গত ১৩ ডিসেম্বর ২০২৬ ঢাকায় ‘উচ্চশিক্ষার বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা ২০২৬’ শীর্ষক তিন দিনব্যাপী দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। উদ্দেশ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চশিক্ষা খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, মানোন্নয়ন, আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন, ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার মধ্যে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপন এবং উচ্চশিক্ষার বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের পথ বের করা। বলা হচ্ছে, এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে উচ্চশিক্ষার রূপান্তর ঘটানো সম্ভব হবে।
মঞ্চে বক্তব্য দিতে দিতে ড. ইউনূস উচ্চশিক্ষার মান, নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং নেতৃত্ব তৈরির প্রসঙ্গ তুললেন। কথা শুনছিলাম। মাথা নাড়ছিলাম। সব কথাই ঠিক। তবু কেন যেন বারবার একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন মনে ফিরে আসছিল। আমরা যে উচ্চশিক্ষা নিয়ে এত আলোচনা করি, এত সম্মেলন করি, এত পরিকল্পনা বানাই, তার ফল কোথায়।
দেশের গার্ডিয়ানরা যখন তাদের ছোট্ট শিশু সন্তানকে পড়াতে মাস্টার্স পাস শিক্ষক নিয়োগ করেন, তখন তারা একটি বিষয়েই বিশ্বাস করেন। ভবিষ্যৎ গড়তে হলে চরিত্র, জ্ঞান ও মূল্যবোধের সমন্বয় দরকার। একটি শিশুর হাতে যদি অদক্ষ, অনৈতিক বা অশিক্ষিত মানুষকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে সেই শিশুর ভবিষ্যৎ অন্ধকার হবে। এই সাধারণ বোধবুদ্ধি আমাদের সবার আছে।
উচ্চশিক্ষা যদি সত্যিই মানুষ তৈরি করত, তাহলে আজ প্রশাসন, রাজনীতি, অর্থনীতি আর রাষ্ট্রযন্ত্র এতটা নৈতিক দেউলিয়াত্বে ডুবে থাকত না। সম্মেলনের আলোচনায় প্রযুক্তি আছে, কারিকুলাম আছে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আছে, কিন্তু যে প্রশ্নটি সবচেয়ে জরুরি, সেটি প্রায় অনুচ্চারিতই থেকে যায়। আমরা কেমন মানুষ তৈরি করছি।
এই প্রশ্নটাই আজ সবচেয়ে জরুরি। কারণ শিক্ষা যদি চরিত্র না গড়ে, তবে সেই শিক্ষা রাষ্ট্রকে বাঁচায় না, বরং আরও নিখুঁতভাবে ধ্বংস করে।
অন্যথায় ইতিহাস একদিন কঠোর প্রশ্ন করবে। তোমরা তোমাদের সন্তানকে মানুষ বানাতে চেয়েছিলে, কিন্তু রাষ্ট্রটাকে কেন অপরাধীদের হাতে তুলে দিয়েছিলে।
কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় হলো, একই সমাজ রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ঠিক উল্টো সিদ্ধান্ত নেয়। দেশের মানুষ ভোট দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসায় চোর, ডাকাত, খুনখারাপি, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজদের। প্রশ্ন উঠতেই পারে, একটি জাতি কীভাবে একই সঙ্গে এতটা সচেতন এবং এতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন হতে পারে।
এই দ্বিচারিতা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। এটি দীর্ঘদিনের নৈতিক অবক্ষয়ের ফল। পরিবারে আমরা সন্তানকে শেখাই সত্য বলা, অন্যায় না করা, কারও অধিকার নষ্ট না করা। অথচ ভোটের বাক্সে গিয়ে আমরা সেই নীতিগুলো নিজ হাতে বিসর্জন দিই। তখন আমাদের কাছে যোগ্যতা নয়, বিবেক নয়, নৈতিকতা নয়, মুখ্য হয়ে ওঠে দল, স্বার্থ আর ভয়।
গবেষণায় দেখা যায়, যেসব রাষ্ট্রে রাজনৈতিক নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে নৈতিক মানদণ্ড দুর্বল, সেখানে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। বাংলাদেশ তার জ্বলন্ত উদাহরণ। এখানে দুর্নীতি আর অপরাধ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। ফলে খুন, গুম, লুটপাট ও অর্থপাচারকে মানুষ অস্বাভাবিক কিছু হিসেবে দেখে না। এটাকেই বলা হয় নৈতিক ক্লান্তি।
আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, এই বাস্তবতাকে আমরা স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছি। আমরা বলি, সবাই তো এমন। ভালো মানুষ দিয়ে কী হবে। এই মানসিকতাই জাতিকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়। কারণ রাষ্ট্র কোনো বিমূর্ত সত্তা নয়। রাষ্ট্র চালায় মানুষ। আর মানুষ যদি অনৈতিক হয়, রাষ্ট্রও অনৈতিক হবে।
একটি শিশু যখন তার শিক্ষককে সম্মান করতে শেখে, তখন সে শিখে কর্তৃত্ব মানে দায়িত্ব। কিন্তু রাষ্ট্র যখন অপরাধীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তখন নাগরিকরা শিখে যায় ক্ষমতা মানে লুটপাট। এই দ্বৈত শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।
এখানে প্রশ্ন শুধু রাজনৈতিক দলের নয়। প্রশ্ন আমাদের সম্মিলিত নৈতিক ব্যর্থতার। আমরা যারা ভোট দিই, যারা চুপ করে থাকি, যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলি না, তারাও এই ব্যবস্থার অংশীদার। কারণ অন্যায়কে মেনে নেওয়াও অন্যায়ের এক ধরন।
রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো পরীক্ষামূলক খেলনা নয়। যেমন করে আমরা আমাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপস করি না, তেমনি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়েও আপস করা যায় না। যদি আমরা চাই একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ, তাহলে ভোটের সময়ও আমাদের শিক্ষক বাছাইয়ের মতোই মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে।
আমরা যে শ্রম, সময় আর অর্থ ব্যয় করি আমাদের শিশুদের গড়ে তুলতে, তার উদ্দেশ্য কী। তাদের ভালো স্কুলে পড়াই, ভালো শিক্ষক দিই, নৈতিকতা শেখাই এই আশায় যে একদিন তারাই দেশের পরিকাঠামো গড়ে তুলবে, প্রশাসন চালাবে, রাষ্ট্রকে সামনে এগিয়ে নেবে। বাস্তবেও তাই হয়েছে। আজ দেশের প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ব্যাংক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রকৌশল বিভাগ সব জায়গায় তারাই দায়িত্বে রয়েছে।
তবুও প্রশ্ন থেকেই যায়। যদি তারাই রাষ্ট্র চালায়, তাহলে কেন পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র দুর্নীতিতে ভরা। কেন ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না। কেন ন্যায়বিচার পাওয়ার আগে মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। কেন হাসপাতাল থেকে আদালত, শিক্ষা থেকে প্রশাসন সর্বত্র একই পচন। তাহলে কি আমরা মানুষ গড়িনি, নাকি মানুষ গড়ার নামে কেবল দক্ষ দুর্নীতিবাজ তৈরি করেছি।
এই প্রশ্ন আরও গভীর। দুর্নীতি কেন কেবল শীর্ষে সীমাবদ্ধ নয়। কেন তা দেশের মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। কেন সাধারণ মানুষও সুযোগ পেলে অন্যায় করতে দ্বিধা করে না। এর উত্তর একটাই। কারণ আমরা শৈশবে নৈতিকতার কথা বলেছি, কিন্তু রাষ্ট্রে অনৈতিকতাকে পুরস্কৃত করেছি। আমরা সন্তানকে সততার পাঠ দিয়েছি, কিন্তু ভোটের সময় সেই সততাকেই হত্যা করেছি।
এই দ্বিচারিতার ফল আজ স্পষ্ট। একটি জাতি যেখানে ভালো মানুষ তৈরি হয়, কিন্তু ভালো রাষ্ট্র তৈরি হয় না। এই অসংগতির দায় কাউকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এখন সিদ্ধান্তের সময়। আমরা কি সন্তান আর রাষ্ট্রের মধ্যে এই বিভাজন চালিয়ে যাব, নাকি দুটোর জন্যই একই নৈতিক মানদণ্ড প্রয়োগ করব।
এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ আর নেই।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন