জীবনমান নিশ্চিত করার দায়িত্ব নেয়। এই সম্পর্ক যখন টেকসই হয়, তখনই একটি সমাজ প্রকৃত অর্থে স্থিতিশীল হয়ে ওঠে।

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এই ব্যবস্থার গুরুত্ব বহুমাত্রিক। দরিদ্র মানুষের জন্য এটি খাদ্য ও আশ্রয়ের নিশ্চয়তা। নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য এটি স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার দরজা খুলে দেয়। মধ্যবিত্তের জন্য এটি হঠাৎ বিপদে পড়লে রক্ষাকবচ। বেকারের জন্য এটি নতুন পথ খোঁজার সময় ও সুযোগ। অসুস্থ মানুষের জন্য এটি চিকিৎসার সামর্থ্য। আর প্রবীণদের জন্য এটি কর্মজীবন শেষেও মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার অবলম্বন।

ইউরোপ ও পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলো বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে যে মডেল গড়ে তুলেছে, তাকে বলা হয় কল্যাণ রাষ্ট্র বা Welfare State। এই মডেলের কেন্দ্রে আছে একটি সহজ ধারণা: ধনীরা বেশি কর দেবে, সেই অর্থ দিয়ে দুর্বলদের সুরক্ষা দেওয়া হবে।

প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা বা Progressive Taxation এই কাঠামোর মেরুদণ্ড। যার আয় বেশি, তার কর হার বেশি। এই নীতিতে জার্মানিতে উচ্চ আয়ে কর হার ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে (এই তথ্য OECD-র প্রতিবেদনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তবে নির্দিষ্ট হার বাহ্যিকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন)। এই করের অর্থ সরাসরি সামাজিক সুরক্ষা তহবিলে যায়।

বেকার ভাতা পশ্চিমা দেশে এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে কেউ চাকরি হারালে রাষ্ট্র তাকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আয়ের একটি অংশ দেয়, যাতে সে নতুন কাজ খোঁজার সুযোগ পায়। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে এই সুবিধা কখনো কখনো পূর্ববর্তী বেতনের ৬০-৮০ শতাংশ পর্যন্ত হয় — তবে এই হার দেশ ও নীতি অনুযায়ী ভিন্ন হওয়ায় নির্দিষ্ট সংখ্যা যাচাই ছাড়া উপস্থাপন করা ঠিক নয়।

সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কল্যাণ রাষ্ট্রের আরেকটি মূল স্তম্ভ। যুক্তরাজ্যের National Health Service (NHS) বা কানাডার সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা এমন মডেল যেখানে মৌলিক চিকিৎসার জন্য নাগরিককে নিজের পকেট থেকে বড় অঙ্ক খরচ করতে হয় না।

পেনশন ব্যবস্থা  প্রবীণ নাগরিকদের জন্য মাসিক আয় নিশ্চিত করে। অনেক ইউরোপীয় দেশে কর্মজীবনে অবদানের ভিত্তিতে অবসরের পর একটি সম্মানজনক আয় পাওয়া যায়। আবাসন সহায়তা  নিম্ন আয়ের পরিবারকে বাড়ি ভাড়া বহনে সহায়তা করে। খাদ্য ও পরিবারভিত্তিক ভাতা শিশু এবং পরিবারের খরচ মেটাতে রাষ্ট্রীয় সহায়তা দেয়। শিক্ষা সহায়তা নিশ্চিত করে যে একটি শিশুর পরিবারের আর্থিক অবস্থা তার শিক্ষার পথে বাধা না হয়।

নর্ডিক মডেল— সুইডেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড — পৃথিবীর সবচেয়ে সফল কল্যাণ রাষ্ট্রের উদাহরণ। OECD-র তথ্য অনুযায়ী এই দেশগুলো সামাজিক ব্যয়ে GDP-র উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় করে এবং একই সঙ্গে উচ্চ মানব উন্নয়ন সূচক বজায় রাখে। তবে এই মডেল পুনরুৎপাদনযোগ্য কিনা, বিশেষত ভিন্ন ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক কাঠামোর দেশগুলোতে, সে বিষয়ে বিভিন্ন গবেষণায় ভিন্ন মত পাওয়া যায়।

ফ্রান্স ইউরোপের অন্যতম বিস্তৃত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার দেশ। এখানকার ব্যবস্থাটি বোঝার জন্য কয়েকটি মূল উপাদান জানা দরকার।

CAF বা Caisse d'Allocations Familiales হলো পারিবারিক ভাতার তহবিল। শিশু ভাতা থেকে শুরু করে আবাসন সহায়তা, প্রতিবন্ধী ভাতা পর্যন্ত বহু ধরনের সুবিধা এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেওয়া হয়। CAF আবেদনকারীর আয় যাচাই করে সহায়তার পরিমাণ নির্ধারণ করে।

RSA বা Revenu de Solidarité Active হলো ন্যূনতম আয় সহায়তা কর্মসূচি। যাদের আয় একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে, তারা এই ভাতা পান। এটি কেবল অর্থ দেয় না, বরং কর্মসংস্থান খুঁজে নিতেও সহায়তা করে। এটি নির্ভরতার সংস্কৃতি তৈরি করে কিনা — এই প্রশ্ন নিয়ে ফ্রান্সে নিজেও বিতর্ক আছে, তাই বিষয়টি সরল নয়।

Assurance Maladie হলো সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থা। ডাক্তার দেখানো, ওষুধ, হাসপাতাল — সবকিছুর একটি বড় অংশ রাষ্ট্র বহন করে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য CMU-C বা এর উত্তরসূরি ব্যবস্থার মাধ্যমে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ রয়েছে।

Logement Aid বা আবাসন সহায়তা, বিশেষত APL, ভাড়াটেদের মাসিক ভাড়ার একটি অংশ সরাসরি বাড়িওয়ালার কাছে পাঠিয়ে দেয়। এতে নিম্ন আয়ের পরিবার তুলনামূলক ভালো আবাসনে থাকতে পারে।

বেকার সহায়তা বা France Travail -এর মাধ্যমে কর্মহীন মানুষ ভাতা পান এবং নতুন কাজ খোঁজার প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ পান। এই ব্যবস্থা কতটা কার্যকর তা নিয়ে ফ্রান্সে পর্যায়ক্রমে সংস্কার হচ্ছে — অর্থাৎ কোনো ব্যবস্থাই নিখুঁত নয়, এটি মনে রাখা জরুরি।

Progressive Taxation ফ্রান্সে বেশ তীব্র। উচ্চ আয়ের উপর উচ্চ হারে কর বসিয়ে সেই অর্থ এই সামাজিক তহবিলে সংগ্রহ করা হয়। বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে এই কর ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে — যদিও বাস্তবে কর ফাঁকি ও ধনীদের কর এড়ানোর প্রবণতা একটি বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে রয়ে যায়।

সব মিলিয়ে ফ্রান্সের এই ব্যবস্থা সামাজিক বৈষম্য কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে প্রমাণ আছে — তবে ফ্রান্সের মতো একটি উচ্চ আয়ের দেশের কর ভিত্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ছাড়া এই মডেল হুবহু কোথাও অনুলিপি করা সম্ভব নয়।

সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা কেবল দরিদ্রদের সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় — এর প্রভাব সমগ্র সমাজে এবং অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।

দারিদ্র্য হ্রাস  সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব। বিশ্বব্যাংকের গবেষণা নির্দেশ করে যে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো দারিদ্র্য হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রাখে — তবে কার্যকারিতা কর্মসূচির নকশা ও বাস্তবায়নের মানের উপর নির্ভর করে।

সামাজিক স্থিতিশীলতা একটি গুরুত্বপূর্ণ পরোক্ষ ফল। মানুষ যখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে, তখন হতাশা, ক্ষোভ এবং সামাজিক অস্থিরতা বাড়ে। সুরক্ষা নেটওয়ার্ক এই ধাক্কা সামলাতে সাহায্য করে।

অপরাধ হ্রাস নিয়ে একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে যে দারিদ্র্য ও বৈষম্য অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত, তবে কারণ-ফলাফলের সম্পর্ক জটিল এবং এ বিষয়ে গবেষণায় ভিন্নমত রয়েছে।

ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধি  অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ। নিম্ন আয়ের মানুষ ভাতা পেলে তা সঞ্চয় না করে খরচ করেন, ফলে স্থানীয় বাজারে চাহিদা বাড়ে। IMF-এর বিভিন্ন গবেষণায় এই multiplier effect-এর প্রমাণ রয়েছে।

মানবিক মর্যাদা রক্ষা এই পুরো ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তি। মানুষ যখন ক্ষুধার্ত থেকে কাজে যায়, সন্তানের চিকিৎসার অর্থ নেই বলে চুপ থাকে, অথবা বৃদ্ধ বয়সে ভিক্ষার থলে হাতে নেয় — তখন রাষ্ট্র হিসেবে আমরা ব্যর্থ।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় প্রবেশাধিকার দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাব ফেলে। UNDP-র Human Development Index-এর তথ্য বারবার দেখিয়েছে যে স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বিনিয়োগ একটি জাতির উৎপাদনশীলতা বাড়ায়।

রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা তৈরি হওয়া একটি সামাজিক মূলধন। মানুষ যখন দেখে রাষ্ট্র তাদের পাশে আছে, তখন আইন মানার প্রবণতা, কর দেওয়ার প্রস্তুতি এবং নাগরিক অংশগ্রহণ বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয় কারণ মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা নিশ্চিত থাকলে দীর্ঘমেয়াদী সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

বাংলাদেশে সামাজিক সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা বিশেষ কারণে তীব্র। দেশের জনগণের একটি বড় অংশ এখনো প্রতিদিনকার জীবনে নানা ধরনের ঝুঁকির মুখে থাকেন।

দ্রব্যমূল্যের চাপ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। মূল্যস্ফীতি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)-র তথ্য অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে — তবে সুনির্দিষ্ট সাম্প্রতিক সংখ্যা এই লেখা রচনার সময় যাচাই ছাড়া উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।

বেকারত্ব, বিশেষত তরুণ বেকারত্ব, একটি কাঠামোগত সমস্যা। উচ্চশিক্ষিত তরুণ কাজ পাচ্ছেন না, অথচ শ্রমের বাজারে অদক্ষ শ্রমিকের ঘাটতিও আছে — এই দ্বন্দ্ব দেশের দক্ষতা উন্নয়নের সমস্যাকে স্পষ্ট করে।

অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি বাংলাদেশের এক বিশাল বাস্তবতা। ILO-র হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে কর্মজীবী মানুষের অধিকাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যেখানে কোনো চুক্তি নেই, কোনো সামাজিক বিমা নেই, কাজ হারালে কোনো সুরক্ষা নেই। এই মানুষেরা রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার বাইরে থাকেন।

নিম্ন ও মধ্যবিত্তের অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বাস্তবতা। মধ্যবিত্ত মানুষ যথেষ্ট পরিমাণে সঞ্চয় করতে পারেন না, অথচ দরিদ্রদের জন্য যে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আছে তার আওতায়ও পড়েন না। এই মধ্যবর্তী স্তরটি বিপদে পড়লে প্রায়ই নিঃস্ব হয়ে যায়।

জলবায়ু ঝুঁকি বাংলাদেশের জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস মানুষকে বারবার শূন্য থেকে শুরু করতে বাধ্য করে। একটি শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এই প্রাকৃতিক ধাক্কা সামলাতে অপরিহার্য।

নগরায়ন দ্রুত হচ্ছে, কিন্তু শহরে আসা মানুষদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসন, স্বাস্থ্য ও সামাজিক কাঠামো নেই। আয় বৈষম্য নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়, তবে বৈষম্য বাড়ছে বলে ব্যাপক পর্যবেক্ষণ রয়েছে।

বর্তমান সরকারের উদ্যোগ

সম্ভাবনার পথে সতর্ক পদক্ষেপ সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণে বর্তমান সরকারের আগ্রহ সময়োচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (BNP)-নেতৃত্বাধীন সরকার ইতোমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড চালু করেছে, যার মাধ্যমে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো ভর্তুকি মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পেতে পারে। দ্রব্যমূল্যের চাপের প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপ একটি সরাসরি ও বাস্তবমুখী সাড়া।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বারবার সামাজিক সুরক্ষা বিস্তৃত করার কথা বলেছেন এবং দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের কথা ভেবে নীতি প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই অঙ্গীকারকে একটি মানবিক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ হিসেবে ইতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ আছে — তবে একজন বিশ্লেষকের দায়িত্ব হলো মনে করিয়ে দেওয়া যে প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তবায়নের মধ্যে প্রায়ই বিশাল ব্যবধান থাকে।

