শেফ ক্যারিয়ার: সমস্যা স্কিলের নয়, সমস্যা আমাদের মাইন্ডসেটের

শেফ মোহাম্মদ অলিউর বাংলাদেশে আমরা প্রায়ই একটা কথা শুনি—‌‘আমাদের দেশে ভালো শেফ নেই’ বা ‘স্কিলের অভাব’। কিন্তু বাস্তব কিচেন লাইফের অভিজ্ঞতা আমাকে ভিন্ন এক সত্য শিখিয়েছে। সমস্যাটা আমাদের হাতের জাদুতে নয়, বরং আমাদের চিন্তাধারায়। আমাদের দেশে অনেক শেফ আছেন যারা অসাধারণ টেকনিক বোঝেন এবং কঠোর পরিশ্রম করতে পারেন। তবুও ক্যারিয়ারের একটা পর্যায়ে গিয়ে তারা থমকে যান। এর প্রধান কারণগুলো হলো: শর্টকাট মানসিকতা: ২-৩ বছর কাজ করেই আমরা নামের আগে টাইটেল চাই। কিন্তু নিজের ভিত্তি মজবুত না করে ওপরে উঠলে সেই ক্যারিয়ার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। ইগো ও তুলনা: কে কত বেতন পাচ্ছে বা কার প্রমোশন আগে হলো—এই তুলনায় আমরা এত ব্যস্ত থাকি যে নিজের দক্ষতা বাড়ানোর সময় পাই না। নিজের ওপর ইনভেস্ট না করা: রান্না কেবল আগুনের কাজ নয়, এটি একটি বিজ্ঞান। নতুন টেকনিক শেখা বা নিজেকে আপডেট রাখার পেছনে আমরা সময় বা শ্রম দিতে চাই না। ​ইউরোপের কিচেনে ঢোকার সুযোগ অনেক বাংলাদেশিই পান, কিন্তু সেই সুযোগকে ক্যারিয়ারের শিখরে নিয়ে যাওয়ার গল্প খুব কম। কেন আমরা কঠোর পরিশ্রম করেও গুটিকয়েক শেফ পজিশনের বাইরে যেতে পারি না এর পেছনে লুকিয়ে আছে আমাদের কিছু

শেফ ক্যারিয়ার: সমস্যা স্কিলের নয়, সমস্যা আমাদের মাইন্ডসেটের

শেফ মোহাম্মদ অলিউর

বাংলাদেশে আমরা প্রায়ই একটা কথা শুনি—‌‘আমাদের দেশে ভালো শেফ নেই’ বা ‘স্কিলের অভাব’। কিন্তু বাস্তব কিচেন লাইফের অভিজ্ঞতা আমাকে ভিন্ন এক সত্য শিখিয়েছে। সমস্যাটা আমাদের হাতের জাদুতে নয়, বরং আমাদের চিন্তাধারায়।

আমাদের দেশে অনেক শেফ আছেন যারা অসাধারণ টেকনিক বোঝেন এবং কঠোর পরিশ্রম করতে পারেন। তবুও ক্যারিয়ারের একটা পর্যায়ে গিয়ে তারা থমকে যান। এর প্রধান কারণগুলো হলো:

শর্টকাট মানসিকতা: ২-৩ বছর কাজ করেই আমরা নামের আগে টাইটেল চাই। কিন্তু নিজের ভিত্তি মজবুত না করে ওপরে উঠলে সেই ক্যারিয়ার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।

ইগো ও তুলনা: কে কত বেতন পাচ্ছে বা কার প্রমোশন আগে হলো—এই তুলনায় আমরা এত ব্যস্ত থাকি যে নিজের দক্ষতা বাড়ানোর সময় পাই না।

নিজের ওপর ইনভেস্ট না করা: রান্না কেবল আগুনের কাজ নয়, এটি একটি বিজ্ঞান। নতুন টেকনিক শেখা বা নিজেকে আপডেট রাখার পেছনে আমরা সময় বা শ্রম দিতে চাই না।

​ইউরোপের কিচেনে ঢোকার সুযোগ অনেক বাংলাদেশিই পান, কিন্তু সেই সুযোগকে ক্যারিয়ারের শিখরে নিয়ে যাওয়ার গল্প খুব কম। কেন আমরা কঠোর পরিশ্রম করেও গুটিকয়েক শেফ পজিশনের বাইরে যেতে পারি না এর পেছনে লুকিয়ে আছে আমাদের কিছু মনস্তাত্ত্বিক বাধা।

​ইউরোপের একটি ভালো কিচেনে এন্ট্রি পাওয়াটা বড় সাফল্য নয়, বরং এটা একটা যুদ্ধের শুরু। অনেকে ইউরোপে গিয়েই মনে করেন ‘আমি তো পৌঁছে গেছি’, এই আত্মতুষ্টি তাদের শেখার গতি কমিয়ে দেয়। ফলাফল, তারা বছরের পর বছর একই কাজ করে যান, কিন্তু নিজের কোয়ালিফিকেশন বাড়িয়ে বড় কোনো শেফ পজিশনে যাওয়ার চেষ্টা করেন না।

​ইউরোপীয় স্ট্যান্ডার্ডে রান্না করা মানে কেবল স্বাদ নয়, এর পেছনে থাকে সায়েন্স এবং সূক্ষ্ম টেকনিক। অনেকে কেবল কাজ চালিয়ে নেওয়ার মতো শেখেন। কিন্তু হ্যাসাপ, ফুড সেফটি এবং আধুনিক কিচেন ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়াশোনা করার অনীহা তাদের প্রমোশনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ভাষাগত দক্ষতা ও এখানে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। প্রফেশনাল কমিউনিকেশন বা ভাষার দক্ষতা না বাড়ালে কিচেন লিডার হওয়া অসম্ভব।

​বাংলাদেশিরা পরিশ্রম করতে জানে, কিন্তু ইউরোপীয় কিচেন চায় ‘স্মার্ট কোয়ালিফিকেশন’। ​আমরা হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে কিচেন হেল্পার হিসেবে টিকে থাকি, কিন্তু একজন এক্সিকিউটিভ শেফ হওয়ার জন্য যে লিডারশিপ এবং গ্লোবাল নলেজ দরকার, সেটা অর্জনে আমরা পিছিয়ে পড়ি। ​ফলে দিনশেষে আমরা কেবল ‘কর্মী’ হয়েই থাকি, ‘ক্রিয়েটর’ বা ‘লিডার’ হতে পারি না।

​ইউরোপের কিচেনে সম্মান পেতে হলে তাদের কালচার আর কিউইজিনকে ধারণ করতে হয়। অনেকে নিজের চেনা গণ্ডির বাইরে গিয়ে নতুন কিছু শিখতে চান না। বাস্তবতায় যারা সেখানে সফল হয়েছেন, তারা কেবল কাজ করেননি, বরং ইউরোপীয় স্ট্যান্ডার্ডকে নিজের স্কিলের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন। আমাদের অনেকের মধ্যে এই মানিয়ে নেওয়ার এবং শেখার মানসিকতার অভাব স্পষ্ট।

​মূল কথা​, ইউরোপের মাটিতে সুযোগ আমাদের হাতছানি দেয়, কিন্তু আমাদের ‘এটুকুই যথেষ্ট’—এমন মাইন্ডসেট আমাদের বড় স্বপ্ন দেখতে বাধা দেয়।

​‘আপনি যদি কেবল টিকে থাকার জন্য কাজ করেন, তবে আপনি সারা জীবন কর্মীই থাকবেন। আর যদি শেখার জন্য কাজ করেন, তবে একদিন আপনি কিচেন পরিচালনা করবেন।’ ​পার্থক্যটা কেবল আপনার চেষ্টার পরিধিতে এবং প্রতিনিয়ত নিজেকে আপডেট করার মানসিকতায়।

শেফ মোহাম্মদ অলিউর
ইউরোপীয়ান কুইজিন স্পেশালিস্ট, কিচেন প্রফেশনাল

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow