সিলেটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। একাধিক চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি এখন নিত্যদিনের ঘটনা। নগরীর মোড়ে মোড়ে বাড়ছে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত। পাড়ায় পাড়ায় সংঘবদ্ধ হচ্ছে অপরাধী চক্র। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ করতে পারছেন না সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী। এ পর্যন্ত অপরাধ নির্মূলে তিনি যত উদ্যোগ নিয়েছেন তার ফল হয়েছে উল্টো।
গত শুক্রবার (৩ এপ্রিল) মধ্যরাতে পথশিশু হস্তান্তর নিয়ে সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করায় বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের তোপের মুখে পড়েছেন তিনি।
সিলেট নগরীর বিশিষ্টজনরা জানান, মূল কাজ ফেলে পুলিশ কমিশনার নিজের প্রচার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এ কারণে সিলেটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন হচ্ছে না। এদিকে গত প্রায় ২ মাসে ছিনতাই, অপহরণসহ নানারকম দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন কর কর্মকর্তা, সাংবাদিক, প্রবাসী ও শিক্ষার্থীরা।
গত শনিবার (৪ এপ্রিল) দিন-দুপুরে ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন বালাগঞ্জ সরকারি কলেজের প্রভাষক ও সাংবাদিক অহী আলম রেজা। শিশুপুত্রকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার সময় ছিনতাইয়ের শিকার হন তিনি।
সাংবাদিক অহী আলম রেজা বলেন, শনিবার দুপুরে সিলেট নগরীর মিরের ময়দান থেকে শিশু তৌসিফ আলম সৌম্যকে নিয়ে আম্বরখানা পয়েন্টে শাহী ঈদগাহের উদ্দেশে একটি সিএনজি অটোরিকশায় উঠেন। এসময় অটোরিকশায় সামনে একজন এবং পিছনে একজন যাত্রী ছিল। কিছুদূর যাওয়ার পর অটোরিকশা চালক আরও একজন লোক অটোরিকশায় তুলেন। গন্তব্যস্থানে যাওয়ার পূর্ব মুর্হুতে যাত্রীবেশী ছিনতাইকারীরা তার ছেলের গলায় ধারালো চাকু ধরে সাথে রক্ষিত ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়ে টিলাগড়ের দিকে পালিয়ে যায়।
এদিকে, শনিবার ভোরে ছিনতাইকারীর শিকার হয়েছেন রায়হান নামে আরেক সাংবাদিক। ভোর সোয়া ৫টার দিকে নগরীর তেমুখী ব্রিজ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। হামলার শিকার ওই সাংবাদিক আহতাবস্থায় ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। আহত সাংবাদিক দৈনিক যুগভেরীর সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার এবং সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সদস্য।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার ভোরে বাসযোগে ঢাকা থেকে সিলেটে ফিরছিলেন রায়হান উদ্দিন। নগরের টুকের বাজার এলাকায় তেমুখী ব্রিজ পার হয়ে বাস থেকে নামেন তিনি। এরপর বাসায় যাওয়ার জন্য সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশার অপেক্ষা করছিলেন।
এ সময় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় (সিলেট থ-১১-৩২১৬) তিনজন দুর্বৃত্ত এসে তাকে ধরে মারধর করে। পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে জখম করে তার কাছ থেকে নগদ টাকা ও একটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা।
এর আগে, গত ৩১ মার্চ রাতে নগরীর তালতলায় আরেকটি ছিনতাইর ঘটনা ঘটে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ৩ টি মোটরসাইকেলে আসা ৬/৭ যুবক একটি অটোরিকশার গতি রোধ করে। এসময় অটোরিকশার যাত্রীদের সাথে মোটরসাইকেলে আসা যুবকদের হাতাহাতি হয়। একপর্যায়ে মোটরসাইকেলে আসা ওই ব্যক্তিরা পথচারী আরেক তরুণকে দৌড়ে ধরে ব্যাপক মারধর করে। মারধরে আহত ওই তরুণের নাম দুর্জয় অধিকারী (২২)। তিনি বলেন, আমাকে মারধর করে মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে এ ঘটনাকে ছিনতাইয়ের ঘটনা নয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, পূর্ব বিরোধের ঘটনা নিয়ে এমনটি ঘটেছে। এ নিয়ে শনিবার রাতে সিলেট মহানগর পুলিশের ফেসবুক পেজে ‘ছিনতাইয়ের মিথ্যা অভিযোগ প্রসঙ্গে’ শিরোনামে একটি পোস্ট করা হয়। এতে বলা হয়- ইদানিং লক্ষ্য করা যাচ্ছে, ব্যক্তিগত বিরোধের ফলে মারামারি বা অন্যান্য বিষয়ে সংগঠিত একাধিক ঘটনাকে মিডিয়াতে ছিনতাই হিসেবে নিউজ করা হচ্ছে। যা অত্যন্ত অনভিপ্রেত। শনিবার রাত ৯টায় নগরীর দাঁড়িয়াপাড়ায় নিউটন দাস নামের এক যুবককে রামদা দিয়ে কুপিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
গত ৫ মার্চ বৃহস্পতিবার নগরীর সাগর দিঘিরপারেও ঘটে ছিনতাইয়ের ঘটনা। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, নিরিবিলি একটি সড়ক দিয়ে এক নারী হেঁটে যাচ্ছিলেন। এ সময় মোটরসাইকেলে করে আসা দুই ব্যক্তি তার গতিরোধ করেন। তাদের একজনের হাতে ছিল ধারালো অস্ত্র, যা দিয়ে ওই নারীকে ভয় দেখানো হয়। অন্যজন তার সঙ্গে থাকা ব্যাগটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
এ সময় বাধা দিলে ধারালো অস্ত্রধারী ব্যক্তি অস্ত্রের বিপরীত দিক দিয়ে ওই নারীকে কয়েকবার আঘাত করেন। একপর্যায়ে আশপাশে লোকজনের উপস্থিতি টের পেয়ে দুই ব্যক্তি মোটরসাইকেলে করে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করেন। তবে ভিডিওতে ওই নারীর কাছ থেকে কিছু ছিনিয়ে নিতে দেখা যায়নি। তাদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের নম্বরও স্পষ্ট নয়।
পুলিশ জানিয়েছে, ভিডিওটি সিলেট নগরের সাগরদিঘীর পাড় এলাকার। ঘটনার শিকার নারী একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। তিনি সিলেটের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। সকাল সাড়ে আটটার দিকে সাগরদিঘীর পাড় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে বের হলে পথে এ ঘটনা ঘটে। তবে পরিবারের সদস্যরা এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ করতে চাননি।
এর আগে, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সিলেটের হাউজিং এস্টেট এলাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা থামিয়ে এক নারীর ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ঘটনায় তিনটি মোটরসাইকেলে আসা ছয়জন ছিনতাইকারী অংশ নেন। তারা অটোরিকশায় থাকা নারীর ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে যায়।
এর আগে গত ৮ মার্চ রোববার সন্ধ্যা ৬টার দিকে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার বাসিন্দা সুহেল সরকার (২২) নগরীর তাঁতিপাড়া পয়েন্ট দিয়ে যাওয়ার সময় ১৪-১৫ জন তাকে জোরপূর্বক অপহরণ করে ‘নাজমা নিবাস’ (বাসা নং-৫৬) এর দ্বিতীয় তলায় একটি কক্ষে আটকে রাখে। সেখানে ধারালো চাকু ও কাঁচি দেখিয়ে এবং লোহার রড দিয়ে মারধর করে তার কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ আদায় করা হয়। বিষয়টি পুলিশকে না জানানোর জন্য চক্রটি ভিকটিমের পোশাক খুলে ভিডিও ধারণ করে ও ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে তাকে ছেড়ে দেয়। কিন্তু ভিকটিম সুহেল সরকার বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে অবহিত করলে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ১০ জন অপহরণকারীকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে।
এদিকে, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের বিশেষ অভিযানে ৬৭ জনকে আটক গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, শনি ও রবিবার মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন, নিয়মিত মামলায় ৭ জন, ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ২ জন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ১৫ জন, ছিনতাই মামলায় ১৩ জন, বিভিন্ন অভিযোগে সন্দেহভাজন ১২ জন।
এছাড়া, রোববার (৫ এপ্রিল) সন্ধ্যায় সিলেট জেলা প্রেসক্লাব গণম্যাধমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সাম্প্রতিক সময়ে সিলেটে আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতির অবনতি ও সাংবাদিক আক্রান্তের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
এক বিবৃতিতে সিলেট জেলা প্রেসক্লাব সভাপতি মঈন উদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন এই উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে বলেন, মহানগর এলাকায় অপরাধ প্রবণতা ও ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় জননিরাপত্তাও চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
বিবৃতিতে নেতারা বলেন, নগরজুড়ে মোটরসাইকেল ও সিএনজি অটোরিকশা ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চক্রের ধারাবাহিক ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে গেছে। পুলিশি টহল এবং চেকপোস্ট বসানো সত্ত্বেও প্রকাশ্য দিবালোকে কিংবা রাতের আধারে ঘটে যাওয়া ছিনতাইয়ের ঘটনা সিলেট নগরীর অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জেলা প্রেসক্লাব নেতারা বলেন, একটি সুন্দর নগরী গড়ে তুলতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ। দুই সাংবাদিকের আক্রান্ত হওয়াসহ সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া সব ক’টি ঘটনায় সম্পৃক্ত অপরাধীদের গ্রেপ্তারপূর্বক আইনের আওতায় আনা হোক।
বাসদ সিলেট জেলা আহ্বায়ক আবু জাফর বলেন, সিলেট নগরীতে সাম্প্রতিক সময়ে চুরি-ডাকাতি-ছিনতাইয়ের ঘটনায় নগরবাসী আতঙ্কিত। এসব রোধে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। প্রশাসনের ভূমিকায় নগরবাসীকে হতাশা করেছে। নাগরিক জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকার ও প্রশাসনের। চুরি -ডাকাতি-ছিনতাই রোধে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ নগরজীবনে স্বস্তির পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে।
সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলন সিলেটের সমন্বয়ক আব্দুল করিম কিম বলেন, সিলেটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে তা মানতে হবে। একের পর এক ছিনতাই ও রাহাজানির ঘটনা ঘটেছে। ছিঁচকে চুরির ঘটনায় নগরবাসী অতিষ্ঠ। এই অবস্থায় পুলিশ প্রশাসনের কর্ম তৎপরতায় হতাশাবোধ করছি।
সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এমাদুল্লাহ শহীদ সিলেটের সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বিএনপির মতো রাজনৈতিক দলগুলো সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে সিলেটে এর বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও রাহাজানি আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এছাড়া হাউজিং এস্টেট ও সাগরদিঘীর পাড়ে দিনের আলোতে নারীদের ব্যাগ ছিনতাই ও অপহরণের চেষ্টার ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি দুই শিশুর নিখোঁজ ও পরবর্তীতে তাদের মরদেহ উদ্ধার উদ্বেগজনক।
আম্বরখানায় একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও শিক্ষকের ৩ বছরের শিশুর গলায় চাকু ধরে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা অপরাধীদের বেপরোয়া অবস্থার নিখুঁত প্রমাণ।
তিনি আরও বলেন, পুলিশ ও প্রশাসনের মূল দায়িত্ব চমক দেখানো বা ভাইরাল হওয়া নয়, শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করা। তিনি জেলা প্রশাসন ও পুলিশকে যৌথভাবে দায়ভার নেওয়া এবং দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।
নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নগরবাসীকে সতর্কতার সহিত অপরিচিত বা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা, মাদকসেবী ও ভবঘুরেদের নিয়ন্ত্রণে সামাজিক বন্ধন জোরদার করা জরুরি বলে উল্লেখ করেন।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও সিলেট জেলা আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান বলেন, সিলেটের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একসময় মানুষ নিরাপদে চলাফেরা করলেও এখন ছিনতাই ও মাদকের বিস্তারে জনমনে ভীতি বিরাজ করছে, যা তরুণ সমাজ ও সাধারণ মানুষকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
তিনি বলেন, নগরবাসীর প্রধান আতঙ্ক এখন ছিনতাই, যা মাদকের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনকে আরও সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে, অন্যথায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
মাওলানা হাবিবুর রহমান নগরবাসীকেও সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় তরুণদের সঙ্গে মিলিত হয়ে অপরাধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে, কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে সক্রিয় হতে হবে এবং চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ও ছিনতাইকারীদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে।
সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিভাজন অপরাধীদের সুযোগ দিচ্ছে। জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার মাধ্যমে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যথায় নৈরাজ্য থেকে উত্তরণ কঠিন হবে। তিনি বলেন, সিলেট আমাদের সবার। এই শহরকে নিরাপদ রাখা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। দল-মত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমরা আবারও একটি শান্ত ও নিরাপদ সিলেট গড়ে তোলা সম্ভব।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি সিলেটে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ছিনতাইয়ের ঘটনা পুলিশ শনাক্ত করেছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদেরও চিহ্নিত করা হয়েছে। অনেক ছিনতাইকারীকে ইতোমধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্তরা অনেক সময় বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও মামলা করতে রাজি হননি। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাদের আইনি পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করেছি। আম্বরখানা এলাকায় শিক্ষক অহী আলম রেজা ও সাংবাদিক রায়হানদ্দিন ওপর হামলার ঘটনা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জালালাবাদ এলাকার ছিনতাই সংক্রান্ত ঘটনাগুলিও গুরুত্ব সহকারে অনুসন্ধান করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৩০০-এর বেশি ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে একটি বড় সমস্যা হলো, জামিনে ছাড়া পাওয়া ছিনতাইকারীরা পুনরায় অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। উপ-কমিশনার বলেন, এক বা দুইবার জেল খাটার পর তারা কিছুটা সতর্ক হয়, তবে পুরোপুরি অপরাধ বন্ধ হয় না।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, সিলেটে ছিনতাই ও রাহাজানির মতো অপরাধ দমনে প্রশাসন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। তিনি জানান, বিচ্ছিন্নভাবে যেসব অপরাধের ঘটনা ঘটছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং অপরাধীদের গ্রেপ্তারে সাঁড়াশি অভিযান চালানোর কথা বলা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সামগ্রিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়নি; তবে পরিস্থিতির আরও উন্নয়নে প্রশাসন, পুলিশ ও সিটি কর্পোরেশন সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
নগরবাসীর প্রতি আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অচিরেই নিয়ন্ত্রণে আনা হবে এবং সিলেটে একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।
সিলেট শহরের সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক জানিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী বলেন, শহরে ছিনতাই ও মাদক প্রভাব বাড়ছে, যা জননিরাপত্তার জন্য হুমকি। তাই প্রশাসনকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি বলেন, শহরের প্রতিটি স্থানে টহল বৃদ্ধি করতে হবে। মাদক বিক্রয় ও সেবনের স্থানগুলো চিহ্নিত করে নজরদারি বাড়াতে হবে। ছিনতাইমুক্ত শহর নিশ্চিত করতে একযোগে অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, এক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে পুলিশ প্রশাসন পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি ভাবা হবে। এছাড়া সচেতনতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সিলেটকে আবার নিরাপদ শহরে পরিণত করা সম্ভব।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী বলেন, ঘটনা ঘটলেই ছিনতাই হয় না, এর পেছনে পারিবারিক ও পূর্ব শত্রুতা থাকে। সাংবাদিক রায়হান ও তালতলার ঘটনাটি ছিনতাই নয়। ভাড়া নিয়ে কথা কাটাকাটির জের ধরে সাংবাদিক রায়হান আহত হয়েছেন। তবে, আম্বরখানায় শিক্ষক ও সাংবাদিক ছিনতাইর শিকার হয়েছেন। আমরা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি দেখছি।
তিনি জানান, দু-একটা ছিনতাই হলেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয় না। ইদানীং যে ঘটনাগুলো ঘটছে তার সাথে আন্তঃজেলা ডাকাত দলের সদস্য, এসব ছিনতাইকারী প্রতিদিন স্থান পরিবর্তন করছে। তারপরও আমরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
তিনি বলেন, সিলেটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো আছে। নগরবাসীকে আতঙ্কিত না হওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।