বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের দেশের শেয়ারবাজার ছাড়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। চলতি মার্চ মাসে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব কমেছে ১৪৭টি। আর চলতি বছরের তিন মাসে কমেছে ১৯৭টি এবং দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিদেশি ও প্রবাসীদের বিও হিসাব কমেছে ৫৮৭টি।
অবশ্য বিদেশি ও প্রবাসীদের শেয়ারবাজার ছাড়ার এ প্রবণতা চলছে বেশ আগে থেকেই। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে দেশের শেয়ারবাজারে ধারাবাহিকভাবে বিদেশি ও প্রবাসীদের বিও হিসাব কমছে। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ২৬ মার্চ পর্যন্ত বিদেশি ও প্রবাসীদের বিও হিসাব কমেছে ৯ হাজারের বেশি।
বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজার ছাড়লেও স্থানীয় বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়ছে। চলতি বছরে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বেড়েছে সাড়ে ৫ হাজারের বেশি। আর হাসিনা সরকার পতনের পর দেশ চালানোর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাবে বেড়েছে ১৯ হাজারের বেশি।
বিও হল শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য ব্রোকারেজ হাউস অথবা মার্চেন্ট ব্যাংকে একজন বিনিয়োগকারীর খোলা হিসাব। এ বিও হিসাবের মাধ্যমেই বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজারে লেনদেন করেন। বিও হিসাব ছাড়া শেয়ারবাজারে লেনদেন করা সম্ভব না। বিও হিসাবের তথ্য রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল)।
এ সিডিবিএলের তথ্যানুযায়ী, ২৬ মার্চ শেষে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৮৮ হাজার ৬৭টি। যা হাসিনা সরকার পতনের সময় ছিল ১৬ লাখ ৬৮ হাজার ৫৮টি। এ হিসাবে হাসিনা সরকার পতনের পর শেয়ারবাজারে বিও হিসাব বেড়েছে ২০ হাজার ৯টি। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিও হিসাবে বেড়েছে ১৯ হাজার ১৭২টি। অন্তর্বর্তী সরকার যে দিন দেশ চালানোর দায়িত্ব নেয়, সেদিন বিও হিসাবের সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ ৬৮ হাজার ৮৯৫টি।
- আরও পড়ুন
- বিদেশিরা শেয়ারবাজার ছাড়ছেই, বাড়ছে স্থানীয় বিনিয়োগকারী
- চীনা বিনিয়োগকারীদের দেশে কারখানা স্থানান্তরের আহ্বান ড. ইউনূসের
- ৭০০ ব্যান্ডে নিলাম: বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের জবাব দিলো সরকার
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন শেখ হাসিনা। পদত্যাগ করে তিনি দেশে ছেড়ে পালিয়ে যান। সরকার পতনের পর ৮ আগস্ট দেশ চালানোর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এরই মধ্যে এ সরকারের প্রায় সাড়ে ৭ মাস পার হয়েছে। হাসিনার সরকার পতনের পর প্রথম চার কার্যদিবস শেয়ারবাজারে বড় উত্থান হলেও, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর শেয়ারবাজারে পতনের পাল্লা ভারি হয়েছে। শেয়ারবাজারে মন্দা দেখা দিলেও বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা বাড়তে দেখা যাচ্ছে।
অবশ্য সার্বিকভাবে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়লেও, বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কমছে। সিডিবিএলের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব আছে ৪৬ হাজার ৪৯৪টি। ২০২৪ সাল শেষে বিদেশি ও প্রবাসীদের বিও হিসাব ছিল ৪৬ হাজার ৬৯১টি। অর্থাৎ চলতি বছরে বিদেশি ও প্রবাসীদের বিও হিসাব কমেছে ১৯৭টি। এর মধ্যে মার্চ মাসেই কমেছে ১৪৭টি।
অপরদিকে, হাসিনা সরকার পতনের সময় বিদেশি ও প্রবাসীদের বিও হিসাব ছিল ৪৭ হাজার ৮৪টি। আর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দিন ছিল ৪৭ হাজার ৮১টি। অর্থাৎ বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব ধারাবাহিকভাবে কমেছে। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে কমেছে ৫৮৭টি।
বিদেশিদের বাংলাদেশের শেয়ারবাজার ছাড়ার এ প্রবণতা চলছে আরও আগে থেকেই। ২০২৩ নভেম্বর থেকে ধারাবাহিকভাবে বিদেশি ও প্রবাসীদের বিও হিসাব কমছে। ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব ছিল ৫৫ হাজার ৫১২টি। এরপর ওই বছরের শেষদিন অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৫৫ হাজার ৩৪৮টিতে। এ হিসাবে ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবরের পর দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি ও প্রবাসীদের নামে বিও হিসাব কমেছে ৯ হাজার ১৮টি।
বিদেশিদের শেয়ারবাজার ছাড়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকলেও সরকার পতনের পর স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা বাড়তে দেখা যাচ্ছে। সিডিবিএলের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশি বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব আছে ১৬ লাখ ২৩ হাজার ৯১০টি। আর ২০২৪ সাল শেষে ছিল ১৬ লাখ ১৮ হাজার ২৬২টি। অর্থাৎ চলতি বছরে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বেড়েছে ৫ হাজার ৬৪৮টি।
অপরদিকে, হাসিনা সরকার পতনের সময় স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব ছিল ১৬ লাখ ৩ হাজার ৮২২টি। আর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দিন ছিল ১৬ লাখ ৪ হাজার ৬৫৮টি। অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে দেশি বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বেড়েছে ১৯ হাজার ২৫২টি।
- আরও পড়ুন
- ঈদের আগে চমক দেখালো এবি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড
- হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ নিতে চাইলে আসতে হবে পুঁজিবাজারে
- ইনভেস্টমেন্ট সামিটে অংশ নেবে চীন-ভারতসহ বিশ্বের অর্ধশতাধিক দেশ
হাসিনা সরকারের পতনের পর শেয়ারবাজারে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা বাড়তে দেখা গেলেও তার আগে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজার ছেড়েছেন। ২০২৪ সালের শুরুতে শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব ছিল ১৭ লাখ ৭৩ হাজার ৫৫১টি। আর বর্তমানে বিও হিসাব আছে ১৬ লাখ ৮৮ হাজার ৬৭টি। অর্থাৎ ২০২৪ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত বিও হিসাব কমেছে ৮৫ হাজার ৪৮৪টি।
এদিকে বর্তমানে শেয়ারবাজারে যে বিনিয়োগকারীরা আছেন, তার মধ্যে পুরুষ বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব আছে ১২ লাখ ৬৬ হাজার ১৮টি। হাসিনা সরকার পতনের সময় এই সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ৪৮ হাজার ৪৩৪টি। অর্থাৎ হাসিনা সরকার পতনের পর পুরুষ বিনিয়োগকারীদের হিসাব বেড়েছে ১৭ হাজার ৫৮৪টি।
অপরদিকে বর্তমানে নারী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪ হাজার ৩৮৬টি। হাসিনা সরকার পতনের সময় এই সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ২ হাজার ৪৭২টি। এ হিসাবে হাসিনা সরকার পতনের পর নারী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বেড়েছে ১ হাজার ৯১৪টি।
হাসিনা সরকার পতনের পর নারী ও পুরুষ বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি কোম্পানির বিও হিসাবও বেড়েছে। বর্তমানে কোম্পানি বিও হিসাব রয়েছে ১৭ হাজার ৬৬৩টি। হাসিনা সরকার পতনের সময় এই সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ১৫২টি। সে হিসেবে গত সাড়ে ৭ মাসে কোম্পানি বিও হিসাব বেড়েছে ৫১১টি।
বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের যে বিও হিসাব আছে তার মধ্যে একক নামে আছে ১২ লাখ ৫ হাজার ৬৭১টি, যা হাসিনা সরকার পতনের সময় ছিল ১১ লাখ ৮৩ হাজার ৬৭৭টি। অর্থাৎ হাসিনা সরকার পতনের পর একক নামে বিও হিসাবে বেড়েছে ২১ হাজার ৯৯৪টি।
অপরদিকে বিনিয়োগকারীদের যৌথ নামে বিও হিসাব আছে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৭৩৩টি। হাসিনা সরকার পতনের সময় যৌথ বিও হিসাব ছিল ৪ লাখ ৬৭ হাজার ২২৯টি। অর্থাৎ গত সাড়ে ৭ মাসে যৌথ বিও হিসাব কমেছে ২ হাজার ৪৯৬টি।
এমএএস/এমএএইচ/এএসএম