শিক্ষামন্ত্রীকে সরিয়ে গদি বাঁচাতে পারবেন মোদী?
ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান অবশেষে পদত্যাগ করেছেন। দেশজুড়ে তীব্র ছাত্র আন্দোলন ও বিরোধীদের লাগাতার চাপের মুখে ২৫ জুলাই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছে নিজের পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন তিনি। নিট (NEET-UG)-সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই নজিরবিহীন সংকটের তৈরি হয়। ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় চরম অনিয়মের বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থী ও ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) দীর্ঘ আন্দোলনে মুখে শিক্ষামন্ত্রীর এই পদত্যাগকে মোদী সরকারের পক্ষ থেকে একপ্রকার নতিস্বীকার হিসেবেই দেখা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, শুধু শিক্ষামন্ত্রীকে সরিয়েই কি নরেন্দ্র মোদী নিজের গদি বাঁচাতে পারবেন? আরও পড়ুন ভারতের আন্দোলনে ঠিক যেন বাংলাদেশের দৃশ্য! নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস ও দেশজুড়ে বিক্ষোভ চলতি বছরের মে মাসে ভারতের অন্যতম বড় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা নিট-ইউজি অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ২২ লাখ পরীক্ষার্থী এই মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ নেন। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরপরই প্রশ্নপত্র ফাঁসের মারাত্মক অভিযোগ ওঠে। এর ফলে কোটি কোটি শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র
ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান অবশেষে পদত্যাগ করেছেন। দেশজুড়ে তীব্র ছাত্র আন্দোলন ও বিরোধীদের লাগাতার চাপের মুখে ২৫ জুলাই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছে নিজের পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন তিনি। নিট (NEET-UG)-সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই নজিরবিহীন সংকটের তৈরি হয়।
ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় চরম অনিয়মের বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থী ও ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) দীর্ঘ আন্দোলনে মুখে শিক্ষামন্ত্রীর এই পদত্যাগকে মোদী সরকারের পক্ষ থেকে একপ্রকার নতিস্বীকার হিসেবেই দেখা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, শুধু শিক্ষামন্ত্রীকে সরিয়েই কি নরেন্দ্র মোদী নিজের গদি বাঁচাতে পারবেন?
নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস ও দেশজুড়ে বিক্ষোভ
চলতি বছরের মে মাসে ভারতের অন্যতম বড় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা নিট-ইউজি অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ২২ লাখ পরীক্ষার্থী এই মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ নেন। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরপরই প্রশ্নপত্র ফাঁসের মারাত্মক অভিযোগ ওঠে। এর ফলে কোটি কোটি শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়।

ককরোচ জনতা পার্টি/ ছবি: সিজেপি
পরে ভারতের জাতীয় টেস্টিং এজেন্সি পরীক্ষা বাতিল করতে বাধ্য হয় এবং তদন্তভার সিবিআইযের হাতে তুলে দেওয়া হয়। গত পাঁচ বছরে তিনবার এ ধরনের প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় ভারতের পরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিশ্বাস উঠে গেছে। এই অনিয়মের বিরুদ্ধেই রাজপথে নেমে আসে ফুঁসে ওঠা তরুণ প্রজন্ম।
‘তেলাপোকা’ থেকে জাতীয় আন্দোলন
ভারতে চলমান এই ছাত্র আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। ভারতের একজন শীর্ষ বিচারক বেকার যুবকদের কটাক্ষ করে ‘তেলাপোকা’ বা ককরোচ বলে সম্বোধন করেছিলেন। যুবসমাজ সেই অপমানকে নিজেদের শক্তি বানিয়ে এক ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন শুরু করে। পরবর্তীতে এটি ভারতের অন্যতম বৃহত্তম গণআন্দোলনে রূপ নেয়।

দিল্লিতে ছাত্র আন্দোলন/ ছবি: পিটিআই
দিল্লির যন্তর মন্তরে হাজার হাজার শিক্ষার্থী তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান নেন। পাশাপাশি, এই বিক্ষোভ মুম্বাই, কলকাতা, বেঙ্গালুরু, বিহারেও ছড়িয়ে পড়ে। পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুকের ২৬ দিনের অনশন এবং গত ২০ জুলাইয়ের পার্লামেন্ট অভিমুখে ছাত্রদের মিছিলে পুলিশের লাঠিচার্জ এই আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তোলে।
শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো কী কী
বিক্ষোভরত সাধারণ শিক্ষার্থী ও সিজেপির পক্ষ থেকে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট কিছু দাবি জানানো হয়েছে। তাদের প্রধান দাবি ছিল কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, যা শনিবার পূরণ হয়েছে। তবে ছাত্রদের বাকি দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রশ্নফাঁসের ঘটনার একটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত; এই জালিয়াতির পেছনে থাকা কর্মকর্তাদের কঠোর জবাবদিহিতা ও শাস্তি নিশ্চিত করা; পরীক্ষা বাতিল হওয়ার মানসিক চাপ সইতে না পেরে যেসব শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন, তাদের পরিবারকে উপযুক্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং ভবিষ্যতে যেন আর কখনোই প্রশ্নফাঁস না হয়, সেজন্য পুরো পরীক্ষা ব্যবস্থার আমূল ও কাঠামোগত সংস্কার।
দিল্লিতে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ/ ছবি: পিটিআই
ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে বিরোধীদের একাত্মতা
ভারতের এই ছাত্র আন্দোলন মোদী সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লোকসভার বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীসহ পুরো ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA) জোট এই আন্দোলনের সঙ্গে পূর্ণ একাত্মতা ঘোষণা করেছে।
বিরোধীরা পার্লামেন্টে সরকারবিরোধী ব্যানার নিয়ে ‘নিট বন্ধ করো, জীবন বাঁচাও’ এবং ‘শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চাই’ স্লোগান দিয়ে সংসদীয় কার্যক্রম টানা চারদিন স্তব্ধ করে রাখে। সরকারের আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তারা শিক্ষামন্ত্রীর বিদায়ের দাবিতে অনড় ছিল।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর কংগ্রেস নেতা পি চিদম্বরম একে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এটি পার্লামেন্টে গঠনমূলক আলোচনার পথ তৈরি করবে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিরোধীরা এই বিজয়কে মোদী সরকারের নীতিগত ব্যর্থতা হিসেবে প্রচার করে চাপ আরও বাড়াবে।
সিজেপির পরবর্তী ঘোষণা
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের খবর দিল্লিতে আন্দোলনস্থলে পৌঁছানোর পর ছাত্ররা উৎসবে মেতে ওঠেন। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে একে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রথম বড় জয় এবং গণতন্ত্রের বিজয় হিসেবে ঘোষণা করেন। তবে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, শিক্ষামন্ত্রীর বিদায় মানেই আন্দোলন শেষ নয়। তাদের বাকি দাবিগুলো—যেমন মৃত শিক্ষার্থীদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ এবং দোষীদের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে আন্দোলন চলবে।
এসব দাবি আদায়ে শনিবার সন্ধ্যায় দেশব্যাপী মোমবাতি মিছিলের ডাক দিয়েছে সিজেপি। অর্থাৎ, শিক্ষামন্ত্রীকে সরিয়েও আন্দোলনকারীদের পুরোপুরি শান্ত করতে পারেনি মোদী সরকার।

নরেন্দ্র মোদী/ ফাইল ছবি: পিটিআই
গদি বাঁচাতে পারবেন মোদী?
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মোদী সরকার এরই মধ্যে কিছু ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে নতুন কঠোর আইন এবং ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক বোদ্ধাদের মতে, তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা নরেন্দ্র মোদীর জোট সরকারের জন্য এই ছাত্র আন্দোলন একটি বড় ধাক্কা। এতদিন সরকার দাবিগুলো এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত মন্ত্রীর পদত্যাগ তাদের দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে।
কেবল একজন মন্ত্রীকে বলির পাঁঠা বানিয়ে মোদী সরকার তরুণদের ক্ষোভ এবং রাজনৈতিক সংকট থেকে মুক্তি পাবে কি না, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোতে শিক্ষার্থীদের বাকি দাবিগুলো তারা কতটা আন্তরিকতার সঙ্গে পূরণ করতে পারবে তার ওপর।
কেএএ/
What's Your Reaction?





