শিশুটির পরিবার কি ন্যায়বিচার পাবে?
রাজধানীর মিরপুরে পাশবিক নির্যাতন ও নৃশংসতার শিকার আট বছরের শিশু হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হবে কাল রোববার (৭ জুন)। ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল বহুল আলোচিত এই মামলার রায় ঘোষণা করবেন। শিশুটি বাড়ির কাছে একটি স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়তো। মেধাবী ছাত্রী হিসেবে পরিচিত ছিল সবার কাছে। শ্রেণিতে তার রোল ছিল এক। গত ১৯ মে সকালে প্রতিবেশী ভাড়াটিয়ার ঘরে পাশবিক নির্যাতন ও নৃশংস হত্যার শিকার হয় ছোট্ট এই শিশুটি। ঘটনার পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়ে দ্রুত বিচারের দাবি ওঠে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দেওয়া হয়। এরপর মাত্র ১৭ দিনের মধ্যে দেশজুড়ে আলোচিত হত্যা মামলার তদন্ত, অভিযোগপত্র দাখিল, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, আত্মপক্ষ সমর্থন এবং যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। এখন বিচারিক প্রক্রিয়ার শেষ ধাপ—রায়। সবার মধ্যেই একটি প্রশ্ন, শিশুটির পরিবার কি ন্যায়বিচার পাবে? দেশজুড়ে নিন্দা, ক্ষোভ ১৯ মে সকালে আট বছর বয়সী শিশুটিকে স্কুলে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছিল। মা ব্যস্ত ছিলেন রান্নাঘরে। একপর্যায়ে শিশুটি বাসা থেকে বের হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর তাকে খুঁজে না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা উ
রাজধানীর মিরপুরে পাশবিক নির্যাতন ও নৃশংসতার শিকার আট বছরের শিশু হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হবে কাল রোববার (৭ জুন)। ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল বহুল আলোচিত এই মামলার রায় ঘোষণা করবেন।
শিশুটি বাড়ির কাছে একটি স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়তো। মেধাবী ছাত্রী হিসেবে পরিচিত ছিল সবার কাছে। শ্রেণিতে তার রোল ছিল এক।
গত ১৯ মে সকালে প্রতিবেশী ভাড়াটিয়ার ঘরে পাশবিক নির্যাতন ও নৃশংস হত্যার শিকার হয় ছোট্ট এই শিশুটি। ঘটনার পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়ে দ্রুত বিচারের দাবি ওঠে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দেওয়া হয়।
এরপর মাত্র ১৭ দিনের মধ্যে দেশজুড়ে আলোচিত হত্যা মামলার তদন্ত, অভিযোগপত্র দাখিল, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, আত্মপক্ষ সমর্থন এবং যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। এখন বিচারিক প্রক্রিয়ার শেষ ধাপ—রায়। সবার মধ্যেই একটি প্রশ্ন, শিশুটির পরিবার কি ন্যায়বিচার পাবে?
দেশজুড়ে নিন্দা, ক্ষোভ
১৯ মে সকালে আট বছর বয়সী শিশুটিকে স্কুলে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছিল। মা ব্যস্ত ছিলেন রান্নাঘরে। একপর্যায়ে শিশুটি বাসা থেকে বের হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর তাকে খুঁজে না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে পাশের ফ্ল্যাটে পাওয়া যায় তার নিথর দেহ। অভিযোগ ওঠে, একই ভবনের একটি ফ্ল্যাটে নিয়ে গিয়ে শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় এবং পরে মরদেহ গুমের চেষ্টা চালানো হয়।
ঘটনার দিনই নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে আটক করে পুলিশ। একইসঙ্গে আটক করা হয় তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে।
আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার, ছবি: সংগৃহীত
পরদিন ২০ মে শিশুটির বাবা পল্লবী থানায় মামলা করেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয় প্রতিবেশী ভাড়াটিয়া সোহেল রানাকে। এছাড়া তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার এবং অজ্ঞাতনামা আরও একজনকে আসামি করা হয়।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং দণ্ডবিধির ৩০২ ও ২০১ ধারায় মামলা রুজু করা হয়।
পরবর্তীতে ডিএনএ রিপোর্ট, ফরেনসিক আলামত, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা বিভিন্ন বস্তু সংগ্রহ করে তদন্ত সংস্থা। তদন্তকারীদের দাবি, সংগৃহীত আলামত ও সাক্ষ্য-প্রমাণে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের যথেষ্ট ভিত্তি পাওয়া গেছে।
আরও পড়ুন
সাক্ষ্য, জেরা ও আলামত উপস্থাপন শেষ—বিচার এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে
এজলাসে হাজির দুই আসামি, শুরু আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি
আদালতে প্রধান আসামির জবানবন্দি
২০ মে সোহেল রানাকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে জানান, ঘটনার দিন ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে একই ভবনের ভাড়াটিয়া সোহেল রানা কৌশলে শিশুটিকে নিজের কক্ষে নিয়ে যান। সেখানে তাকে যৌন নির্যাতনের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
নথিতে উল্লেখ করা হয়, ঘটনার উদ্দেশ্য ছিল শিশুটিকে নিখোঁজ হিসেবে উপস্থাপন করা এবং পরবর্তীতে প্রমাণ ধ্বংস করা।
পরিবারের সদস্যরা শিশুটিকে খুঁজতে গিয়ে সোহেল রানার কক্ষের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান। সন্দেহ হলে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করা হয়। সেখানে রক্তাক্ত অবস্থায় পাওয়া যায় শিশুটিকে।
আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার, ছবি: সংগৃহীত
পুলিশ জানায়, ঘটনার পর সোহেল রানা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে প্রযুক্তিগত নজরদারি ও তথ্যের ভিত্তিতে তাকে ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্ত সংস্থা আদালতকে জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সোহেল রানা ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।
একই ফ্ল্যাটে থাকা স্বপ্না আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়। তিনি দাবি করেন, ঘটনার সময় তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন এবং কিছু জানেন না। তবে তদন্তকারীরা তার বক্তব্যের সত্যতা যাচাইয়ের কথা জানান।
আরও পড়ুন
‘আমি নির্দোষ স্যার, আমাকে মাফ করে দিন’, আদালতে সোহেল রানা
আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন শেষ, যুক্তিতর্ক উপস্থাপন ৪ জুন
অভিযোগপত্র দাখিল ও মামলা ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর
দ্রুত তদন্ত শেষে গত ঈদুল আজহার ছুটি শুরুর আগে ২৪ মে আদালতে শিশুটি হত্যা মামলায় অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার এবং স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়।
পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান ভূঁইয়া নিপুণ দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। আদালত তা গ্রহণ করে মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৪৭ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে দুই আসামির বিরুদ্ধে ধর্ষণ, হত্যা এবং আলামত গোপনের অভিযোগ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ডিএনএ, ময়নাতদন্ত ও ভিসেরা রিপোর্টসহ ফরেনসিক প্রমাণ বিশ্লেষণ করে অভিযোগপত্র প্রস্তুত করা হয়।
সেদিন ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে চায়।
পরে ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে ১ জুন অভিযোগ গঠন শুনানির দিন নির্ধারণ করেন।
অভিযোগ গঠন, বিচার শুরুর আদেশ
১ জুন দুই আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত। একইসঙ্গে ২ জুন থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষে প্রিজন ভ্যানে তোলার আগ মুহূর্তে প্রধান আসামি সোহেল রানা নিজের দায় স্বীকারের পাশাপাশি ‘ডলার’ নামে এক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার দাবি করে গণমাধ্যমে বক্তব্য দেন।
তবে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, তদন্তের কোনো পর্যায়েই ‘ডলার’ নামের ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায়নি। নতুন কোনো আলামত পাওয়া গেলে বিষয়টি যাচাই করা হবে।
আলোচিত শিশু হত্যা মামলায় নিয়োজিত রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু আদালতে বলেন, শিশুটিকে কৌশলে ডেকে এনে বাথরুমে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়। নির্যাতনের একপর্যায়ে শিশুটি অজ্ঞান হয়ে পড়লে তাকে মৃত মনে করে মরদেহ গুমের উদ্দেশ্যে শরীর বিকৃত করা হয়।
তিনি আরও বলেন, শিশুটির মা তাকে খুঁজতে গিয়ে আসামিদের ফ্ল্যাটের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান। স্থানীয়রা জানালা দিয়ে রক্ত দেখতে পেয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। তখন সোহেল রানা পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং স্বপ্না আক্তার ঘরের ভেতরে অবস্থান করছিলেন।
আরও পড়ুন
পুলিশ হেফাজতে থাকা আসামির কথা বলা ও প্রচার না করার নির্দেশ
সাক্ষ্য, জেরা ও আলামত উপস্থাপন
২ জুন মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের মোট ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জন আদালতে উপস্থিত হন। দিনভর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ১৬ জনের সাক্ষ্য রেকর্ড করা হয়।
সাক্ষীদের মধ্যে ছিলেন মামলার বাদী শিশুটির বাবা, মা, বড় বোন, তিন প্রতিবেশী, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, জব্দ তালিকার সাক্ষী, সুরতহাল প্রস্তুতকারী কর্মকর্তা, পুলিশ সদস্য এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞসহ মোট ১৬ জন সাক্ষ্য দেন।
বিশেষ পিপি আজিজুর রহমান দুলু বলেন, সাক্ষ্য ও জেরার মাধ্যমে মামলার গুরুত্বপূর্ণ ইনক্রিমিনেটিং অ্যাভিডেন্স ট্রাইব্যুনালের সামনে এসেছে।
দিনের শেষভাগে তদন্তে জব্দ করা বিভিন্ন আলামত আদালতে উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা কাটা গ্রিলও ছিল।
এসময় এসআই (নিরস্ত্র) ইকবাল হোসেন ঘটনাস্থল, আলামত সংগ্রহ ও তদন্তের বিভিন্ন বিষয় আদালতে তুলে ধরতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
আদালতে আসামি সোহেল রানা, ছবি: জাগো নিউজ
আত্মপক্ষ সমর্থন ও সাফাই বক্তব্য
৩ জুন ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
শুনানিতে বিচারক মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ ও অভিযোগের বিভিন্ন দিক আসামিদের সামনে তুলে ধরেন।
প্রধান আসামি সোহেল রানা নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আদালতের কাছে ক্ষমা চান এবং ‘ডলার’ নামে একজনকে গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
তিনি বলেন, ‘আমি নির্দোষ স্যার। আমার একটা সন্তান আছে। আমাকে মাফ করে দিন।’
একপর্যায়ে সোহেল রানা বলেন, ‘ডলারকে ধরেন। আমি অপরাধ করেছি। তাকেও ধরেন।’
অপর আসামি স্বপ্না আক্তার আদালতে বলেন, ‘আমি কিছু করিনি।’
শুনানি শেষে আদালত ৪ জুন যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন ধার্য করেন।
যুক্তিতর্ক ও মৃত্যুদণ্ডের দাবি
যুক্তিতর্ক শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে, সাক্ষ্য-প্রমাণ, ফরেনসিক আলামত, ডিএনএ রিপোর্ট এবং স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির মাধ্যমে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষ দুই আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করে।
বিশেষ পিপি আজিজুর রহমান দুলু, ছবি: জাগো নিউজ
বিশেষ পিপি আজিজুর রহমান দুলু বলেন, তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘চেইন অব ফ্যাক্ট’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা আসামিদের অপরাধের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করে।
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, সোহেল রানা পরিকল্পিতভাবে শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যা করেন এবং পরে মরদেহ গুমের চেষ্টা করেন। এ কাজে স্বপ্না আক্তার সহযোগিতা করেন।
রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে যুক্তি দেয়, যে ফ্ল্যাটে ঘটনাটি ঘটেছে তার ভেতরে কী হয়েছিল সে বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান আসামিদের কাছেই রয়েছে।
উচ্চ আদালতের বিভিন্ন নজির অনুসারে, কারও হেফাজতে থাকা অবস্থায় মৃত্যু ঘটলে সেই মৃত্যুর গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দেওয়ার দায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর বর্তায়।
কিন্তু এই মামলায় শিশুটির মৃত্যু কিংবা মরদেহ বিকৃত করার বিষয়ে আসামিরা কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বলে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে।
‘ডলার’ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের অবস্থান
রাষ্ট্রপক্ষ ‘ডলার’ প্রসঙ্গকে বিচার বিভ্রান্তির অপচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করে।
আজিজুর রহমান দুলু বলেন, ১৬৪ ধারার জবানবন্দি কিংবা তদন্তের কোনো পর্যায়েই ‘ডলার’ নামের কোনো ব্যক্তির উল্লেখ ছিল না।
তার মতে, বিচারিক প্রক্রিয়ার শেষ পর্যায়ে এসে এমন নাম উল্লেখ করে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং বিচার বিলম্বিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহ, ছবি: জাগো নিউজ
আসামিপক্ষের যুক্তি
দেশজুড়ে আলোচিত হত্যার ঘটনায় ঢাকা আইনজীবী সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির এক জরুরি ভার্চ্যুয়াল সভায় আসামিপক্ষে কোনো আইনজীবী আইনি সহায়তা দেবেন না বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। পরে আইন মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রীয় খরচে ঢাকা জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহকে আসামিদের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ দেয়।
অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহ বলেন, ‘আসামিরা কোনো সাফাই সাক্ষ্য দিতে চাননি এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণও আদালতে উপস্থাপন করেননি। এতে বোঝা যায়, নিজেদের পক্ষে উপস্থাপনের মতো কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ তাদের কাছে ছিল না। উপরন্তু প্রধান আসামি নিজেই আদালতে দোষ স্বীকার করেছেন।’
তিনি বলেন, তদন্তে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করা হয়েছে। ঘটনার সময় সোহেল রানা মাদকাসক্ত অবস্থায় ছিলেন। এছাড়া মামলায় উল্লেখিত ছুরিটির ফরেনসিক পরীক্ষা না হওয়াও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহ সোহেল রানার জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে লাশ গুমে সহযোগিতার অভিযোগে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডের আবেদন জানান।
ঢাকা মহানগর আদালতের পিপি ওমর ফারুক ফারুকীসহ অন্যরা, ছবি: জাগো নিউজ
রাষ্ট্রপক্ষের প্রত্যাশা
শুনানি শেষে পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়া দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকবে।
তার প্রত্যাশা, উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে এমন একটি রায় আসবে যা ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে শক্ত বার্তা দেবে।
এখন অপেক্ষা রায়ের
মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত, অভিযোগপত্র, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, আত্মপক্ষ সমর্থন এবং যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। দেশের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলাগুলোর একটিতে এখন কেবল রায় ঘোষণা বাকি।
রোববার ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের রায়ে নির্ধারিত হবে সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারের আইনগত পরিণতি।
শিশুটির মা-বাবার কাছে এটি একটি শুধু মামলার রায় নয়। এটি তাদের হারিয়ে যাওয়া সন্তানের জন্য ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা। যেমন ঘটনার পর শিশুটির বাবার একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। সেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘বিচার আপনারা করতে পারবেন না। আপনাদের এ ধরনের কোনো রেকর্ড নেই। আপনারা পারবেন না। আমার মেয়েও ফিরে আসবে না। আপনারা বিচার করতে পারবেন? পারবেন না। আপনারা বিচারের কোনো প্রমাণ দেখাতে পারবেন? পারবেন না। আমার থেকে স্ট্যাম্পে লিখিত নেবেন? এইটা বড়জোর ১৫ দিন। এরপর আবার কোনো একটা ঘটনা ঘটবে। এটা তলে চলে যাবে। শেষ! শেষ এটা। আমি দেখছি, আমার বয়স ৫৫। কোনো বিচার হবে না।’
বিচার ও নিরাপদ সমাজের দাবি
শিশুটির বাবা শনিবার (৬ জুন) নিপীড়িত নারী ও শিশুদের আইনি ও স্বাস্থ্য সহায়তা সেল আয়োজিত ‘বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন বৃদ্ধি ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বলেন, তিনি শুধু নিজের সন্তানের বিচারই চান না, এমন একটি সমাজ ও বিচারব্যবস্থা চান যেখানে আর কোনো শিশুকে রামিসার মতো নির্মম পরিণতির শিকার হতে হবে না।
বিচার ও জবাবদিহির প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘আমি একজন বাবা হিসেবে জানতে চাই, আমার সন্তানের এই অবস্থার দায়ভার কে নেবে? সমাজ, রাষ্ট্র নাকি আমার অবহেলা? আমার সোনার টুকরো সন্তানের এই পরিণতির জন্য কে দায়ী? আপনারা আলোচনা করবেন, কিন্তু সত্যিই কি কোনো সমাধান আসবে? ভবিষ্যতে কি আর কোনো রামিসাকে এভাবে ক্ষতবিক্ষত হতে হবে, নাকি তারা নির্ভয়ে বাবার হাত ধরে রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে পারবে?’
শিশুটির বাবা বলেন, দেশে বিভিন্ন সময়ে নানা আইন প্রণয়ন হলেও তার কার্যকর বাস্তবায়ন দৃশ্যমান নয়। আমার এই ৫২ বছর বয়সে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন আইন করা হয়েছে, কিন্তু সেই আইনের বাস্তবায়ন আমরা খুব একটা দেখি না। শুধু সরকার সবকিছু করবে তা নয়, সমাজের নাগরিক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব আছে। এক ফ্ল্যাটের এক দরজা থেকে আরেক দরজার দূরত্ব মাত্র তিন ফিট। অথচ এই তিন ফিটের ভেতরে আমরা একটা শিশুকে নিরাপত্তা দিতে পারি না।
এমডিএএ/এমএমএআর
What's Your Reaction?