বাংলাদেশের মতো দেশে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সুবিধাভোগী নির্বাচনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও দুর্নীতি। বারবার দেখা গেছে যে সঠিক মানুষের কাছে সুবিধা পৌঁছানোর বদলে রাজনৈতিক আনুগত্য বা স্বজনপ্রীতির ভিত্তিতে সুবিধা বিতরণ হয়। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করা সৎ বিশ্লেষণের লক্ষণ নয়।

সুতরাং সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণের উদ্যোগকে সফল করতে হলে কমপক্ষে কয়েকটি শর্ত পূরণ জরুরি।

স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে : কারা সুবিধা পাচ্ছেন, কতটুকু পাচ্ছেন, কীভাবে নির্বাচিত হচ্ছেন তা জনসমক্ষে উন্মুক্ত থাকতে হবে।

জবাবদিহিতা দরকার :  কর্মসূচির বাস্তবায়নকারীরা যদি জানেন যে তাদের কাজ পর্যালোচনা হবে, তাহলে দুর্নীতির সুযোগ কমে।

তথ্যভিত্তিক নীতি প্রয়োজন : কোন এলাকায় কতজন দরিদ্র, তাদের প্রয়োজন কী, সেই তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ ছাড়া কার্যকর নীতি হয় না।

প্রযুক্তিনির্ভর বাস্তবায়ন এই ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে সুবিধাভোগী নিবন্ধন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি অর্থ হস্তান্তর এবং বায়োমেট্রিক যাচাই মধ্যস্থতাকারী দুর্নীতি কমাতে পারে। প্রকৃত সুবিধাভোগী শনাক্তকরণ একটি কঠিন কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সম্পদ পরীক্ষা, আয় যাচাই এবং নিয়মিত পর্যালোচনা ছাড়া সীমিত সম্পদ সঠিক জায়গায় পৌঁছায় না।

ফ্যামিলি কার্ডের মতো উদ্যোগ সঠিক দিকে এগোনোর একটি পদক্ষেপ — কিন্তু এটি যাতে কেবল প্রতীকী না থেকে প্রকৃত পরিবর্তন আনে, সেজন্য এর কার্যকারিতা স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন হওয়া দরকার।

সামাজিক সুরক্ষা কোনো বামপন্থি বা ডানপন্থি ধারণা নয়। এটি মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি অনিবার্য বৈশিষ্ট্য। পৃথিবীর সফল দেশগুলো বিভিন্ন মতাদর্শ থেকে এসেছে, কিন্তু সবাই নাগরিকের মৌলিক সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে স্বীকার করেছে।

বাংলাদেশে এই মুহূর্তে সামাজিক সুরক্ষা বিস্তৃত করার একটি বাস্তব প্রয়োজনীয়তা আছে। দ্রব্যমূল্য, বেকারত্ব, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বাস্তবতায় লক্ষ লক্ষ মানুষ নিরাপত্তাহীনভাবে বাঁচছেন। তাদের কাছে রাষ্ট্রের পৌঁছানো শুধু নৈতিক দায় নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদে জাতির স্থিতিশীলতার শর্তও।

কিন্তু এই লক্ষ্য অর্জনে শুধু ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সৎ ইচ্ছা, স্বচ্ছ কাঠামো, দক্ষ বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত মূল্যায়ন ব্যবস্থা। প্রতিটি সুবিধাভোগী মানুষ রাজনৈতিক পরিচয়ের আগে একজন নাগরিক এই সত্যকে যে সরকার মনে রাখতে পারে, সে-ই ইতিহাসে সফল সামাজিক সুরক্ষার রূপকার হয়ে ওঠে।

আমাদের স্বপ্ন একটাই — এমন একটি বাংলাদেশ যেখানে কেউ অসুখে চিকিৎসা পাওয়ার টাকার অভাবে মারা যাবে না, কোনো শিশু খালি পেটে স্কুলে যাবে না, কোনো বৃদ্ধ না খেয়ে দিন কাটাবে না। সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে সামাজিক সুরক্ষাকে রাজনৈতিক ইশতেহার থেকে রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারে রূপান্তরিত করতে হবে। 

লেখক : আহমেদ সোহেল বাপ্পী, মানবাধিকার কর্মী, গবেষক ও পর্যবেক্ষক, গণতন্ত্র (সীমান্তহীন), প্যারিস, ফ্রান্স।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow