শহরের প্রবেশমুখে ৩০ বছরের বিষাক্ত ভাগাড়

ময়মনসিংহ নগরীর প্রাণকেন্দ্রের খুব কাছেই চর কালীবাড়ি। একসময় আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত এই জনপদ এখন পরিচিতি পেয়েছে অন্য এক নামে, ‘ময়লাকান্দা’। প্রায় তিন দশক ধরে নগরীর হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ঝুঁকিপূর্ণ মেডিকেল বর্জ্য এবং সিটি করপোরেশনের হাজার হাজার টন গৃহস্থালি আবর্জনা এখানে ফেলা হচ্ছে। ফলে এলাকাটি এখন পরিণত হয়েছে স্থায়ী ভাগাড়ে, যেখানে প্রতিদিনই বাড়ছে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি। সরেজমিনে দেখা যায়, শেরপুর, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ থেকে ময়মনসিংহ শহরে প্রবেশের অন্যতম প্রধান সড়কের পাশজুড়ে বিশাল এলাকা দখল করে রয়েছে আবর্জনার স্তূপ। ট্রাক ও ভ্যানে করে দিনের বিভিন্ন সময়ে ময়লা এনে ফেলা হচ্ছে সেখানে। ময়লার স্তূপে ঘুরে বেড়াচ্ছে কুকুর, গবাদিপশু ও অসংখ্য মাছি। কিছু নারী ও শিশু জীবিকার তাগিদে সেই আবর্জনার মধ্যেই খুঁজছেন প্লাস্টিক ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী। আরও পড়ুন- ঢাকার খালে টয়লেটের লাইন, পাড়ে নাক চেপে বসবাসগুলশান-বনানী-বারিধারার ৮৫ শতাংশ বাড়ির পয়ঃবর্জ্য পড়ছে লেকেআলীকদমে অবাধে বন উজাড়, কমছে বন্যপ্রাণী পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়া তীব্র দুর্গন্ধে পথচারীদের নাক-মুখ চপে চলতে দেখা গেছে। অনেক

শহরের প্রবেশমুখে ৩০ বছরের বিষাক্ত ভাগাড়

ময়মনসিংহ নগরীর প্রাণকেন্দ্রের খুব কাছেই চর কালীবাড়ি। একসময় আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত এই জনপদ এখন পরিচিতি পেয়েছে অন্য এক নামে, ‘ময়লাকান্দা’। প্রায় তিন দশক ধরে নগরীর হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ঝুঁকিপূর্ণ মেডিকেল বর্জ্য এবং সিটি করপোরেশনের হাজার হাজার টন গৃহস্থালি আবর্জনা এখানে ফেলা হচ্ছে। ফলে এলাকাটি এখন পরিণত হয়েছে স্থায়ী ভাগাড়ে, যেখানে প্রতিদিনই বাড়ছে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি।

সরেজমিনে দেখা যায়, শেরপুর, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ থেকে ময়মনসিংহ শহরে প্রবেশের অন্যতম প্রধান সড়কের পাশজুড়ে বিশাল এলাকা দখল করে রয়েছে আবর্জনার স্তূপ। ট্রাক ও ভ্যানে করে দিনের বিভিন্ন সময়ে ময়লা এনে ফেলা হচ্ছে সেখানে। ময়লার স্তূপে ঘুরে বেড়াচ্ছে কুকুর, গবাদিপশু ও অসংখ্য মাছি। কিছু নারী ও শিশু জীবিকার তাগিদে সেই আবর্জনার মধ্যেই খুঁজছেন প্লাস্টিক ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী।

আরও পড়ুন-
ঢাকার খালে টয়লেটের লাইন, পাড়ে নাক চেপে বসবাস
গুলশান-বনানী-বারিধারার ৮৫ শতাংশ বাড়ির পয়ঃবর্জ্য পড়ছে লেকে
আলীকদমে অবাধে বন উজাড়, কমছে বন্যপ্রাণী

পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়া তীব্র দুর্গন্ধে পথচারীদের নাক-মুখ চপে চলতে দেখা গেছে। অনেক যানবাহনের চালকও দ্রুত এলাকা অতিক্রম করার চেষ্টা করেন। স্থানীয়দের ভাষায়, গরম ও বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

‘ময়লার গন্ধে ঘরের দরজা-জানালা খুলে রাখা যায় না। খাওয়া-দাওয়া, ঘুম, সবকিছুই দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বাচ্চারা প্রায়ই অসুস্থ থাকে। উন্নয়নের কথা অনেক শুনি, কিন্তু এই সমস্যা আজও রয়ে গেছে।’

বাসিন্দাদের অভিযোগ, শহরের প্রায় ৩০০ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বর্জ্য নিয়মিত এখানে আনা হয়। এসব বর্জ্যের মধ্যে থাকে ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, রক্তমাখা ব্যান্ডেজ, স্যালাইনের পাইপসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ উপকরণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেগুলো খোলা অবস্থায় পড়ে থাকে।

শহরের প্রবেশমুখে ৩০ বছরের বিষাক্ত ভাগাড়

স্থানীয় বাসিন্দা আকরাম হোসেন বলেন, ‘দুর্গন্ধ এখন আমাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে গেছে। শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে জ্বর, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টের সমস্যা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। বছরের পর বছর ধরে এই অবস্থার মধ্যে বসবাস করছি। কিন্তু স্থায়ী কোনো সমাধান দেখতে পাইনি।’

একই অভিযোগ করেন গৃহিণী হাফেজা খাতুন। তিনি বলেন, ‘ময়লার গন্ধে ঘরের দরজা-জানালা খুলে রাখা যায় না। খাওয়া-দাওয়া, ঘুম, সবকিছুই দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বাচ্চারা প্রায়ই অসুস্থ থাকে। উন্নয়নের কথা অনেক শুনি, কিন্তু এই সমস্যা আজও রয়ে গেছে।’

‘স্কুলে যাওয়া-আসার সময় ময়লার দুর্গন্ধে প্রায়ই তার বমি বমি ভাব হয়। অনেক সময় মাথাব্যথা নিয়ে ক্লাস করতে হয়। এতে পড়াশোনাতেও প্রভাব পড়ছে।’

শুধু বড়রাই নয়, দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে শিশুদেরও। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া বিনতে সামাদ জানায়, স্কুলে যাওয়া-আসার সময় ময়লার দুর্গন্ধে প্রায়ই তার বমি বমি ভাব হয়। অনেক সময় মাথাব্যথা নিয়ে ক্লাস করতে হয়। এতে পড়াশোনাতেও প্রভাব পড়ছে।

পরিবেশবিদদের মতে, মেডিকেল বর্জ্য দীর্ঘদিন উন্মুক্ত স্থানে ফেলে রাখার কারণে মাটি, পানি ও বাতাস একসঙ্গে দূষিত হয়। এর মাধ্যমে সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। ব্যবহৃত সিরিঞ্জ ও অন্যান্য চিকিৎসা সামগ্রী শিশু এবং বর্জ্য সংগ্রাহকদের জন্য বিশেষভাবে বিপজ্জনক।

আরও পড়ুন-
হাতিরঝিলে এখনো যত্রতত্র ময়লা, পড়ে আছে গবাদিপশুর মলমূত্রও
খাতা-কলমে নদ, বাস্তবে নর্দমা

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, হাসপাতালের বর্জ্য প্রথমে নির্ধারিত স্থানে রাখা হয়। পরে সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে তা অপসারণ করা হয়। তবে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এই সমস্যার কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়।

‘এভাবে বছরের পর বছর বর্জ্য জমতে থাকলে মিথেনসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর গ্যাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রভাব সরাসরি মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর পড়ে।’

প্রকৃতি ও জীবন ক্লাবের সভাপতি এবং পরিবেশবিদ অধ্যক্ষ লে. কর্নেল (অব.) ডা. মো. শাহাব উদ্দীন জাগো নিউজকে বলেন, বিশ্বের অনেক দেশে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করা হচ্ছে। অথচ আমরা এখনো সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে পরিবেশকে দূষিত করছি। মেডিকেল বর্জ্য কখনোই সাধারণ আবর্জনার সঙ্গে ফেলা উচিত নয়। দ্রুত আধুনিক শোধনাগার ও বৈজ্ঞানিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা জরুরি।

শহরের প্রবেশমুখে ৩০ বছরের বিষাক্ত ভাগাড়

তিনি আরও বলেন, এভাবে বছরের পর বছর বর্জ্য জমতে থাকলে মিথেনসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর গ্যাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রভাব সরাসরি মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর পড়ে।

তবে অভিযোগের বিষয়ে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন জাগো নিউজকে বলেন, কাঁচা বর্জ্য পচনের কারণেই দুর্গন্ধ সৃষ্টি হচ্ছে। বর্জ্য ফেলার পর নিয়মিত ব্লিচিং পাউডার ছিটানো হচ্ছে। পাশাপাশি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে সিটি করপোরেশন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।

এফএ/এএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow