দরজায় কড়া নাড়ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন। দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে প্রার্থীদের। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন বিভিন্ন প্যানেল, সংগঠন ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সমন্বয়ে গঠিত ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদ’ প্যানেলে সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে লড়ছেন ফাতেহা শারমিন এ্যানি। জাগো নিউজকে তার ভাবনাগুলো জানিয়েছেন। কথা বলেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক হাসান আলী।
জাগো নিউজ: ডাকসু নির্বাচনের প্রচারণায় শিক্ষার্থীদের কাছে কেমন সাড়া পাচ্ছেন?
এ্যানি: শিক্ষার্থীদের কাছে আমরা সব প্রার্থীই যাচ্ছি। ক্যাম্পাসে এখনো উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়নি। যে যার মতো নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। অনেকের সঙ্গে রাস্তায় দেখা হচ্ছে। খুবই সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ, ভোটাররাও ধীরে ধীরে আগ্রহী হচ্ছেন। এতদিন প্রচারণা অনলাইনে দেখেছে, এখন মাঠে দেখছে। শিক্ষার্থীরা এখন একটা ভাইবের মধ্যে আসছে যে, নির্বাচন এসে গেছে।
- আরও পড়ুন
- ঢাবির রেজিস্ট্রার ভবন পেপারলেস করার অঙ্গীকার সাদিক কায়েমের
- ডাকসু নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রতিযোগিতা চলছে: আব্দুল কাদের
- ডাকসু ভিপি প্রার্থী জালালের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা মামলা
জাগো নিউজ: আমরা দেখছি, বিভিন্ন প্যানেল বা প্রার্থীদের মাধ্যমে অনবরত আচরণবিধি লঙ্ঘন হচ্ছে। এটি শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে কী না?
এ্যানি: যুক্তিসংগত কারণেই আচরণবিধি দেওয়া হয়েছে। এটা যেন ক্ষতির কারণ না হয়ে ওঠে, ডাকসুকেন্দ্রিক যেন কোনো মব কিংবা সহিংসতা সৃষ্টি না হয় সেজন্যই বিধি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা দেখছি, রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন বা পাওয়ারফুল গোষ্ঠী ছাত্র সংগঠনগুলো অনেক বেশি অনিয়ম করছে। একদমই নিয়ম মানছে না। গোনায় ধরছে না যে আচরণবিধি বলে একটা কিছু আছে। আমি একজন স্বতন্ত্র প্যানেলের এজিএস পদপ্রার্থী হয়ে বলছি, এটাকে একেবারেই গ্রহণযোগ্য মনে করছি না।
জাগো নিউজ: আচরণবিধি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কিংবা নির্বাচন কমিশনের মুখোমুখি হয়েছিলেন?
এ্যানি: যে জায়গাগুলোতে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল, আমরা সন্দিহান হয়েছি সেটি নিয়ে প্রশাসনকে প্রশ্ন করেছি। বলেছি যথাযথ ব্যবস্থা নিতে এবং এটা পরিষ্কার করে দিতে যে এই নিয়মটা এ রকমই হবে। যেন কোনো প্রার্থীর মধ্যে সন্দেহ না থাকে যে, সে বুঝতে পারেনি। ব্যাপারটা প্রশাসনিকভাবে সুন্দর হোক। কিন্তু প্রশাসনের এখানে অনেক অনীহা দেখতে পাচ্ছি। অসহযোগিতা দেখতে পাচ্ছি আচরণবিধি বলবত করার ক্ষেত্রে। নির্বাচন নিয়ে একটা শঙ্কা কাজ করছে। এটাকে ইস্যু করে তো দুইপক্ষ সহিংসতায় জড়াতে পারে।
- আরও পড়ুন
- হল সংসদ নির্বাচনে লড়বেন ১০৩৫, প্রার্থিতা প্রত্যাহার ৭৩ জনের
- আমরা কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবো: আল সাদী ভূঁইয়া
- ডাকসু নির্বাচনে ছবি বিকৃতির ঘটনায় শিবিরের উদ্বেগ
জাগো নিউজ: আপনি যদি এজিএস নির্বাচিত হন তাহলে শিক্ষার্থীদের নিয়ে, বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে আপনার কোনো পরিকল্পনা আছে?
এ্যানি: যেহেতু আমি নারী হিসেবে ডাকসু নির্বাচনের টপ থ্রি তথা এজিএস পদপ্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাচ্ছি। তো এই প্রশ্নটা আমার ক্ষেত্রে সচরাচর আসে যে নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে কী ভাবছি বা এজিএস হলে আমি কী করব? আমার স্লোগান বা আমার নিজস্ব ভাষা একদমই স্পষ্ট। সব শিক্ষার্থীর যৌক্তিক অধিকারই আমার অঙ্গীকার। শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোই আমার ভাষা। আর নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বলতে গেলে, তাদের সবধরনের নিরাপত্তা এবং অধিকার নিশ্চিতে কাজ করব। যৌক্তিক অধিকার আদায় নারী বলিষ্ঠ কণ্ঠ হবে। নারীরা সবসময় এগিয়ে আসতে পারে না নানান ধরনের জটিলতায় পড়ে। স্লাটশেমিং, বডিশেমিং, অনলাইন বুলিং এবং অফলাইনে অনেক হয়রানির শিকার হয়। আমি আমার সব বোনের সাহসী বলিষ্ঠ কণ্ঠ যেন হয়ে উঠতে পারি, আমি যেন আমার ক্যাম্পাসের সব বোনের সাহসের জায়গা হয়ে উঠতে পারি, তাদের ভাষা হয়ে উঠতে পারি সে জায়গায় আমি আশ্বস্ত করতে চাই তাদের।
জাগো নিউজ: ডাকসুতে নির্বাচিত হয়ে কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ার ইচ্ছে আছে?
এ্যানি: এখনই আমার স্ট্যান্ড ক্লিয়ার। আমি কোনো দলীয় প্রার্থী নই। কোনো দল থেকে মনোনীত প্যানেলে বা কোনো দল থেকে মনোনীত প্রার্থীও নই। আমি নিজের কাছে প্রচণ্ড পরিষ্কার যে, আমার কোনো মাদার পার্টি, ব্রাদার পার্টি নেই। আমার সত্তা আমার পরিচয় আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী। ভবিষ্যতেও আমার কোনো পার্টির সঙ্গে আগানোর কোনো ইচ্ছা নেই। সেই জায়গা থেকে আমার স্ট্যান্ড এটাই যে, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আছি, সাথে থাকব।
জাগো নিউজ: শিক্ষার্থীদের মধ্যে হল-ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি থাকা নিয়ে কনফিউশন আছে? নির্বাচিত হলে ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতির ব্যাপারে আপনার অবস্থান কী হবে?
এ্যানি: এটা কর্তৃপক্ষের নীতি নির্ধারক পর্যায়ের বিষয়। আমরা যখন আগস্ট পরবর্তী দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি, দখলদারত্বের ছাত্ররাজনীতি এবং কুক্ষিগত করে রাখা ক্যাম্পাসকে উদ্ধার করতে আওয়াজ দিয়েছিলাম। তখন স্যাররা আমাদের অনুরোধ করেছিল যে, এভাবে এটা হবে না। তোমরা ৭৩ এর অধ্যাদেশ পরিবর্তনের চেষ্টা করো, সংযোজন-বিয়োজনের চেষ্টা করো। কারণ ওটা থেকে স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গঠিত হয় এবং পরিচালিত হয়। তখন আমরা অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু যথাযথ সাপোর্ট পাইনি। আমার বিশ্বাস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কোনো দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি চায় না। আমার স্ট্যান্ড একটাই, আমি দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতির বিরুদ্ধে।
- আরও পড়ুন
- নির্বাচিত হলে শিক্ষার্থীদের বেসিক চাহিদাগুলো পূরণের চেষ্টা করবো
- ডাকসু নির্বাচনে কেন্দ্রীয় ব্যালটে ৫, হল সংসদে থাকবে ১ পাতা
- ভোটকেন্দ্র বাড়ানোর দাবি ডাকসু ভিপিপ্রার্থী আবিদের
জাগো নিউজ: শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী করার জন্য আপনার বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে? যেটি এর আগে কেউ নেয়নি?
এ্যানি: অবশ্যই আছে। আমি যখন কোনো রাজনৈতিক আদর্শের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার জন্য এখানে আসিনি তখন আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কিছু ইশতেহার অবশ্যই আছে। গবেষণা নিয়ে আমার অনেক বেশি যুগোপযোগী এবং চিন্তাধারার যে ব্যাপার, সেটা হচ্ছে আমি আমার ক্যাম্পাসকে, বিশ্ববিদ্যালয়কে গ্লোবাল অ্যাকাডেমি হিসেবে চিন্তা করতে চাই। সেটাকে বাস্তবায়নের জন্য যদি আমি নির্বাচিত হই, সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। আমি স্ট্যার্টআপ প্রোগ্রামগুলো, ইন্টারন্যাশনাল প্রোগ্রামগুলো কোলাবরেট করা, ইন্টারন্যাশনাল জার্নালের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়কে কোলাবরেট করা এবং আমাদের মৌলিক ও যুগোপযোগী এবং অগ্রাধিকার সম্পন্ন গবেষণালব্ধ তথ্যগুলো বের করে আনার চেষ্টা করব। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে আমাদের অ্যাকাডেমিক এরিয়াটাকে সুস্থ পরিবেশে আনা। অ্যাকাডেমিক বিষয়গুলোকে বাস্তবিক এবং ইন্টারন্যাশনাল বেসড করা আমার সবচেয়ে বড় টার্গেট।
জাগো নিউজ: ভোটারদের জন্য আপনার কিছু বলার আছে?
এ্যানি: ভোটাররা তো আসলে ভোটার না। ভোটাররা আমার ভাই-বোন। কেউ যদি আমাকে ভোট না দেয় তাও সে আমার ভাই-বোন। ভোট দিলেও সে আমার ভাই-বোন। আমার কাছে এটাই তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়। আর তাদের কাছে এ্যানি আপুর একটা অনুরোধ তো থাকবেই। এ্যানি আপুর ব্যালট নম্বর হলো ১১। এ্যানি আপুকে যোগ্য মনে হলে অবশ্যই ১১নং ব্যালট পছন্দ করবে। কিন্তু এ্যানি আপুর চেয়েও কাউকে যোগ্য মনে হলে অবশ্যই তাকে পছন্দ করার জন্য আমার আহ্বান থাকবে। কিন্তু অযোগ্য কোনো প্রার্থীকে যেন তারা নির্বাচিত না করে। কারণ তার ভোটটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
জাগো নিউজ: আপনার মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ।
এ্যানি: আপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।
এমএইচএ/এমআরএম/এএসএম