রায় প্রকাশের আগেই শপথ নিয়ে প্রশ্ন, শুনানিতে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়

চট্টগ্রাম-২ আসনে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সারোয়ার আলমগীরের বিষয়ে হাইকোর্টের রায়ের লিখিত অনুলিপি প্রকাশের আগেই গেজেট প্রকাশ ও শপথ পড়ানো নিয়ে আপিল বিভাগ প্রশ্ন তুলেছেন। আদালতে উপস্থিত একাধিক আইনজীবী জাগো নিউজকে জানিয়েছে, বিএনপি প্রার্থী সারোয়ারের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত চেয়ে করা আবেদনের শুনানি শেষে সোমবার (২৭ জুলাই) আদেশ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বেঞ্চ। ঠিক সেই সময় অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বক্তব্য উপস্থাপনের অনুমতি চান। এসময় প্রধান বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন, হাইকোর্টের রায়ের লিখিত অনুলিপি প্রকাশের আগেই কীভাবে নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করলো এবং শপথের ব্যবস্থা হলো? জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতকে জানান, বিষয়টি নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে কথা হয়েছে। সিইসিকে বলেছেন, আদালতের রুল বা নির্দেশনার ভিত্তিতে যেভাবে অনেক সময় অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য দেখেই নির্বাচন কমিশন প্রতীক বরাদ্দ দেয়, একইভাবে এ ক্ষেত্রেও ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এই ব্যাখ্যায় অসন্তুষ্ট হন প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন, পরিস

রায় প্রকাশের আগেই শপথ নিয়ে প্রশ্ন, শুনানিতে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়

চট্টগ্রাম-২ আসনে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সারোয়ার আলমগীরের বিষয়ে হাইকোর্টের রায়ের লিখিত অনুলিপি প্রকাশের আগেই গেজেট প্রকাশ ও শপথ পড়ানো নিয়ে আপিল বিভাগ প্রশ্ন তুলেছেন।

আদালতে উপস্থিত একাধিক আইনজীবী জাগো নিউজকে জানিয়েছে, বিএনপি প্রার্থী সারোয়ারের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত চেয়ে করা আবেদনের শুনানি শেষে সোমবার (২৭ জুলাই) আদেশ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বেঞ্চ। ঠিক সেই সময় অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বক্তব্য উপস্থাপনের অনুমতি চান।

এসময় প্রধান বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন, হাইকোর্টের রায়ের লিখিত অনুলিপি প্রকাশের আগেই কীভাবে নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করলো এবং শপথের ব্যবস্থা হলো?

জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতকে জানান, বিষয়টি নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে কথা হয়েছে। সিইসিকে বলেছেন, আদালতের রুল বা নির্দেশনার ভিত্তিতে যেভাবে অনেক সময় অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য দেখেই নির্বাচন কমিশন প্রতীক বরাদ্দ দেয়, একইভাবে এ ক্ষেত্রেও ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

এই ব্যাখ্যায় অসন্তুষ্ট হন প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন, পরিস্থিতি এমন না। নির্বাচন কমিশন যদি একটি ভুল করে থাকে, তবে সেই ভুলের ধারাবাহিকতা চলতে পারে না।

আপিল বিভাগ মন্তব্য করেন, আদালতের আদেশ লিখিতভাবে প্রকাশের আগে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, অথচ আদেশ পরিবর্তিতও হতে পারতো। দ্রুততার প্রয়োজন থাকলে আদালতের কাছে রায় দ্রুত প্রকাশের আবেদন করা যেত, কিন্তু তা না করে আগেভাগেই প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আপনারা যদি একটি পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার জন্য আদেশ দেন, তাহলে তো কিছু করার নেই।’

এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘এটা কী বললেন আপনি? একপক্ষকে সুবিধা দেওয়া বলতে আপনি কী বোঝাতে চাচ্ছেন? আমরা কীভাবে একপক্ষকে সুবিধা দেবো? আদালতের আদেশ আপনার পছন্দ না হলেও আপনি তা মানতে বাধ্য।’

তিনি আরও বলেন, ‘আপনি দেশের অ্যাটর্নি জেনারেল হয়ে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতিকে এ কথা কীভাবে বললেন? টেক ইওর সিট। প্লিজ, টেক ইওর সিট। ডোন্ট সে লাইক দিস। উই ডোন্ট লাইক ইট।’

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এসময় আদালতকক্ষে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। প্রধান বিচারপতি একাধিকবার অ্যাটর্নি জেনারেলকে আসনে বসতে বলেন এবং একপর্যায়ে মন্তব্য করেন, ‘আপনি বসেন, আপনার কথা আর শুনব না।’

জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আমার কথা শুনবেন না, কিন্তু আমার তো কথা আছে।’ প্রধান বিচারপতি তখন বলেন, ‘আপনি সারাদিন বলবেন না কি? আপনার কথা কি আমরা সারাদিন শুনব?’

তখন পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন সারোয়ারের আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। তিনি অ্যাটর্নি জেনারেলকে আসনে বসার অনুরোধ জানান।

আদালতে সারোয়ারের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন মাহবুব উদ্দিন ছাড়াও আইনজীবী আহসানুল করিম। আবেদনকারী মুহাম্মদ নুরুল আমীনের পক্ষে ছিলেন মোহাম্মদ শিশির মনির ও আজিম উদ্দিন পাটোয়ারী।

মামলার নথি অনুযায়ী, রিটার্নিং কর্মকর্তা নির্বাচনে সারোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করার পর ঋণ খেলাপির অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনে আপিল করেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নুরুল আমীন। শুনানি শেষে গত ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন সারোয়ার আলমগীরের মনোনয়ন বাতিল করে।

ওই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন সারোয়ার। গত ২৭ জানুয়ারি হাইকোর্ট নির্বাচন কমিশনের আদেশ স্থগিত করে তাকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়ে রুল জারি করেন। এরপর নুরুল আমীন আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করলে ৩ ফেব্রুয়ারি আদালত লিভ মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে সারোয়ারকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলেও আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তার নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সারোয়ার বেসরকারিভাবে বিজয়ী হন। আদালতের নির্দেশনার কারণে ওই সময় তার ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি। পরে আপিলের শুনানি শেষে ১৬ জুন আপিল বিভাগ হাইকোর্টকে যত দ্রুত সম্ভব, সম্ভাব্য দুই সপ্তাহের মধ্যে রুল নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ৩ ফেব্রুয়ারির অন্তর্বর্তী আদেশ রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বহাল রাখা হয়।

গত ৯ জুলাই হাইকোর্ট রুল যথাযথ ঘোষণা করে সারোয়ারের প্রার্থিতা বৈধ বলে রায় দেন। এই রায়ের পর ওই দিন গেজেট প্রকাশের পাশাপাশি সন্ধ্যায় সারোয়ারকে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ পড়ানো হয়। হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত চেয়ে ১৩ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় আবেদন করেন নুরুল আমীন।

আবেদনে বলা হয়, রায়ের লিখিত অনুলিপি প্রকাশের আগেই নির্বাচন কমিশন সারোয়ারকে সংসদ সদস্য হিসেবে গেজেট প্রকাশ করে এবং তাকে শপথ পড়ানো হয়। তাই আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সারোয়ারের সংসদীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয় আবেদনে।

সোমবার সেই আবেদনের শুনানি শেষে আপিল বিভাগ মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) আদেশ ঘোষণার জন্য দিন ধার্য করেছে।

এফএইচ/একিউএফ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow