লাশ নিতে এসে বাবার আহাজারি, ‘আমার ছেলেরে আর মুফতি বানানো হইলো না’
মাজার জিয়ারত, পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখা আর প্রিয়জনদের কাছে ফেরার প্রস্তুতি- সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক। কেউ এসেছিলেন পাঁচ বন্ধুর সঙ্গে, কেউ মাদ্রাসায় যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু শুক্রবার (৭ আগস্ট) সকালে একটি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই বদলে দিল তাদের জীবনের সব হিসাব।
আনন্দভ্রমণ শেষে বাড়ি ফেরা হলো না কিশোরগঞ্জের সাইফুল ইসলাম ও তরুণ মাদ্রাসাছাত্র আরমান হোসেন রাহিমের। একজন ফিরলেন নিথর দেহে, আর অন্যজনেরও পথেই থেমে গেল মুফতি হওয়ার স্বপ্ন।
শুক্রবার সকাল ৭টার দিকে সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার কাশিকাপন এলাকায় ঢাকাগামী ইউনিক পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে ঢাকা থেকে সিলেটগামী বেঙ্গল স্লিপার কোচের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় ইউনিক পরিবহনের ৯ যাত্রী নিহত হন। আহত হন আরও অনেকে।
এদিকে, কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের সাইফুল ইসলামসহ পাঁচ বন্ধু মঙ্গলবার রাতে সিলেটে আসেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন কুলিয়ারচর পৌরসভার ধন মিয়ার ছেলে ও পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. লতিফ, থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ফাখরুল ইসলাম ফারুক, রানা মিয়া ও জমরেদ মিয়া।
তারা হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন এবং পরদিন ভো
মাজার জিয়ারত, পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখা আর প্রিয়জনদের কাছে ফেরার প্রস্তুতি- সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক। কেউ এসেছিলেন পাঁচ বন্ধুর সঙ্গে, কেউ মাদ্রাসায় যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু শুক্রবার (৭ আগস্ট) সকালে একটি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই বদলে দিল তাদের জীবনের সব হিসাব।
আনন্দভ্রমণ শেষে বাড়ি ফেরা হলো না কিশোরগঞ্জের সাইফুল ইসলাম ও তরুণ মাদ্রাসাছাত্র আরমান হোসেন রাহিমের। একজন ফিরলেন নিথর দেহে, আর অন্যজনেরও পথেই থেমে গেল মুফতি হওয়ার স্বপ্ন।
শুক্রবার সকাল ৭টার দিকে সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার কাশিকাপন এলাকায় ঢাকাগামী ইউনিক পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে ঢাকা থেকে সিলেটগামী বেঙ্গল স্লিপার কোচের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় ইউনিক পরিবহনের ৯ যাত্রী নিহত হন। আহত হন আরও অনেকে।
এদিকে, কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের সাইফুল ইসলামসহ পাঁচ বন্ধু মঙ্গলবার রাতে সিলেটে আসেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন কুলিয়ারচর পৌরসভার ধন মিয়ার ছেলে ও পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. লতিফ, থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ফাখরুল ইসলাম ফারুক, রানা মিয়া ও জমরেদ মিয়া।
তারা হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন এবং পরদিন ভোলাগঞ্জের সাদাপাথরসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখেন। সাইফুলের এক আত্মীয়ের বিয়েতে যোগ দিতে বৃহস্পতিবার রাতেই বাড়ি ফেরার কথা ছিল তাদের। প্রথমে ট্রেনে ফেরার পরিকল্পনা থাকলেও পরে বাসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। শাহপরান মাজার গেট এলাকা থেকে সকালের ইউনিক পরিবহনের টিকিট কাটেন তারা।
পাঁচ বন্ধুর মধ্যে রানা ও জমরেদ বিমানযোগে চলে যান। আর সাইফুল, ফাখরুল ইসলাম ফারুক ও মো. লতিফ ইউনিক পরিবহনের বাসে সিলেটের হুমায়ুন চত্বর থেকে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন। কিন্তু সেই যাত্রাই হয়ে ওঠে সাইফুলের জীবনের শেষ যাত্রা।
নিহত সাইফুলের বন্ধু মো. লতিফ জানান, বাসে তাদের তিনজন ছাড়াও প্রায় ৩৬ জন যাত্রী ছিলেন। বাসটি স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। সকাল ৭টা ১০ মিনিটের দিকে হঠাৎ বিকট শব্দ শুনতে পান তারা। এরপর দেখেন, বাসটি রাস্তা থেকে ছিটকে জমিতে পড়ে গেছে। লতিফের চোখের সামনে তখন পড়ে ছিল বন্ধু সাইফুলের নিথর দেহ। তার কপালের বেশ কিছু অংশ কেটে গিয়েছিল। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান সাইফুল। একই দুর্ঘটনায় আহত হন ফাখরুল ইসলাম ফারুক। তবে তুলনামূলকভাবে গুরুতর আঘাত থেকে বেঁচে যান লতিফ।
‘আমার ছেলে নাই, দুনিয়া ছাড়িয়া চলে গেছে’
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে শুক্রবার দুপুরে শেরপুর হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে ছেলের লাশ নিতে আসেন আরমান হোসেন রাহিমের (১৯) বাবা রফিকুল ইসলাম। পেশায় রডমিস্ত্রি রফিকুল তখন আর নিজেকে সামলাতে পারছিলেন না।
কারও সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘কে বলছেন? আমার ছেলে নাই! দুনিয়া ছাড়িয়া চলিয়া গেছে, আল্লাহ নিয়া গেছে। এটা কইয়ে দিয়েন। মসজিদের ইমাম সাহেবকে বলিয়েন। সকালে প্যান্ট-শার্ট পড়ে বের হইছিল, আর আমার ছেলে নাই। লাশ পাইছি।’
এরপর হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেরে আর মুফতি বানানো হইলো না।’
বাবা রফিকুল ইসলামের আহাজারিতে শেরপুর হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। তাকে সান্ত্বনা দেন ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনমুন নাহার আশা।
মুফতি হওয়ার স্বপ্নও থেমে গেল
নিহত আরমান হোসেন রাহিমের বয়স মাত্র ১৯ বছর। সিলেটের শাহপরান জামেয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসা থেকে হাফিজি সম্পন্ন করেছিলেন তিনি। এরপর ডেমরার নরাইবাগ ইসলামিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেখানে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই শুক্রবার সকালে ইউনিক পরিবহনের বাসে রওনা দিয়েছিলেন রাহিম।
সকালে প্যান্ট-শার্ট পরে মাদ্রাসার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু গন্তব্যে আর পৌঁছানো হয়নি। পথেই ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান এই তরুণ। যে ছেলেকে মুফতি বানানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন বাবা, সেই ছেলেকেই শেষ পর্যন্ত লাশ হয়ে ফিরে পেতে হলো তাকে।
সাইফুলের লাশ নিলেন ভাই, রাহিমের লাশও পরিবারের কাছে
সাইফুলের মৃত্যুর খবর পেয়ে তার ভাই মাহাজেরুল ইসলাম শেরপুর হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে ছুটে আসেন। শুক্রবার দুপুরে নিহত বন্ধুর লাশ নিতে এসে দুর্ঘটনার বর্ণনা দেন মো. লতিফও। আইনি প্রক্রিয়া শেষে পুলিশের পক্ষ থেকে সাইফুলের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
নিহত সাইফুল ইসলাম কুলিয়ারচর উপজেলার ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি ছিলেন। তার মৃত্যুতে স্বজন ও পরিচিতজনদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
অন্যদিকে আইনি প্রক্রিয়া শেষে ময়নাতদন্ত ছাড়াই রাহিমের মরদেহও পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। জেলা প্রশাসনের নির্দেশে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাহিমের দাফনের জন্য তার পরিবারকে নগদ ২০ হাজার টাকা সহায়তা দেন ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনমুন নাহার আশা।