আন্দোলনরত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। বুয়েটের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. এন. এম. গোলাম জাকারিয়া স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে এ প্রতিবাদ জানানো হয়।
বুয়েটের বিবৃতিতে বলা হয়, বিএসসি (ইঞ্জিনিয়ারিং) গ্র্যাজুয়েট প্রকৌশলীদের সহকারী প্রকৌশলী বা সমমানের পদে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে অধিকার সুরক্ষা, সুসংহত করাসহ সংশ্লিষ্ট গ্রেডে কোটা–সংক্রান্ত বৈষম্য দূর করার দাবিতে কয়েক দিন ধরে বুয়েটসহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে আসছেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার (২৬ আগস্ট) দুপুরে বুয়েটের উপাচার্য ও সহ–উপাচার্য সচিবালয়ে শিক্ষা উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করে দ্রুত শিক্ষার্থীদের দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানান। এরই ধারাবাহিকতায় বিএসসি ডিগ্রিধারী ও ডিপ্লোমাধারীদের পেশাগত দাবিগুলোর যৌক্তিকতা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সুপারিশ দেওয়ার জন্য বুধবার (২৭ আগস্ট) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের সভাপতিত্বে আট সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বুধবার বুয়েটসহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা উল্লিখিত দাবিদাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা অভিমুখে যেতে চাইলে পুলিশ তাদের ওপর কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে এবং লাঠিচার্জ করে। এতে অনেক শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন।
- আরও পড়ুন
- বুয়েটের সব পরীক্ষা স্থগিত
- বিএসসি-ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের রেষারেষির নেপথ্যে ‘চাকরি সংকট’
- পুলিশ-শিক্ষার্থী সংঘর্ষ, টিয়ারশেল-সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ
পুলিশের এ হামলার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যা সমাধানের বদলে পুলিশের এ ধরনের হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বুয়েট প্রশাসন পুলিশের এ আচরণে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ, মর্মাহত এবং এই হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে। যথাযথ তদন্ত করে হামলার ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নেবে বুয়েট প্রশাসন এমনটাই আশা করছে।
বুয়েটসহ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রথমে তিন দফা দাবি জানিয়ে আন্দোলন শুরু করেন। দাবির মধ্যে রয়েছে- নবম গ্রেডের ইঞ্জিনিয়ারিং পদ বা সহকারী প্রকৌশলী বা সমমানের পদে প্রবেশের জন্য সবাইকে নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে এবং প্রার্থীর কমপক্ষে বিএসসি ডিগ্রি থাকতে হবে। কোটার মাধ্যমে পদোন্নতি দেওয়া যাবে না। এমনকি বিভিন্ন নামে সমমানের পদ সৃষ্টি করেও পদোন্নতি দেওয়া যাবে না।
দশম গ্রেডের কারিগরি পদ বা উপ-সহকারী প্রকৌশলী বা সমমানের পদের জন্য নিয়োগ পরীক্ষা ডিপ্লোমা এবং বিএসসি ডিগ্রিধারীদের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে।
ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি ডিগ্রি না থাকলেও ইঞ্জিনিয়ার পদবি ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
- আরও পড়ুন
- শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ সভ্য সমাজে কোনোভাবে কাম্য নয়
- রাতেও শাহবাগে প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা, আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা
- ন্যায্য সমাধান করবো, আর আন্দোলনের প্রয়োজন নেই: ফাওজুল কবির
দাবি আদায়ে শিক্ষার্থীরা বুধবার প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার উদ্দেশে যাওয়ার সময় পুলিশের সঙ্গে তাদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড, কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। পরে পুলিশ লাঠিপেটা করলে শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী, সাংবাদিক ও পুলিশ সদস্য আহত হন।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ও আদায় না হওয়া তিন দফা দাবি থেকে সরে এসে পাঁচ দফা দাবি জানান আন্দোলনরত প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি এ সমস্যা সমাধানে সরকারের গঠন করা কমিটিও প্রত্যাখ্যান করেছেন তারা।
বুধবার বিকেল ৫টার দিকে ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী জুবায়ের আহমেদ বলেন, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে দুঃখ প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে তাকে বিষয়টির জবাবদিহি করতে হবে।
তিনি বলেন, প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে গঠিত কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করলাম। একই সঙ্গে দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের নিয়ে কমিটি গঠন করতে হবে।
জুবায়ের আহমেদ আরও বলেন, আমাদের পূর্ব ঘোষিত তিন দফা দাবি মেনে নিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাহী আদেশে প্রজ্ঞাপন দিতে হবে। তিন উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, আদিলুর রহমান খান ও সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানকে এখানে এসে নিশ্চয়তা দিতে হবে। হামলায় আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার খরচ বহন করতে হবে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যৌক্তিক আন্দোলনে আর কোনো হামলা করা যাবে না।
- আরও পড়ুন
- প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের শাহবাগ অবরোধ, যান চলাচল বন্ধ
- প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের দাবি নিয়ে ৪ উপদেষ্টার নেতৃত্বে কমিটি হচ্ছে
- কমিটি প্রত্যাখ্যান করে এবার ৫ দাবি প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের
এছাড়া আন্দোলনে অংশ নেওয়া রোকনের ওপর হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ও হামলায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান বুয়েটের এ শিক্ষার্থী।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, পুলিশের হামলায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অন্তত ৬০ জন আহত হয়েছেন।
এমএমএআর/এএসএম