শিল্পবর্জ্য : নদী হত্যার দায় কার?
বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো আজ আর কেবল প্রাকৃতিক জলধারা (natural waterways) নয়, অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো ভয়াবহ শিল্পবর্জ্যের বহনকারী। শিল্পকারখানা থেকে নির্গত অপরিশোধিত তরল বর্জ্য বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এফ্লুয়েন্ট নীরবে বিষিয়ে তুলছে নদী, মাটি ও মানুষের জীবন।
অথচ এই দূষণ থামাতে যে আইন, প্রযুক্তি ও সক্ষমতা প্রয়োজন - তার কার্যকর প্রয়োগ এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় দৃশ্যমান নয়।
শেষ তিন দশকে শিল্পায়ন দেশের অর্থনীতিতে গতি দিয়েছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এই অগ্রগতির মূল্য কি পরিবেশকে চুকাতে হবে? টেক্সটাইল, ডাইং, ট্যানারি, কেমিক্যাল ও ওষুধ শিল্পের বিপুল তরল বর্জ্য প্রতিদিন কোনো পরিশোধন ছাড়াই নদী ও খালে গিয়ে পড়ছে।
দেশের বাস্তবতা হলো, শিল্পকারখানা থেকে উৎপন্ন তরল বর্জ্যের বড় একটি অংশ এখনো অপরিশোধিত অবস্থায় পরিবেশে নিঃসৃত হচ্ছে।
এর সবচেয়ে করুণ উদাহরণ রাজধানীর প্রাণপ্রবাহ বুড়িগঙ্গা। একসময় যে নদী ঢাকা শহরকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, আজ সে নিজেই মৃতপ্রায়। শুষ্ক মৌসুমে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের অভাবে নদীতে কোনো জলজ প্রাণ টিকে থাকতে পারে না। কালো ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি আজ নদীর স্বাভাবিক পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সংক
বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো আজ আর কেবল প্রাকৃতিক জলধারা (natural waterways) নয়, অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো ভয়াবহ শিল্পবর্জ্যের বহনকারী। শিল্পকারখানা থেকে নির্গত অপরিশোধিত তরল বর্জ্য বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এফ্লুয়েন্ট নীরবে বিষিয়ে তুলছে নদী, মাটি ও মানুষের জীবন।
অথচ এই দূষণ থামাতে যে আইন, প্রযুক্তি ও সক্ষমতা প্রয়োজন - তার কার্যকর প্রয়োগ এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় দৃশ্যমান নয়।
শেষ তিন দশকে শিল্পায়ন দেশের অর্থনীতিতে গতি দিয়েছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এই অগ্রগতির মূল্য কি পরিবেশকে চুকাতে হবে? টেক্সটাইল, ডাইং, ট্যানারি, কেমিক্যাল ও ওষুধ শিল্পের বিপুল তরল বর্জ্য প্রতিদিন কোনো পরিশোধন ছাড়াই নদী ও খালে গিয়ে পড়ছে।
দেশের বাস্তবতা হলো, শিল্পকারখানা থেকে উৎপন্ন তরল বর্জ্যের বড় একটি অংশ এখনো অপরিশোধিত অবস্থায় পরিবেশে নিঃসৃত হচ্ছে।
এর সবচেয়ে করুণ উদাহরণ রাজধানীর প্রাণপ্রবাহ বুড়িগঙ্গা। একসময় যে নদী ঢাকা শহরকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, আজ সে নিজেই মৃতপ্রায়। শুষ্ক মৌসুমে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের অভাবে নদীতে কোনো জলজ প্রাণ টিকে থাকতে পারে না। কালো ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি আজ নদীর স্বাভাবিক পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সংকটের মধ্যেই একটি ইতিবাচক দিক হলো- বর্তমান সরকারের নদী খনন ও নাব্যতা পুনরুদ্ধার উদ্যোগ। দেশের গুরুত্বপূর্ণ নদী ও নৌপথে ড্রেজিং কার্যক্রম নদীর প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানো এবং নৌযোগাযোগ সচল রাখার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।
নদী রক্ষায় এমন বাস্তব ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত।
তবে একইসঙ্গে বাস্তব প্রশ্নটিও উপেক্ষা করা যায় না - যদি শিল্পকারখানা থেকে প্রতিদিন অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে গিয়ে পড়তে থাকে, তাহলে শুধু খনন করে নদী কতটা টেকসইভাবে বাঁচানো সম্ভব? দূষণের (Pollution) উৎস নিয়ন্ত্রণ না করে নদী খনন অনেক ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি সমাধান হয়েই থেকে যায়। দূষণ অব্যাহত থাকলে খননকৃত নদীতেও দ্রুত আবার বর্জ্য জমতে শুরু করে।
এই দূষণের প্রভাব পানিতেই সীমাবদ্ধ নয়। শিল্পবর্জ্যের বিষাক্ত উপাদান মাটিতে মিশে কৃষিজমির উর্বরতা নষ্ট করছে, ভূগর্ভস্থ পানিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। দূষিত পানি দিয়ে সেচ দেওয়া ফসলে ভারী ধাতু (Heavy metal) জমছে, যা খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে।
এর ফল হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি অসুখ - চর্মরোগ, কিডনি সমস্যা, শ্বাসকষ্ট, এমনকি ক্যানসার। নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর কিংবা চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে বসবাসরত মানুষের বাস্তবতা আরও কঠিন। নদী ও জলাশয়ের ওপর নির্ভরশীল জেলে সম্প্রদায় হারাচ্ছে জীবিকা। এভাবে পরিবেশগত অপরাধ সামাজিক বৈষম্য ও জনস্বাস্থ্য সংকটকে আরও গভীর করছে।
আইন আছে, উদ্যোগও আছে কিন্তু সমন্বয়ের ঘাটতি স্পষ্ট। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, ইটিপি চালু রাখা বাধ্যতামূলক হলেও বাস্তব প্রয়োগ দুর্বল। নদী খনন ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ - এই দুই উদ্যোগকে যদি সমান্তরালে ও সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবেই প্রকৃত সাফল্য আসবে।
সরকারের নদী খনন উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। এখন প্রয়োজন দূষণের উৎস বন্ধে একই দৃঢ়তা দেখানো। কঠোর নজরদারি, নিয়মিত নিরীক্ষা, আধুনিক বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা এবং আইন ভঙ্গকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতেই হবে। নদী কোনো বর্জ্য ফেলার জায়গা নয়। নদীই এই দেশের প্রাণ। সরকার, শিল্পমালিক ও নাগরিক - সবার সম্মিলিত দায়িত্বে নদীকে বাঁচানো সম্ভব। নদী বাঁচলে তবেই টিকে থাকবে উন্নয়ন।